মোহরানা মাফ করলেই কি তালাক হয়ে যায়?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আমার এক বোন বিয়ের সময় তার স্বামী মোহরানার টাকা মাফ চাইলে বলেছিলো যে টাকা লাগবেনা তবে আপনি কোনোদিন আমার মা বাবাকে গালি দিতে পারবেননা।
২০ বছরের সংসারের পর তাদের দাম্পত্য কলহ বাড়তে বাড়তে এখন খুব বড় পর্যায়ে গিয়েছে, কদিন আগে তাকে তার স্বামী মা তুলে গালি দিয়েছে। তারপর থেকে সে তার স্বামীর সাথে এক ঘরে থাকেনা, ছেলের রুমে শোয়, ছেলে তার বাবার সাথে শোয়। বোনের কথা হলো তার স্বামী তার জন্য এখন হারাম।
আর সে এ ঘটনার আগ থেকেই ডিভোর্স দিবে দিবে বললেও এ ঘটনার পর সে সিদ্ধান্তে অটল। ছেলের পরীক্ষা শেষ হলে এ বিষয়ে আগাবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আল্লাহ জানেন কি হবে।
তার কথা অনুযায়ী সে স্বামীর থেকে খারাপ ব্যবহার পেতে পেতে ও নিজে স্যাক্রিফাইজ করতে করতে বিতৃষ্ণা হয়ে গিয়েছে। আর একসময় সে না চাইতেও শেষ দিকের বছরগুলোতে আরেকজনের সাথে হারাম সম্পর্কে জড়ায়, কিন্তু সে বলে আল্লাহ জানে কি পরিমাণ হক তার স্বামী নষ্ট করেছে তার। তার কথা হলো এই ছেলের সাথে কল্যাণ থাকলে যেনো আল্লাহ তাকে মিলায় দেয়, তবে সে সন্তানের ক্ষতি কখনো হতে দিবেনা,,তাই ২ বছর ধরে সুযোগ থাকলেও সন্তানের পরীক্ষার জন্য অপেক্ষা করছে।
আর ২ য় ঘটনা আমার এক ভাইয়ের,,,, সে তার স্ত্রীর সাথে ঝগড়া বশত একবার বলে ফেলে যে 'তোকে তালাক দিয়ে দিলাম'। ( এটা ১৪৪৮ জিলহজের ১৫ তারিখের আশেপাশের ঘটনা।) তারপর তার স্ত্রী এটা সহ আরো অনেক কারণ জাহির করে তাকে ছেড়ে চলে যায়,,, কিন্তু তারপর তার পরিবার থেকে ফোন দিয়ে তারাই বিশেষ করে স্ত্রী ডিভোর্স চায়। ওই ভাই বলে সে তার স্ত্রী কে ছাড়তে চায়নি তখন। কিন্তু পরবর্তীতে তার স্ত্রী ওই ভাইয়ের গুনাহ এবং আরো অনেক গোপন কিছু তাকে ও তার পরিবারকে অপদস্ত করতে ছড়িয়ে দেয়,, ফলে এরপর ওই ভাই বলে সে তাকে নিয়ে কোনোদিনই সংসার করবেনা আর। শুধু তার ছেলেকে নিয়ে আসবে তার কাছ থেকে। ছেলের বয়স ৮+
আমার প্রশ্ন হলো,,,
১) ১ম ক্ষেত্রে কি তালাক হয়ে গিয়েছে? এ ঘটনাতে করণীয় কি?
২) ১ম ঘটনার নারীটির প্রতি আমার আচরণ ও ধারণা কেমন হবে? দোয়া কেমন হবে?
৩) ২য় ঘটনার ভাইয়ের কি তার স্ত্রীর সাথে তালাক হয়ে গিয়েছে?
৪) এমন অবস্থায় ২য় ভাইয়ের সন্তানের জন্য ইসলামে কি বিধান আছে?
৫) ওই সন্তানের জন্য মা বাবার পর দায়িত্ব কে কে পেতে পারে যথাক্রমে?
Answer
তালাক সংক্রান্ত প্রশ্নের বিস্তারিত উত্তর
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ
প্রশ্নগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সূক্ষ্ম। নিচে কুরআন, হাদীস ও হানাফী ফিকহের নির্ভরযোগ্য কিতাবের আলোকে ধারাবাহিকভাবে উত্তর দেওয়া হচ্ছে।
প্রথম ঘটনা: মোহরানা মাফ ও গালির শর্ত
প্রশ্ন ১: প্রথম ক্ষেত্রে কি তালাক হয়ে গেছে?
