স্বামী যদি ভবিষ্যৎ কালের শব্দে স্ত্রীকে তালাকের অধিকার দেন, তবে কি তা কার্যকর হয়?
Marriage and Divorce · Shafei
Question
শাফেয়ী মাজহাব অনুযায়ী, কোনো স্বামী যদি তার স্ত্রীকে তালাকের অধিকার দেওয়ার উদ্দেশ্যে ভবিষ্যৎ কালের শব্দ ব্যবহার করে বলে— "তুমি আমাকে ডিভোর্স দিয়া দিবা"; তবে কি এই কথায় ভবিষ্যত কালে "দিয়ে দিবা" বলার দ্বারা স্ত্রী চিরকালের জন্য ভবিষ্যত যেকোনো সময় নিজেকে তালাক নিজে নেওয়ার অধিকার বা 'তালাক-ই-তাফওয়েজ' পেয়ে যান?
অনুগ্রহ করে শাফেয়ী ফিকহ অনুযায়ী এর সঠিক সমাধান জানিয়ে উপকৃত করবেন।
Answer
তালাক-ই-তাফওয়েজ (তালাকের অধিকার প্রদান): শাফেয়ী ফিকহ অনুযায়ী বিধান
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم. الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على سيدنا محمد وعلى آله وصحبه أجمعين.
উত্তর
প্রশ্নে উল্লিখিত বাক্য যদি শর্তহীন কোনোরুপ প্রেক্ষাপট ছাড়াই বলে থাকে,সেক্ষেত্রে জবাবঃ-
"তুমি আমাকে ডিভোর্স দিয়া দিবা" — এখানে "দিয়া দিবা" (ভবিষ্যৎ কাল) শব্দ ব্যবহারের কারণে তাৎক্ষণিকভাবে তালাক-ই-তাফওয়েজ কার্যকর হয় না। বরং এটি ভবিষ্যতে স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার অধিকার প্রদান হিসেবে বিবেচিত হবে।
১. তালাক-ই-তাফওয়েজ কী?
তাফওয়েজ (تفويض) অর্থ হলো— স্বামী তার স্ত্রীকে নিজের তালাক দেওয়ার অধিকার প্রদান করা। শাফেয়ী মাজহাবে এটি সহীহ ও বৈধ, কারণ আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَإِنْ طَلَّقْتُمُوهُنَّ مِنْ قَبْلِ أَنْ تَمَسُّوهُنَّ (সূরা আল-বাকারা: ২৩৭)
আর রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
الطَّلَاقُ لِمَنْ أَخَذَ بِالسَّاقِ (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২০৮১)
অর্থাৎ তালাকের মূল অধিকার স্বামীর হাতে; তবে স্বামী চাইলে স্ত্রীকে এই অধিকার অর্পণ করতে পারে।
২. শাফেয়ী মাজহাবে তাফওয়েজের প্রকারভেদ
ইমাম নববী (রহ.) আল-মাজমু' গ্রন্থে এবং ইবনে হাজার হায়তামী (রহ.) তুহফাতুল মুহতাজ গ্রন্থে তাফওয়েজকে দু'ভাগে বিভক্ত করেছেন:
| প্রকার | বিবরণ | বিধান | |--------|--------|--------| | তাফওয়েজ মুতলাক (تفويض مطلق) | স্বামী বলে "তোমাকে তালাক দেওয়ার অধিকার দিলাম" — কোনো সময়সীমা বা শর্ত ছাড়া | স্ত্রী مجلس-এ (সেই বৈঠকে) ইচ্ছা করলে তালাক দিতে পারবে; مجلس শেষ হলে অধিকার বাতিল | | তাফওয়েজ মুকাইয়াদ (تفويض مقيد) | নির্দিষ্ট শর্ত বা সময়ের সাথে সংযুক্ত | শর্ত অনুযায়ী কার্যকর |
৩. প্রশ্নের বাক্যের বিশ্লেষণ
স্বামী বলল: "তুমি আমাকে ডিভোর্স দিয়া দিবা"
এখানে দু'টি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে:
(ক) ভবিষ্যৎ কালের শব্দ (দিয়া দিবা):
শাফেয়ী ফিকহের মূলনীতি হলো— তালাক বা তাফওয়েজের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত শব্দের স্পষ্টতা (সরীহ) ও ইঙ্গিত (কিনায়া) বিবেচ্য। "দিয়া দিবা" হলো ভবিষ্যৎ কালের ক্রিয়া, যা ওয়াদা (وعد) বা শর্তসাপেক্ষ ভবিষ্যৎ ঘোষণা বোঝায়।
ইমাম শাফেয়ী (রহ.) আল-উম্ম গ্রন্থে বলেন:
وإذا قال الرجل لامرأته: قد فوضت إليك أمرك، فطلقي نفسك متى شئت، فهذا جائز، ويكون لها أن تطلق نفسها في أي وقت شاءت
অর্থাৎ যদি স্বামী বলে "আমি তোমার বিষয় তোমার হাতে অর্পণ করলাম, তুমি যখন চাও নিজেকে তালাক দাও" — তবে এটি বৈধ এবং সে যখন চায় তখন তালাক দিতে পারবে।
কিন্তু এখানে প্রশ্নের বাক্যে "দিয়া দিবা" — যা ভবিষ্যতে দেওয়ার ওয়াদা। এটি সরাসরি তাফওয়েজ নয়, বরং তাফওয়েজের ওয়াদা।
(খ) চিরকালের জন্য অধিকার:
শাফেয়ী মাজহাবে তাফওয়েজ যদি মুতলাক (শর্তহীন) হয়, তবে তা সেই مجلسেই সীমাবদ্ধ থাকে (ইবনে হাজার, তুহফাতুল মুহতাজ)। চিরকালের জন্য অধিকার পেতে হলে স্বামীকে স্পষ্টভাবে বলতে হবে: "তুমি যেকোনো সময় নিজেকে তালাক দিতে পারবে" — যা একটি স্থায়ী অনুমোদন।
৪. সিদ্ধান্ত
প্রশ্নের বাক্য শর্তহীন অবস্থায়,কোনোরুপ প্রেক্ষাপট ছাড়াই "তুমি আমাকে ডিভোর্স দিয়া দিবা" — এর দ্বারা:
- তাৎক্ষণিক তালাক-ই-তাফওয়েজ কার্যকর হয় না — কারণ এটি ভবিষ্যৎ কালের ওয়াদা।
- স্ত্রী চিরকালের জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে তালাকের অধিকার পায় না — কারণ শাফেয়ী মাজহাবে মুতলাক তাফওয়েজ مجلس-এ সীমাবদ্ধ।
- তবে যদি স্বামী এই বাক্যের মাধ্যমে স্পষ্টভাবে ভবিষ্যতে যেকোনো সময় তালাক দেওয়ার অধিকার প্রদান করে — যেমন বলে "তুমি ভবিষ্যতে যখন চাও নিজেকে তালাক দিতে পারবে" — তবে তা তাফওয়েজ মুতলাক হিসেবে গণ্য হবে এবং স্ত্রী ইচ্ছামতো তালাক দিতে পারবে।
ইমাম রমলী (রহ.) নিহায়াতুল মুহতাজ গ্রন্থে বলেন:
ولو قال لها: طلقي نفسك متى شئت، كان لها ذلك أبداً
অর্থাৎ যদি স্বামী বলে "তুমি যখন চাও নিজেকে তালাক দাও", তবে সে সর্বদা তা করতে পারবে।