কাবিননামার ১৮ নং কলাম সম্পর্কে
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
কাবিননামার ১৮ নং কলামে স্ত্রীকে তালাকের অধিকার দেওয়া: অজ্ঞতাবশত হ্যাঁ লিখলে কী হবে?
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
বাংলাদেশে প্রচলিত কাবিননামার ১৮ নং কলামে (কিছু কাবিননামায় ১৯ বা ২০ নং) স্ত্রীকে তালাকের অধিকার প্রদানের ঘর থাকে। কাজী সাধারণত পাত্রকে না পড়িয়ে বা না বুঝিয়েই সেখানে "হ্যাঁ" লিখতে বলেন। পাত্র যদি না জানে যে সে স্ত্রীকে তালাকের অধিকার দিচ্ছে, বরং কাজীর নির্দেশে অন্ধভাবে "হ্যাঁ" লিখে দেয়—তাহলে শরীয়তের দৃষ্টিতে এই শর্ত কার্যকর হবে কি? স্ত্রী তালাকের অধিকার পাবে কি?
ফিকহি বিশ্লেষণ
১. তালাকের অধিকার হস্তান্তরের শরীয়তসম্মত পদ্ধতি (তাফবিজ)
ইসলামী শরীয়তে স্বামী তার স্ত্রীকে তালাকের অধিকার দিতে পারে। একে বলা হয় তাফবিজুত তালাক (تفويض الطلاق)। এর ভিত্তি কুরআনুল কারীম:
وَالْمُطَلَّقَاتُ يَتَرَبَّصْنَ بِأَنفُسِهِنَّ ثَلَاثَةَ قُرُوءٍ... "আর তালাকপ্রাপ্তা নারীরা নিজেদেরকে তিন হায়েজ পর্যন্ত অপেক্ষায় রাখবে..." — সূরা আল-বাকারা: ২২৮
আরও ইরশাদ হয়েছে:
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُل لِّأَزْوَاجِكَ إِن كُنتُنَّ تُرِدْنَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا وَزِينَتَهَا فَتَعَالَيْنَ أُمَتِّعْكُنَّ وَأُسَرِّحْكُنَّ سَرَاحًا جَمِيلًا "হে নবী! আপনার স্ত্রীদের বলে দিন, যদি তোমরা দুনিয়ার জীবন ও তার সৌন্দর্য কামনা কর, তবে এসো, আমি তোমাদের ভরণপোষণ দেব এবং সুন্দরভাবে বিদায় করে দেব।" — সূরা আল-আহযাব: ২৮
হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
الطَّلَاقُ لِمَنْ أَخَذَ بِالسَّاقِ "তালাকের অধিকার তার, যে পায়ে ধরে (অর্থাৎ স্বামীর)।" — মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ২৩০০; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ২০৮১
তবে স্বামী চাইলে এই অধিকার স্ত্রীকে হস্তান্তর করতে পারে। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, স্বামী যদি স্ত্রীকে বলে "তুমি নিজেকে তালাক দিতে পারবে" বা "তোমার হাতে তোমার তালাক"—তবে স্ত্রী নিজেকে তালাক দিতে পারবে।
রেফারেন্স:
- আল-হিদায়া, কিতাবুত তালাক, অধ্যায়: তাফবিজ
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন), খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৩০০-৩০৫
- ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৪২০
২. শর্ত আরোপের জন্য স্বামীর সচেতন সম্মতি জরুরি
তালাকের অধিকার হস্তান্তর একটি ইজাব-কবুল (প্রস্তাব-সম্মতি) ভিত্তিক চুক্তি। এতে স্বামীর পক্ষ থেকে স্পষ্ট সম্মতি প্রয়োজন। যদি স্বামী না জানে যে সে কী লিখছে বা কী বলছে, তাহলে তার সম্মতি শুদ্ধ নয়।
কাজীর দায়িত্ব ও কর্তব্য
কাজীর উপর আবশ্যক হলো, কাবিননামার প্রতিটি কলাম পাত্র-পাত্রীকে পড়ে শোনানো এবং বিশেষভাবে ১৮ নং কলামের অর্থ বুঝিয়ে দেওয়া। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
مَنْ غَشَّنَا فَلَيْسَ مِنَّا "যে আমাদের সাথে প্রতারণা করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।" — সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১০১
কাজী যদি না বুঝিয়ে "হ্যাঁ" লিখিয়ে নেয়, তবে সে আমানতদারিতে খিয়ানত করেছে। তবে এর দায় কাজীর উপর বর্তাবে, স্বামীর উপর নয়—যদি স্বামী প্রকৃতপক্ষে না জানে।
চূড়ান্ত ফতোয়া
যদি পাত্র প্রকৃতপক্ষে না জানে যে ১৮ নং কলামে "হ্যাঁ" লিখলে সে স্ত্রীকে তালাকের অধিকার দিচ্ছে, এবং কাজীও তাকে না বুঝিয়ে অন্ধভাবে "হ্যাঁ" লিখিয়ে নেয়—তাহলে শরীয়তের দৃষ্টিতে সেই তাফবিজ (অধিকার হস্তান্তর) সংঘটিত হবে না। স্ত্রী তালাকের অধিকার পাবে না।