ধর্ষণ ঘটনায় যেহেতু ৪ জন পুরুষের সাক্ষী থাকে না, তাই যিনার শরয়ী শাস্তির আবদেন কি গ্রহণযোগ্য ?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
বাংলাদেশে হওয়া ধর্ষণের বিচার শরীয়া মোতাবেক চাওয়া কি ভুল? কারণ বাংলাদেশের ধর্ষণ ঘটনায় কোন ৪ জন পুরুষের সাক্ষী নাই।
এখানে শরীয়া মোতাবেক বিচার চাওয়া কি ভুল? যেহেতু সাক্ষী নাই।
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
ধর্ষণের বিচার শরীয়া মোতাবেক চাওয়া কোনোভাবেই ভুল নয়। বরং এটি ন্যায়বিচারের দাবি। প্রশ্নে উল্লেখিত "৪ জন পুরুষ সাক্ষী" শর্তটি কেবল স্পষ্ট জিনা (সম্মতিতে ব্যভিচার) এর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যা সূরা নূর (২৪:৪) এ বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু ধর্ষণ একটি পৃথক ও গুরুতর অপরাধ; এটি হিরাবাহ (সশস্ত্র ডাকাতি ও সন্ত্রাস) বা জবরদস্তিমূলক যৌন নির্যাতন-এর অন্তর্ভুক্ত, যার জন্য চারজন সাক্ষীর শর্ত আরোপিত নয়।
শরীয়ায় ধর্ষণের বিচার পদ্ধতি:
-
প্রমাণের মাধ্যম: ধর্ষণ প্রমাণের জন্য চারজন পুরুষ সাক্ষী আবশ্যক নয়। বরং নিম্নলিখিত প্রমাণাদি গ্রহণযোগ্য:
- ভিকটিমের সাক্ষ্য (শপথসহ)
- চিকিৎসা রিপোর্ট (মেডিকেল এভিডেন্স)
- ডিএনএ টেস্ট
- অন্যান্য পরিস্থিতিগত প্রমাণ (সার্কামস্ট্যান্সিয়াল এভিডেন্স)
- বিশেষজ্ঞ সাক্ষী
ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) বলেছেন, ধর্ষণের ক্ষেত্রে নারীর একাকী সাক্ষ্যও গ্রহণযোগ্য, যদি তার সত্যবাদিতার ওপর বিশ্বাস করা যায় (রদ্দুল মুহতার, ৪/৬)।
-
শাস্তির প্রকৃতি: ধর্ষণের শাস্তি হদ্দ (নির্ধারিত) নয়, বরং তা’যীর (বিচারকের বিবেচনাধীন)। তা’যীরের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। ইমাম মালিক, ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহঃ) এর মতে, ধর্ষকের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। হানাফি মতে, তা’যীর হিসেবে কঠোর শাস্তি দেওয়া যায়, যার মধ্যে ফাঁসি বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অন্তর্ভুক্ত (ফাতাওয়া আলমগীরি, ২/৫৪; বাদায়েউস সানায়ে, ৭/৫২)।
-
কুরআন-হাদিসের দলিল:
- সূরা মায়েদা (৫:৩৩): যারা আল্লাহ ও রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করে, তাদের শাস্তি হলো হত্যা, ক্রুশে দেওয়া, হাত-পা বিপরীত দিক থেকে কাটা বা দেশ থেকে নির্বাসন। ধর্ষণ সুস্পষ্টভাবে ফাসাদ ও হিরাবাহ-এর অন্তর্ভুক্ত।
- হাদিস: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের মধ্যে এমন কিছু নতুন সৃষ্টি করে যা তাতে নেই, তা প্রত্যাখ্যাত" (সহীহ বুখারী, ২৬৯৭)। অর্থাৎ, শরীয়ার মূলনীতি অনুযায়ী বিচার করতে হবে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট:
বাংলাদেশের প্রচলিত আইন শরীয়ার সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলেও, শরীয়া মোতাবেক বিচার চাওয়া মানে হলো ইসলামী আইনের আলোকে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দাবি করা। যেহেতু ধর্ষণ প্রমাণের জন্য চারজন পুরুষ সাক্ষী আবশ্যক নয়, তাই এটি চাওয়া সম্পূর্ণ সঠিক এবং দ্বীনি দায়িত্ব।
ইমাম ইবনু আবেদীন (রহঃ) বলেছেন: "ধর্ষণ একটি জঘন্য অপরাধ; এক্ষেত্রে নারীর সাক্ষ্য ও মেডিকেল রিপোর্ট যথেষ্ট প্রমাণ। বিচারক তার বিবেক অনুযায়ী শাস্তি নির্ধারণ করবেন" (রদ্দুল মুহতার, ৪/১২৬)।
উপসংহার:
ধর্ষণের বিচার শরীয়া মোতাবেক চাওয়া ভুল নয় বরং ওয়াজিব। এটি দাবি করার অর্থ এই নয় যে, আপনি চারজন পুরুষ সাক্ষীর শর্ত আরোপ করছেন; বরং আপনি ইসলামী আইনের পূর্ণাঙ্গ বিধান অনুযায়ী ন্যায়বিচার চাচ্ছেন, যা প্রমাণের আধুনিক মাধ্যমকেও গ্রহণ করে।
আল্লাহ তাআলা সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন।