সাংসারিক ঝগড়ার সময় কেনায়া বাক্য বলে তালাক পতিত হয় কি না?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 6448
Questioner: Alamin Hossain
Question Asked: 05 Oct 2026, 10:56 PM
Reviewed & Published: 05 Oct 2026, 11:08 PM
Views: 20
Tokens: 4,545
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

হুজুর সাংসারিক জীবনে ঝগড়া করার সময় অনেক কেনায় বাক্য বলা হয়েছে । যেমন ধরুন - তুমি চলে যাও,তোমার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নাই,ভালো না লাগলে চলে যেও এসব । কিনতু তখন আমি জানতাম এসব বললে তালাক হয় না মূলত তালাক থেকে বাঁচার জন্য এসব কথা বলতাম । এখন জানতে পারলাম কিণায়া বাক্যে তালাক হয় । কিনতু তখন আমার নিয়ত কি ছিল সেটা নিয়ে আমি সন্দিহান । কিনতু আমি এটুকু বলতে পারি আমি তালাক থেকে বাঁচার জন্য তালাক না বলে এসব কথা বলতাম
দয়া করে জানাবেন খুব চিন্তায় আছি মনে হয় আর বেঁচে থাকব না

Answer

সন্দেহজনক কেনায়া বাক্য দ্বারা তালাক সংক্রান্ত মাসআলা

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ

প্রশ্নকারী জানাচ্ছেন যে, সাংসারিক ঝগড়ার সময় তিনি স্ত্রীকে বিভিন্ন কেনায়া বাক্য বলেছেন—যেমন: "তুমি চলে যাও", "তোমার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই", "ভালো না লাগলে চলে যাও" ইত্যাদি। তখন তিনি জানতেন না যে এসব বাক্যে তালাক পতিত হতে পারে; বরং তিনি ভাবতেন এসব বললে তালাক হয় না। মূলত তিনি তালাক থেকে বাঁচার জন্যই এসব কথা বলতেন, তালাক দেওয়ার নিয়ত ছিল না। এখন জানার পর তিনি সন্দেহে পড়েছেন যে, তখন তাঁর নিয়ত কী ছিল। তবে তিনি এটুকু নিশ্চিতভাবে বলতে পারেন যে, তিনি তালাক থেকে বাঁচার জন্যই তালাক ছাড়া এসব কথা বলতেন।


ফিকহি বিশ্লেষণ

১. কেনায়া বাক্যের সংজ্ঞা ও হুকুম

কেনায়া (কিনায়া) শব্দ সেইসব শব্দকে বলা হয়, যা মূলত তালাকের জন্য প্রণীত নয়, কিন্তু তালাকের অর্থে ব্যবহৃত হতে পারে। হানাফি মাযহাবে কেনায়া বাক্যের হুকুম হলো:

  • নিয়ত ছাড়া কেনায়া বাক্যে তালাক পতিত হয় না — যদি বাক্যধারী তালাকের নিয়ত না করে, তবে তালাক হয় না।
  • তালাকের নিয়ত থাকলে — কেনায়া বাক্যে তালাক পতিত হয়।
  • তালাকের নিয়ত না থাকলে — তবে পরিস্থিতি (হাল) দ্বারা যদি তালাকের অর্থ প্রমাণিত হয়, তাহলে তালাক পতিত হয়।

দলিল:

«وَإِنْ كَانَ كِنَايَةً لَا يَقَعُ بِهِ إِلَّا بِنِيَّةٍ أَوْ دَلَالَةِ الْحَالِ»

(আল-হিদায়া, কিতাবুত তালাক)

ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, কেনায়া বাক্যে নিয়ত বা হালের দালালত ছাড়া তালাক পতিত হয় না।

২. প্রশ্নকারীর অবস্থার উপর প্রয়োগ

প্রশ্নকারী স্পষ্টভাবে বলেছেন:

  1. তখন তিনি জানতেন না যে এসব বাক্যে তালাক হয়।
  2. তালাক দেওয়ার নিয়ত ছিল না — বরং তিনি তালাক থেকে বাঁচার জন্যই এসব বলতেন।
  3. তালাক না বলেই তিনি এসব কথা বলতেন।

এখন প্রশ্ন হলো: যেহেতু তিনি জানতেন না যে এসব কেনায়া বাক্য, এবং তাঁর তালাকের নিয়ত ছিল না, বরং উল্টো তালাক থেকে বাঁচার নিয়ত ছিল — তাহলে কি তালাক পতিত হয়েছে?

