স্বামী ৬ মাস আগে দুই তালাক ও ৬ মাস পর আবার দুই তালাক দিলে মোট কয় তালাক পতিত হবে?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
তালাক সংক্রান্ত মাসআলা: ৬ মাস আগে দুই তালাক, ৬ মাস পর আবার দুই তালাক
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
একজন স্বামী ৬ মাস আগে তার স্ত্রীকে দুই তালাক দিয়েছে। এরপর ৬ মাস পর আবার দুই তালাক দিয়েছে। জানতে চাওয়া হয়েছে— ১. এতে কি তালাক পতিত হয়েছে? ২. স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনার অনুমোদন আছে কি?
সংক্ষিপ্ত উত্তর
হ্যাঁ, তালাক পতিত হয়েছে। প্রথমবার দুই তালাক এবং দ্বিতীয়বার দুই তালাক—মোট চার তালাক সংঘটিত হয়েছে। যেহেতু তিন তালাকের পর ইসলামী শরীয়তে স্ত্রী স্বামীর জন্য সম্পূর্ণ হারাম হয়ে যায় (তিন তালাক তথা বায়েন মুগাল্লাযা), তাই চার তালাকের ক্ষেত্রে স্ত্রী সম্পূর্ণভাবে হারাম হয়ে গেছেন।
স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনার কোনো অনুমোদন নেই—না নতুন আকদ দ্বারা, না অন্য কোনো উপায়ে। একমাত্র শরীয়তসম্মত পথ হলো: স্ত্রী অন্য একজন পুরুষকে শরীয়তসম্মতভাবে বিয়ে করবে, সেই স্বামীর সাথে স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবন যাপন করবে, এবং পরবর্তীতে যদি সেই স্বামী তাকে তালাক দেয় বা স্বামী মৃত্যুবরণ করে এবং ইদ্দত শেষ হয়—তবেই প্রথম স্বামী নতুন মোহর ও নতুন আকদে তাকে বিয়ে করতে পারবে (তাহলীল ব্যতীত)।
বিস্তারিত আলোচনা
১. তালাক গণনার মূলনীতি
হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, তালাক একটি ইজাবী (ঘোষণামূলক) বিষয়। স্বামী যখন স্পষ্টভাবে তালাক শব্দ উচ্চারণ করে বা লিখে জানায়, তখন তা কার্যকর হয়—চাই স্ত্রী উপস্থিত থাকুক বা না থাকুক, চাই স্ত্রী জানুক বা না জানুক।
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
الطَّلَاقُ مَرَّتَانِ ۖ فَإِمْسَاكٌ بِمَعْرُوفٍ أَوْ تَسْرِيحٌ بِإِحْسَانٍ "তালাক দুইবার। এরপর হয় যথাবিধি সংসার চালিয়ে যাওয়া, নয়তো সদ্ভাবে বিদায় দিয়ে দেওয়া।" — (সূরা আল-বাকারা: ২২৯)
فَإِن طَلَّقَهَا فَلَا تَحِلُّ لَهُ مِن بَعْدُ حَتَّىٰ تَنكِحَ زَوْجًا غَيْرَهُ "অতঃপর যদি সে তাকে তালাক দেয়, তবে সে তার জন্য হালাল হবে না, যতক্ষণ না সে অন্য স্বামীকে বিয়ে করে।" — (সূরা আল-বাকারা: ২৩০)
২. প্রথম দুই তালাকের পর অবস্থা
প্রথমবার দুই তালাক দেওয়ার পর:
- এটি তালাক বায়েন (অপূরণীয় তালাক) হিসেবে গণ্য হয়।
- ইদ্দত চলাকালীন স্বামী চাইলে নতুন আকদ ও নতুন মোহর ছাড়াই রুজু (ফিরিয়ে আনা) করতে পারত।
- কিন্তু ইদ্দত (তিন হায়েজ বা তিন মাস) শেষ হয়ে যাওয়ার পর, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তখন ফিরিয়ে আনতে হলে নতুন আকদ ও নতুন মোহর প্রয়োজন হতো।
- এখানে ৬ মাস পার হয়েছে, অর্থাৎ ইদ্দত অনেক আগেই শেষ। সুতরাং প্রথম দুই তালাকের পর সম্পর্ক সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন।
৩. দ্বিতীয়বার দুই তালাকের পর অবস্থা
দ্বিতীয়বার দুই তালাক দেওয়ার পর মোট তালাকের সংখ্যা দাঁড়ায় ৪।
হানাফি ফিকহের সুস্পষ্ট নীতি:
إذا وقعت الثلاث حرمت المرأة على الزوج حرمة مغلظة، لا تحل له حتى تنكح زوجاً غيره نكاحاً صحيحاً "তিন তালাক পতিত হলে স্ত্রী স্বামীর জন্য চিরস্থায়ীভাবে হারাম হয়ে যায়; সে অন্য স্বামীর সাথে সহীহ বিয়ে না করা পর্যন্ত প্রথম স্বামীর জন্য হালাল হবে না।" — (আল-হিদায়া, কিতাবুত তালাক)
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর ফতোয়া: তিন তালাকের পর স্ত্রী স্বামীর জন্য হারাম মুগাল্লাযা (কঠোরভাবে হারাম) হয়ে যায়। চার তালাকের ক্ষেত্রে তো কোনো সন্দেহই নেই।
ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন:
والثلاث تحرمها عليه حتى تنكح زوجاً غيره "তিন তালাক তাকে স্বামীর জন্য হারাম করে দেয়, যতক্ষণ না সে অন্য স্বামীকে বিয়ে করে।" — (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, কিতাবুত তালাক)
৪. স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনার অনুমোদন আছে কি?
উত্তর: নেই। চার তালাক পতিত হওয়ার কারণে স্ত্রী প্রথম স্বামীর জন্য সম্পূর্ণ হারাম।
ফিরিয়ে আনার একমাত্র শরীয়তসম্মত পথ (তাহলীল):
- স্ত্রী ইদ্দত শেষ করার পর অন্য একজন মুসলিম পুরুষকে সহীহ নিকাহ দ্বারা বিয়ে করবে।
- সেই স্বামীর সাথে স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবন যাপন করবে (শুধু কাগজে বিয়ে করে সাথে সাথে তালাক দেওয়ার চক্রান্ত তথা তাহলীল হারাম)।
- পরবর্তীতে সেই স্বামী যদি তাকে তালাক দেয় বা মৃত্যুবরণ করে এবং স্ত্রী ইদ্দত পালন করে—তবেই প্রথম স্বামী নতুন আকদ ও নতুন মোহর দ্বারা তাকে বিয়ে করতে পারবে।
হাদিসে এসেছে:
لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْمُحَلِّلَ وَالْمُحَلَّلَ لَهُ "রাসূলুল্লাহ (সা.) তাহলীলকারী এবং যার জন্য তাহলীল করা হয়—উভয়ের প্রতি লানত করেছেন।" — (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২০৭৬; সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১১১৯)
অর্থাৎ, শুধু হালাল করার উদ্দেশ্যে ভাড়া করা স্বামীর মাধ্যমে বিয়ে করানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও অভিশপ্ত।
বিশেষ সতর্কতা
-
তালাকের সংখ্যা গণনা: অনেক সময় স্বামী একই সাথে "তুমি তালাক, তুমি তালাক, তুমি তালাক" বললে তিন তালাক পতিত হয়। আবার কেউ কেউ "দুই তালাক" বললে দুই তালাক পতিত হয়। এখানে প্রশ্নে স্পষ্ট "দুই তালাক" বলা হয়েছে, তাই দুই তালাক ধরা হয়েছে।
-
তালাকের প্রকারভেদ: তালাক আহসান, হাসান, বা বেদআত—যেভাবেই দেওয়া হোক, সংখ্যা গণনায় তা প্রভাব ফেলে না। পতিত তালাক পতিত হয়েই থাকে।
-
মিথ্যা তথ্য বা ভুল বোঝাবুঝি: যদি স্বামী প্রথমবার দুই তালাক দেওয়ার পর ইদ্দতের মধ্যে রুজু করে ফেলে (নতুন আকদ ছাড়া), তাহলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতো। কিন্তু এখানে ৬ মাস পার হয়েছে—সুতরাং রুজুর কোনো সুযোগ নেই।
-
ফতোয়া জিজ্ঞাসা: এ ধরনের গুরুতর মাসআলায় সরাসরি কোনো মুফতি বা শরীয়ত আদালতের মাধ্যমে ফতোয়া নেওয়া উচিত। কারণ ব্যক্তিগত পরিস্থিতি ও শব্দের প্রকৃতি অনুযায়ী বিধান ভিন্ন হতে পারে।
সারসংক্ষেপ সিদ্ধান্ত
| বিষয় | বিধান | |------|------| | প্রথম দুই তালাক | পতিত হয়েছে (তালাক বায়েন) | | ৬ মাস পর দ্বিতীয় দুই তালাক | পতিত হয়েছে | | মোট তালাক | ৪ (তিনের অধিক) | | স্ত্রীর অবস্থা | স্বামীর জন্য হারাম মুগাল্লাযা | | ফিরিয়ে আনার অনুমোদন | নেই (তাহলীল ছাড়া) | | তাহলীলের শর্ত | সহীহ নিকাহ + স্বাভাবিক দাম্পত্য + পরবর্তীতে তালাক/মৃত্যু + ইদ্দত |
উপরোক্ত আলোচনার ভিত্তিতে: স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনার কোনো শরীয়তসম্মত অনুমোদন নেই। আল্লাহ তা'আলা উভয়কে সবর ও তাকওয়া অবলম্বন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।