তালাক হয়ে গেলে পুনরায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার জন্য কি হিল্লা বিবাহ করা প্রয়োজন? হিল্লা বিবাহ কি জায়েজ হবে?

Marriage and Divorce · Ahle Hadith / Salafi

Question No: 6445
Questioner: Zannatul Nayem
Question Asked: 05 Oct 2026, 10:09 PM
Reviewed & Published: 05 Oct 2026, 11:22 PM
Views: 21
Tokens: 4,271
This answer is according to the 'Ahle Hadith / Salafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আচ্ছা প্রথম দিন স্বামী বলেছে তোকে তালাক দিলাম তখন এক তালাক পতিত হলো, এর পরে বলেছে তুই এখানে বেঁধে থাকিস না থাকলে তোকে তালাক দিব কিন্তু স্ত্রী ছিল ওখানে তাও । এরপর স্বামী আবার তালাক দিলো তাহলে এক দফায়তেই দুইবার তালাক দেয়া হলো। এর পর ৬ মাস পরে আবার এক দফায় দুই তালাক দেয়া হলো। তাহলে কি তালাক পতিত হয়েছে?

তালাক হয়ে গেলে পুনরায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার জন্য কি হিল্লা বিবাহ করা প্রয়োজন? হিল্লা বিবাহ কি জায়েজ হবে?

Answer

তালাক সংক্রান্ত মাসআলার বিস্তারিত উত্তর

উত্তর (সংক্ষেপে): প্রশ্নে বর্ণিত ধারাবাহিকতায় মোট তিন তালাক পতিত হয়েছে — প্রথম দিনে এক তালাক, এরপর দ্বিতীয় তালাক, এবং ছয় মাস পর তৃতীয় তালাক। এভাবে তিন তালাক সম্পন্ন হওয়ার কারণে বায়েন মুগাল্লাযা (চূড়ান্ত বিচ্ছেদ) সংঘটিত হয়েছে। এখন স্ত্রী স্বামীর জন্য হালাল হবে না, যতক্ষণ না সে অন্য একজন পুরুষকে শরীয়তসম্মতভাবে বিয়ে করে এবং সেই বিবাহ স্বাভাবিকভাবে ভেঙে যায় (তালাক বা মৃত্যু)। আর হিল্লা বিবাহ — অর্থাৎ শুধু প্রথম স্বামীর কাছে ফিরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে সাজানো বিবাহ — মাকরুহে তাহরীমি ও গোনাহ, যা রাসূলুল্লাহ ﷺ অভিসম্পাত করেছেন।


১. তালাক পতিত হওয়ার বিশ্লেষণ

ক. প্রথম দিনের ঘটনা

স্বামী বলেছে: "তোকে তালাক দিলাম" — এতে এক তালাক পতিত হয়েছে। এটি সুস্পষ্ট ও স্পষ্ট উচ্চারিত তালাক, যা ইজমা অনুযায়ী পতিত হয়।

খ. দ্বিতীয় বাক্য: "তুই এখানে বেঁধে থাকিস না থাকলে তোকে তালাক দিব"

এই বাক্যটি শর্তসাপেক্ষ (তালাক মুআল্লাক) তালাক। প্রশ্নে বলা হয়েছে — স্ত্রী সেখানে ছিল (অর্থাৎ শর্ত পূর্ণ হয়েছে)।

ফিকহি মূলনীতি: শর্ত পূর্ণ হলে শর্তসাপেক্ষ তালাক পতিত হয়। ইবনু তাইমিয়্যাহ ও ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) এ মতকে শক্তিশালী বলেছেন।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষণীয়: প্রশ্নে বলা হয়েছে "এরপর স্বামী আবার তালাক দিলো" — অর্থাৎ শর্ত পূর্ণ হওয়ার পর স্বামী স্পষ্টভাবে তালাক দিয়েছে। এতে দ্বিতীয় তালাক পতিত হলো।

