কেবল দুধবোনকে বিবাহের জন্য মাযহাব পরিবর্তন করে অন্য মাযহাব গ্রহণ করা যাবে কি?
Family Life · Hanafi
Question
২)দুধ সম্পর্কে কোন মত শক্তিশালী?
Answer
বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম
##জবাব,
১ম প্রশ্ন: কেবল দুধবোনকে বিবাহের জন্য মাযহাব পরিবর্তন করে অন্য মাযহাব গ্রহণ করা এবং রাসুল (সা.)-এর 'সহজ জিনিস গ্রহণ করা'র হাদীসের প্রয়োগ:
ক) ব্যক্তিগত স্বার্থ ও নফসের চাওয়া পূরণে মাযহাব পরিবর্তন (তাতাব্বুউর রুখাছ):
ইসলামি শরীআতের সুনির্দিষ্ট ফিকহী মূলনীতি হলো—কোনো ব্যক্তি নিজের ব্যক্তিগত বৈবাহিক স্বার্থ, শারীরিক চাহিদা বা মনস্তাত্ত্বিক আবেগ পূরণের জন্য নির্দিষ্ট এক মাযহাব ছেড়ে অন্য মাযহাবের সহজ সুযোগ-সুবিধা অনুসন্ধান করা (তাতাব্বুউর রুখাছ / تتبع الرخص) কিংবা সহজ ফতোয়া গ্রহণ করা সর্বসম্মতিক্রমে হারাম ও নাজায়েয [ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (২১শ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৫২, ১৫৩; দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড), পৃষ্ঠা: ২৩, ২৪]। ফিকহের পরিভাষায় একে "ইত্তিবাউল হাওয়া" (إتباع الهوى বা প্রবৃত্তি ও নফসের দাসত্ব) বলা হয়। যদি কেবল ভালোবাসার খাতিরে মাযহাব পরিবর্তন করে বিবাহ করাও হয়, তবে তা শরীআতের বিচারে সম্পূর্ণ বাতিল ও যিনার সমতুল্য হিসেবে গণ্য হবে [ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (২১শ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৫২, ১৫৩]।
খ) হাদীসের "সহজ বিষয় গ্রহণ করা"-র সঠিক শরয়ী ব্যাখ্যা:
হাদীস শরীফে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর দুটি বৈধ বিষয়ের মধ্যে সহজটি গ্রহণ করার কথা এসেছে—তা ছিল উম্মতের উপর থেকে অপ্রয়োজনীয় কষ্ট দূর করার জন্য এবং সাধারণ হালাল কাজসমূহের ক্ষেত্রে। কিন্তু আল্লাহর নির্ধারিত হারাম ও নিষিদ্ধ সম্পর্কের সীমানাকে হালাল বানানোর জন্য মাযহাবের সুযোগ অনুসন্ধান করা এই হাদীসের অন্তর্ভুক্ত নয়। বরং হারাম ও বিবাহে নিষিদ্ধ সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইসলামি শরীআতের মূলনীতি হলো: "إذا اجتمع الحلال والحرام رجح الحرام" (অর্থাৎ, "যখন কোনো বিষয়ে হালাল ও হারামের সম্ভাবনা বা মতভেদ একত্রিত হয়, তখন হুরমত বা হারাম হওয়াই প্রাধান্য পায়") [ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১০ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৯৫]।
গ) শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবেও এ সুরতে বিবাহ অবৈধ:
এমনকি কেউ যদি হানাফী মাযহাব ছেড়ে শাফেয়ী বা হাম্বলী মাযহাব পূর্ণাঙ্গভাবে গ্রহণও করে, তথাপি এই বিশেষ সুরতে তাদের মাযহাবেও বিবাহ হারাম ও নাজায়েয থাকবে। কারণ শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবে পাঁচবার পেট ভরে দুধপানের শর্ত থাকলেও, তার জন্য সুনির্দিষ্ট সংখ্যা সুনিশ্চিত হওয়া আবশ্যক। আপনার যেহেতু দুধপানের "সংখ্যা জানা নেই", তাই শাফেয়ী ও হাম্বলী ফিকহ অনুযায়ীও সন্দেহ ও সতর্কতার (احتياط) খাতিরে বিবাহ হারাম ও অকার্যকর থাকবে [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (২য় খণ্ড), পৃষ্ঠা: ২২১; দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড), পৃষ্ঠা: ২৫]।
২য় প্রশ্ন: দুধপান (রাযাআত) সংক্রান্ত কোন মতটি শরীয়তের দৃষ্টিতে অধিক শক্তিশালী?
