হালাল হারাম
Family Life · Hanafi
Question
Answer
বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম
জবাব,
১. এক নজরে মূল শরয়ী সিদ্ধান্ত:
না, কোনো অবস্থায়ই এই বিবাহ জায়েয হবে না। কেবল নিজের আবেগ, মায়া বা ভালোবাসার টানে এবং নফসের ইচ্ছা পূরণের জন্য এক মাযহাব ছেড়ে অন্য মাযহাব গ্রহণ করা ইসলামি শরীআতে অকাট্যভাবে হারাম ও নাজায়েয। এভাবে যদি বিবাহ বা আকদ করাও হয়, তবে শরীয়তের বিচারে তা সম্পূর্ণ বাতিল, অবৈধ ও যিনার সমতুল্য গণ্য হবে [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৭৬; দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড), পৃষ্ঠা: ২৩, ২৪, ২৫; ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (২১শ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৫২, ১৫৩]।
২. ফিকহী ও শরয়ী কারণসমূহের বিশদ বিশ্লেষণ:
ক) দুগ্ধপানের শরয়ী বিধান (হানাফী ও মালেকী মাযহাব):
- হানাফী ও মালেকী মাযহাবের অকাট্য সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, শিশুকালে দুধপানের বয়সে যদি কোনো শিশু অন্য কোনো নারীর সামান্য পরিমাণ (এমনকি এক ফোঁটা বা এক চোষা) দুধও পান করে, তবে এর মাধ্যমে চিরতরে 'হুরমতে রাযাআত' (দুগ্ধসম্পর্ক) সাব্যস্ত হয়ে যায় [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৭৬]।
- ফলে সেই মেয়েটি আপনার অকাট্য দুধবোন (Foster Sister) হয়ে গেছে। পবিত্র কুরআনের নির্দেশ অনুযায়ী, দুধবোন নিজের আপন পেটের বোনের মতোই চিরতরে বিবাহ করা হারাম [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৭৬, ১৭৭]।
খ) নফসের কামনায় মাযহাব পরিবর্তনের হুকুম (ইত্তিবাউল হাওয়া ও তাতাব্বুউর রুখাছ):
- ইসলামি ফিকহের সর্বসম্মত মূলনীতি হলো—নিজের বৈবাহিক স্বার্থ, শারীরিক চাহিদা বা আবেগ পূরণের জন্য মাযহাবের সহজ ফতোয়া খোঁজা (তাতাব্বুউর রুখাছ) অথবা এক মাযহাব ছেড়ে অন্য মাযহাবের দোহাই দেওয়া সম্পূর্ণ হারাম এবং নাফসের অনুগামিতা (ইত্তিবাউল হাওয়া / اتباع الهوى) [দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড), পৃষ্ঠা: ২৩, ২৪; ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (২১শ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৫২, ১৫৩]।
- আপনি নিজেই প্রশ্নে স্বীকার করেছেন যে, "হানাফী মাযহাবের দলিল শক্তিশালী মনে হয়েছে।" ফিকহের নিয়ম অনুযায়ী, যে ব্যক্তি একটি সিদ্ধান্তকে সত্য ও শক্তিশালী বলে জানে, সে যদি কেবল নিজের ভালোবাসা ও প্ররোচনার কারণে তা ছেড়ে অন্য মাযহাব অনুসরণ করে, তবে তা শরীয়তকে নিয়ে খেলা করার শামিল এবং তা সম্পূর্ণ বাতিল [দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড), পৃষ্ঠা: ২৪, ২৫]।
গ) শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবেও এই সুরতে জায়েয না হওয়া:
- যদিও শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবে ৫ বার পেট ভরে দুধপানের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু সেখানেও শর্ত হলো—দুধপানের সংখ্যা ও পরিমাণ সুনির্দিষ্টভাবে জানা থাকতে হবে।
- আপনি নিজেই উল্লেখ করেছেন যে, "দুধপানের সংখ্যা জানা নেই"। ফিকহী মূলনীতি অনুযায়ী, দুগ্ধপানের সংখ্যা ও পরিমাণে সন্দেহ থাকলে শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবেও সতর্কতা (احتياط) হিসেবে বিবাহ হারাম ও নাজায়েয থাকে [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৭৬; দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড), পৃষ্ঠা: ২৫]।
৩. আত্মিক ও মানসিক প্রবোধ (করণীয় উপদেশ):
১. দুধবোন নিজের আপন বোনের মতো: আল্লাহ তাআলা আপনার নিরাপত্তার জন্যই রক্ত ও দুধের সম্পর্কের মাঝে পবিত্রতার দেয়াল তুলে দিয়েছেন। একজন সুস্থ ও ঈমানদার পুরুষ যেমন নিজের আপন পেটের বোনকে অন্য পুরুষের সাথে বিবাহ হতে দেখে বা অন্য ঘরে যেতে দেখে কষ্ট পায় না, বরং আনন্দিত হয়; দুধবোনের ক্ষেত্রেও ঠিক সেই মন মানসিকতা তৈরি করাই ঈমানের দাবি। ২. শয়তানী ওয়াসওয়াসা ও কুচিন্তা পরিহার: "সে অন্য পুরুষের আনুগত্য করবে" বা "অন্য পুরুষ তাকে ভোগ করবে"—এই জাতীয় চিন্তাভাবনা শয়তানের সূক্ষ্ম প্ররোচনা ও ওয়াসওয়াসা। শয়তান আপনাকে হারাম সম্পর্কের দিকে ধাবিত করতে এই মানসিক যন্ত্রণা তৈরি করছে। ৩. আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোরবানি: যে ব্যক্তি আল্লাহর ভয়ে নিজের কোনো অবৈধ বা নিষিদ্ধ ভালোবাসাকে ত্যাগ করে, আল্লাহ তাআলা তাকে এর চেয়ে উত্তম ও পবিত্র জীবনসঙ্গী দান করেন এবং অন্তরে প্রশান্তি ঢেলে দেন। ৪. অতীতের জন্য তওবা ও দূরত্ব বজায় রাখা: অবিলম্বে তাঁর সাথে একা যোগাযোগ, কথা বলা বা কোনো প্রকার আবেগীয় সম্পর্ক পুরোপুরি বন্ধ করে দিন এবং আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করে মনকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য তওবা ও দো'আ করুন।
সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:
১. ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ১৭৬–১৭৭: (অধ্যায়: কিতাবুর রাযা / দুগ্ধপান অধ্যায় — অল্প পরিমাণ বা সুনির্দিষ্ট সংখ্যা না জানা থাকলেও দুগ্ধসম্পর্ক সাব্যস্ত হওয়া এবং দুধবোন চিরতরে হারাম হওয়ার ফিকহী মাসআলা) [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৭৬, ১৭৭]।
২. দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ২৩–২৫: (অধ্যায়: তাকলীদ ও ইজতেহাদ — নিজের ইচ্ছা, সুবিধা ও নফসের প্ররোচনায় মাযহাব পরিবর্তন বা সুযোগ-সুবিধা খোঁজা হারাম হওয়ার নীতি) [দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড), পৃষ্ঠা: ২৩, ২৪, ২৫]।
৩. ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (২১শ খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ১৫২–১৫৩: (অধ্যায়: বাবুত তাকলীদ — কামনাবাসনা ও ব্যক্তিগত স্বার্থে অন্য মাযহাব অনুসরণের অবৈধতা সংক্রান্ত ফতোয়া) [ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (২১শ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৫২, ১৫৩]।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।