গ. ছয় মাস পর: "এক দফায় দুই তালাক"

এখানে দুটি সম্ভাবনা:

  1. যদি একই মজলিসে (এক বৈঠকে) দুই তালাক দেয়া হয় — তাহলে জমহুর ফুকাহার মতে দুই তালাকই পতিত হবে (এবং কারও মতে দ্বিতীয়টি বাতিল, কিন্তু জমহুরের মত প্রাধান্যপূর্ণ)।
  2. যদি ভিন্ন ভিন্ন সময়ে দুই তালাক দেয়া হয় — তাহলে স্পষ্টভাবে দুই তালাক পতিত।

ফলাফল: প্রথম দিনে ১ + ১ = ২ তালাক, ছয় মাস পর ২ তালাক = মোট ৪ তালাক (যদি সব পতিত হয়)। তবে তালাকের সংখ্যা তিনে পৌঁছালেই বায়েন মুগাল্লাযা হয়ে যায় — চতুর্থ তালাক আর কার্যকর হয় না।

দলিল: আল্লাহ তা'আলা বলেন:

"তালাক দুইবার। এরপর হয় সদ্ভাবে রাখা, নয়তো সুন্দরভাবে ছেড়ে দেওয়া।" (সূরা আল-বাকারা: ২২৯)

"অতঃপর যদি সে তাকে তালাক দেয় (তৃতীয়বার), তবে তারপর সে তার জন্য হালাল হবে না, যতক্ষণ না সে অন্য একজন স্বামীকে বিয়ে করে।" (সূরা আল-বাকারা: ২৩০)

সুতরাং প্রশ্নের বর্ণনা অনুযায়ী — তালাক পতিত হয়েছে এবং তিন তালাক সম্পন্ন হয়েছে।


২. হিল্লা বিবাহের বিধান

হিল্লা বিবাহ কী?

হিল্লা বিবাহ হলো — প্রথম স্বামীর কাছে ফিরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে স্ত্রীকে অন্য একজন পুরুষের সাথে সাজানো/চুক্তিভিত্তিক বিয়ে দেওয়া, যাতে সে সহবাসের পর তালাক দিয়ে দেয়।

হিল্লা বিবাহের হুকুম: ** মাকরুহে তাহরীমি ও গুনাহ**

হাদিস ১: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"আল্লাহর রাসূল সেই ব্যক্তির প্রতি অভিসম্পাত করেছেন যে হিল্লা করে এবং যার জন্য হিল্লা করা হয়।"

— (আবু দাউদ: ২০৭৬, তিরমিজি: ১১১৯, ইবনু মাজাহ: ১৯৩৪; শাইখ আল-আলবানি সহিহ বলেছেন)

হাদিস ২: ইবনু মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:

"আল্লাহর রাসূল ﷺ হিল্লাকারী ও হিল্লাকৃত ব্যক্তির প্রতি লানত করেছেন।"

— (নাসাঈ, তিরমিজি)

হাদিস ৩: উকবা ইবনু আমির (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল ﷺ বলেছেন:

"আমি কি তোমাদেরকে ভাড়াটে পুরুষ সম্পর্কে জানাব না?" সাহাবারা বললেন, "হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসূল!" তিনি বললেন: "সে হলো সেই ব্যক্তি যে হিল্লা করে। আল্লাহ সেই ব্যক্তির প্রতি লানত করেছেন যে হিল্লা করে এবং যার জন্য হিল্লা করা হয়।"

— (ইবনু মাজাহ: ১৯৩৬, হাকিম; সহিহ)

শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন:

"হিল্লা বিবাহ বাতিল ও হারাম। এটি ব্যভিচারের সমতুল্য। যে ব্যক্তি হিল্লার উদ্দেশ্যে বিয়ে করে, সে মুহসান (বিবাহিত) হিসেবেও গণ্য হবে না, বরং সে ব্যভিচারীর অন্তর্ভুক্ত।"