ফিকহে ইসলামীর দৃষ্টিতে হানাফী ও মালেকী মাযহাবের মতই অধিক শক্তিশালী, নিরাপদ ও সুন্নাহর সতর্কতার কাছাকাছি:
১. কুরআনের অকাট্য নির্দেশ:
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা দুধপানের কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা বা পরিমাণ শর্ত না করে সাধারণভাবে নির্দেশ দিয়েছেন:
﴿وَأُمَّهَاتُكُمُ اللَّاتِي أَرْضَعْنَكُمْ وَأَخَوَاتُكُم مِّنَ الرَّضَاعَةِ﴾
"তোমাদের সেসব মা যারা তোমাদের দুধপান করিয়েছেন এবং তোমাদের দুধবোন..." (সূরা নিসা: ২৩)।
এখানে সামান্য পরিমাণ দুধ শিশুর পেটে পৌঁছালেই তিনি দুধমা এবং তাঁর কন্যাসন্তান দুধবোন হয়ে যান [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (২য় খণ্ড), পৃষ্ঠা: ২২১]।
২. হাদীস শরীফের অকাট্য দালিলিক রূপ:
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেছেন:
«يحرم من الرضاع ما يحرم من النسب»
"জন্মসূত্রে যেসব রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয় হারাম হয়, দুধপানের সূত্রেও তারা চিরতরে হারাম হয়ে যায়।" [দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ৩৫]।
এক হাদীসে এসেছে, এক ব্যক্তি বিবাহ করার পর এক নারী এসে দাবি করলেন যে তিনি তাদের উভয়কে দুধ পান করিয়েছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) দুধপানের সংখ্যা বা পরিমাণ জিজ্ঞাসা না করেই তৎক্ষণাৎ তাদের বিবাহ বিচ্ছেদের নির্দেশ দিয়ে বললেন: "কীভাবে তোমরা একত্র থাকবে, অথচ এ কথা বলা হয়ে গেছে?!" [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (২য় খণ্ড), পৃষ্ঠা: ২২১]।
৩. সতর্কতা ও নিরাপত্তার দিক থেকে:
যেহেতু রক্ত বা দুধের সম্পর্কের সাথে বংশের পবিত্রতা ও যিনার মতো মারাত্মক গোনাহের বিষয় জড়িত, তাই সামান্য দুধ পেটে গেলেও সম্পর্ক হারাম হয়ে যাওয়ার হানাফী ও মালেকী ফতোয়াটি উম্মতের নৈতিক ও শরয়ী নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী ও নিরাপদ পথ [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (২য় খণ্ড), পৃষ্ঠা: ২২১]।
সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:
১. ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (২য় খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ২২১: (অধ্যায়: দুগ্ধপান/রাযাআত — ১ম মাসআলা: দুধপানের নির্দিষ্ট মেয়াদের ভিতর সামান্য বা বেশি দুধ পানে হুরমতে রাযাআত সাব্যস্ত হওয়া এবং দুধবোন চিরতরে হারাম হওয়ার বিধান) [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (২য় খণ্ড), পৃষ্ঠা: ২২১]।
২. ফাতাওয়া মাহমুদিয়া:
- ১০ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৯৫: (অধ্যায়: কিতাবুছ ছওম, পরিচ্ছেদ: রাযাআত — "إذا اجتمع الحلال والحرام رجح الحرام" অর্থাৎ হালাল-হারামের দ্বন্দ্বে হারামকেই প্রাধান্য দেওয়ার ফিকহী মূলনীতি) [ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১০ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৯৫]।
- ২১শ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৫২–১৫৩: (অধ্যায়: বাবুত তাকলীদ — নফসের খাহেশে ও সুবিধা পূরণে মাযহাব পরিবর্তন (তাতাব্বুউর রুখাছ) হারাম হওয়ার ফতোয়া) [ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (২১শ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১৫২, ১৫৩]।
৩. দরসুল ফিকহ:
- ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩৫: (অধ্যায়: কিতাবুত তাহারাত — দুধপানের দ্বারা রক্তসম্পর্কের ন্যায় চিরতরে হারাম সাব্যস্ত হওয়ার হাদীস) [দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ৩৫]।
- ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২৩–২৫: (অধ্যায়: তাকলীদ ও ইজতেহাদ — নফসের প্ররোচনায় সুবিধাবাদী ফতোয়া খোঁজার নাজায়েয হওয়ার বিবরণ এবং দুগ্ধপানের সংখ্যা সুনির্দিষ্ট না থাকলে শাফেয়ী মতানুসারেও হারাম থাকা) [দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড), পৃষ্ঠা: ২৩, ২৪, ২৫]।
পরামর্শ ও শেষ কথা:
আপনার মনের আবেগকে সংযত করে আল্লাহর অকাট্য হুকুমের সামনে নিজেকে সমর্পণ করাই প্রকৃত ঈমানের পরিচয়। নিজের আপন বোনের প্রতি যেমন কোনো কুরুচি বা বৈবাহিক চিন্তা রাখা সম্ভব নয়, এই দুধবোনকেও নিজের সহোদর বোনের মতো মনে করে তাঁর সুখ ও ভবিষ্যতের জন্য দো'আ করুন এবং তাঁর সাথে সমস্ত আবেগীয় বা গোপন যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ করুন। আল্লাহ তাআলা আপনাকে এর উত্তম প্রতিদান দান করবেন।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।