উত্তর: হানাফি মাযহাবের মূলনীতি অনুযায়ী, কেনায়া বাক্যে তালাকের নিয়ত বা হালের দালালত ছাড়া তালাক পতিত হয় না। প্রশ্নকারীর ক্ষেত্রে:

  • নিয়ত ছিল না — বরং তালাক থেকে বাঁচার নিয়ত ছিল।
  • হালের দালালতও নেই — কারণ তিনি তালাক দেওয়ার ইচ্ছায় এসব বলেননি; বরং ঝগড়ার মুহূর্তে রাগের বশে বা তালাক এড়ানোর জন্য বলেছেন।

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো: "তুমি চলে যাও", "তোমার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই" — এই ধরনের বাক্যগুলো যদি রাগের মুহূর্তে বলা হয় এবং তালাকের নিয়ত না থাকে, তবে হানাফি মাযহাবে তালাক পতিত হয় না। কিন্তু যদি বাক্যধারী নিজেই স্বীকার করে যে, "আমি তালাক থেকে বাঁচার জন্যই এসব বলতাম" — তাহলে এটা স্পষ্ট প্রমাণ যে তাঁর তালাকের নিয়ত ছিল না।

৩. সন্দেহের সমাধান

প্রশ্নকারী বলছেন, "তখন আমার নিয়ত কী ছিল সেটা নিয়ে আমি সন্দিহান।" কিন্তু তিনি এটুকু নিশ্চিতভাবে বলতে পারছেন যে, তিনি তালাক থেকে বাঁচার জন্যই এসব বলতেন। ইসলামি ফিকহের একটি মূলনীতি হলো:

«الْأَصْلُ بَقَاءُ مَا كَانَ عَلَى مَا كَانَ»

(মূলনীতি হলো: যা ছিল তা原有的 অবস্থায় বহাল থাকে।)

অর্থাৎ, সন্দেহের কারণে তালাক পতিত হয় না। তালাক পতিত হওয়ার জন্য নিশ্চিত নিয়ত বা হালের দালালত প্রয়োজন। যেহেতু প্রশ্নকারী নিশ্চিতভাবে বলছেন যে তাঁর তালাকের নিয়ত ছিল না, বরং তালাক থেকে বাঁচার নিয়ত ছিল — সেহেতু তালাক পতিত হয়নি।

ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:

«وَلَا يَقَعُ بِالْكِنَايَةِ إِلَّا بِنِيَّةٍ أَوْ دَلَالَةِ حَالٍ، وَلَا عِبْرَةَ بِالشَّكِّ»

(রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুত তালাক)

অর্থাৎ, কেনায়া বাক্যে নিয়ত বা হালের দালালত ছাড়া তালাক পতিত হয় না, এবং সন্দেহের কোনো প্রভাব নেই।

৪. বিশেষ সতর্কতা

যদিও প্রশ্নকারীর ক্ষেত্রে তালাক পতিত হয়নি, তবে ভবিষ্যতে সতর্ক থাকা অত্যন্ত জরুরি:

  • ঝগড়ার সময় কেনায়া বাক্য ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন।
  • তালাকের বিষয়ে কোনো সন্দেহ হলে সরাসরি মুফতি বা আলেমের শরণাপন্ন হন।
  • "তুমি চলে যাও", "তোমার সাথে সম্পর্ক নেই" — এই ধরনের বাক্য মুখে আনা থেকে বিরত থাকুন, কারণ কিছু ক্ষেত্রে হালের দালালত দ্বারা তালাক পতিত হতে পারে।

চূড়ান্ত ফতোয়া

প্রশ্নকারীর বর্ণনা অনুযায়ী:

  1. তিনি কেনায়া বাক্য বলেছেন, কিন্তু তালাকের নিয়ত ছিল না।
  2. তিনি তালাক থেকে বাঁচার জন্যই এসব বলতেন।
  3. তিনি তখন জানতেন না যে এসব বাক্যে তালাক হয়।

সুতরাং, হানাফি মাযহাবের মূলনীতি অনুযায়ী তাঁর উপর কোনো তালাক পতিত হয়নি। তিনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন। তবে ভবিষ্যতে এ ধরনের বাক্য ব্যবহার থেকে বিরত থাকবেন এবং তালাকের বিষয়ে সতর্ক থাকবেন।

আল্লাহ তা'আলা আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।


রেফারেন্স

  1. আল-হিদায়া — ইমাম বুরহানুদ্দিন আল-মারগিনানি (রহ.), কিতাবুত তালাক
  2. রাদ্দুল মুহতার — ইমাম ইবনে আবিদিন শামি (রহ.), কিতাবুত তালাক
  3. ফাতাওয়া আলমগিরি — কিতাবুত তালাক
  4. ইমদাদুল ফাতাওয়া — মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.)
  5. ফাতাওয়া উসমানি — মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.)
  6. বাহিশতী জেওর — মাওলানা আশরাফ আলী থানভি (রহ.)

আল্লাহ ভালো জানেন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.