— (মাজমুউল ফাতাওয়া: ৩২/১৩৩)

শাইখ ইবনু উসাইমিন (রহ.) বলেন:

"হিল্লা বিবাহ হারাম। কারণ রাসূল ﷺ হিল্লাকারী ও হিল্লাকৃতের প্রতি লানত করেছেন। আর যে ব্যক্তি হিল্লার উদ্দেশ্যে বিয়ে করে, তার এই বিয়ে সহিহ নয় — কারণ উদ্দেশ্যই হারাম।"

— (শারহুল মুমতি: ১৩/২৪৭)


৩. তাহলে শরীয়তসম্মত পথ কী?

তিন তালাকের পর স্ত্রী প্রথম স্বামীর জন্য হালাল হওয়ার একমাত্র পথ:

  1. স্ত্রী অন্য একজন মুসলিম পুরুষকে স্বাভাবিকভাবে বিয়ে করবে — কোনো হিল্লার চুক্তি বা উদ্দেশ্য ছাড়া, বরং স্থায়ী সংসারের নিয়তে।
  2. সেই বিবাহে সহবাস সংঘটিত হবে।
  3. এরপর যদি স্বাভাবিক কারণে (তালাক বা মৃত্যু) সেই বিবাহ ভেঙে যায় — তাহলে ইদ্দত শেষে সে প্রথম স্বামীর সাথে নতুন মোহর ও নতুন আকদে পুনরায় বিয়ে করতে পারবে।

দলিল: সূরা আল-বাকারা: ২৩০ — "যতক্ষণ না সে অন্য একজন স্বামীকে বিয়ে করে।"

হাদিস: আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল ﷺ বলেছেন:

"তোমরা কি জানো না যে, যখন সে (অন্য স্বামীর) মধু আস্বাদন করবে..." — অর্থাৎ সহবাস সংঘটিত হতে হবে।

— (বুখারি: ৫২৬০)


৪. গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা

  1. তালাকের সংখ্যা গণনা: যদি সত্যিই তিন তালাক সম্পন্ন হয়ে থাকে, তবে আর ফিরে আসার সুযোগ নেই — হিল্লা ছাড়া।
  2. হিল্লা বিবাহ জায়েজ নয়: এটি কবিরা গুনাহ, এবং এ ধরনের বিবাহে সহবাস করাও জায়েজ নয়।
  3. মিথ্যা বা ভুল বোঝাবুঝি: যদি তালাকের শব্দগুলো রাগের বশে বা স্পষ্ট ইচ্ছা ছাড়া উচ্চারিত হয়, তবে একজন বিশ্বস্ত আলিমের কাছে সরাসরি গিয়ে বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে ফতোয়া নেওয়া উচিত — কারণ প্রতিটি শব্দের ধরন ও নিয়ত গুরুত্বপূর্ণ।
  4. ইদ্দত: তালাকের পর স্ত্রীকে ইদ্দত পালন করতে হবে (তিন হায়েজ বা তিন মাস, গর্ভবতী হলে সন্তান জন্ম পর্যন্ত)।

সারসংক্ষেপ

| বিষয় | বিধান | |------|------| | প্রথম দিনে ১ তালাক | পতিত | | শর্তসাপেক্ষ তালাক (শর্ত পূর্ণ) | পতিত | | ছয় মাস পর ২ তালাক | পতিত | | মোট | তিন তালাক সম্পন্ন — বায়েন মুগাল্লাযা | | পুনর্বিবাহ | হিল্লা ছাড়া হারাম | | হিল্লা বিবাহ | মাকরুহে তাহরিমী ও গুনাহ | | শরীয়তসম্মত পথ | স্বাভাবিকভাবে অন্যত্র বিয়ে → সহবাস → স্বাভাবিক বিচ্ছেদ → ইদ্দত → নতুন আকদ |

আল্লাহই সর্বজ্ঞ।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.