উত্তর: না, প্রথম ক্ষেত্রে তালাক হয়নি। কারণ:
১. মোহরানা মাফ করা তালাক নয় — মোহরানা মাফ করা একটি আর্থিক লেনদেন বা দান। এটি তালাকের কোনো প্রকার নয়। হানাফী ফিকহে মোহরানা মাফ করা বা ছেড়ে দেওয়া বৈধ, তবে তা তালাক হিসেবে গণ্য হয় না।
২. শর্ত আরোপ করা তালাক নয় — স্বামী বলেছিল "টাকা লাগবে না, তবে আপনি কোনোদিন আমার মা-বাবাকে গালি দিতে পারবেন না।" এটি একটি শর্ত বা ওয়াদা, তালাকের শর্ত নয়। তালাকের জন্য নির্দিষ্ট শব্দ বা ইঙ্গিত প্রয়োজন, যা এখানে নেই।
৩. গালি দেওয়া তালাকের কারণ নয় — স্ত্রী কর্তৃক শাশুড়িকে গালি দেওয়া একটি গুনাহ, কিন্তু তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে তালাক সংঘটিত করে না। তালাক কেবল স্বামীর ইচ্ছাকৃত ঘোষণা বা আদালতের মাধ্যমে হয়।
করণীয়:
- স্ত্রী যদি সত্যিই স্বামীর সাথে সংসার করতে না চান, তবে খুলা (মোহরানা ফেরত দিয়ে বিচ্ছেদ) বা তালাক চাওয়ার বিধান আছে। সরাসরি "হারাম" বলে দেওয়া ঠিক নয়।
- স্বামী-স্ত্রী উভয়ের উচিত আলেমদের পরামর্শ নিয়ে সমাধানের চেষ্টা করা। যদি সমাধান অসম্ভব হয়, তবে শরীয়তসম্মত পন্থায় বিচ্ছেদের ব্যবস্থা নেওয়া।
প্রশ্ন ২: প্রথম ঘটনার নারীটির প্রতি আমার আচরণ ও ধারণা কেমন হবে? দোয়া কেমন হবে?
উত্তর:
১. আচরণ: আপনার বোনের প্রতি আপনার আচরণ হবে সহানুভূতিপূর্ণ, সম্মানজনক ও ইসলামসম্মত। তাকে দোষারোপ না করে বরং সঠিক পথ দেখানো আপনার দায়িত্ব। তবে তার হারাম সম্পর্কের বিষয়টি তাকে তওবা করতে উৎসাহিত করুন।
২. ধারণা: তার প্রতি আপনার ধারণা হবে মধ্যপন্থী — তাকে ঘৃণা করবেন না, তবে তার গুনাহকে সমর্থনও করবেন না। ইসলামে গুনাহকে ঘৃণা করা হয়, গুনাহগারকে নয়।
৩. দোয়া: তার জন্য দোয়া করুন:
- হেদায়েতের দোয়া: "اللهم اهدها واهدنا" — হে আল্লাহ, তাকে ও আমাদের হেদায়েত দান করুন।
- কল্যাণের দোয়া: যদি তার স্বামীর সাথে কল্যাণ থাকে, তবে তাদের মিলিয়ে দিন; না থাকলে শরীয়তসম্মত বিচ্ছেদের ব্যবস্থা করুন।
- সন্তানের হেফাজতের দোয়া: সন্তানের ক্ষতি থেকে হেফাজতের দোয়া করুন।
দ্বিতীয় ঘটনা: "তোকে তালাক দিয়ে দিলাম" বলা
প্রশ্ন ৩: দ্বিতীয় ঘটনার ভাইয়ের কি তার স্ত্রীর সাথে তালাক হয়ে গেছে?
উত্তর: হ্যাঁ, এক তালাকে রজয়ী পতিত হয়ে গেছে।
প্রশ্ন ৪: এমন অবস্থায় দ্বিতীয় ভাইয়ের সন্তানের জন্য ইসলামে কি বিধান আছে?
উত্তর:
১. সন্তানের হেফাজত (হিদানাহ): ইসলামে সন্তানের হেফাজতের বিধান আছে। হানাফী মাযহাবে:
- ছেলে: ৭ বছর পর্যন্ত মায়ের কাছে হেফাজত থাকে, এরপর বাবার কাছে।
- মেয়ে: বালিগা হওয়া পর্যন্ত মায়ের কাছে হেফাজত থাকে (কিছু মত অনুযায়ী বিবাহ পর্যন্ত)।
- তবে: যদি মা ফাসিকা (গুনাহে লিপ্ত) হয় বা সন্তানের জন্য ক্ষতিকর হয়, তবে হেফাজত বাবার কাছে চলে যায়।
২. সন্তানের ভরণপোষণ (নাফাকা): সন্তানের ভরণপোষণ বাবার দায়িত্ব, যদি সন্তান বাবার কাছে থাকে বা না থাকে। মা যদি সন্তানকে দুধ খাওয়ায় বা লালন-পালন করে, তবে সে উজরত (পারিশ্রমিক) পেতে পারে।
৩. সন্তানের সাথে সম্পর্ক: তালাকের পরও সন্তানের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা যাবে না। বাবা-মা উভয়েরই সন্তানের প্রতি দায়িত্ব ও ভালোবাসা রাখা জরুরি।
প্রশ্ন ৫: ওই সন্তানের জন্য মা-বাবার পর দায়িত্ব কে কে পেতে পারে যথাক্রমে?
উত্তর: হানাফী মাযহাবে হিদানাহ (হেফাজত) এর ক্রম নিম্নরূপ:
ছেলের জন্য: ১. মা ২. মায়ের মা (নানী) ৩. মায়ের দাদি (নানীর মা) ৪. বাবা ৫. বাবার মা (দাদি) ৬. বাবার দাদি (দাদির মা) ৭. বাবার বাবা (দাদা) ৮. বাবার দাদা (পরদাদা) ৯. ভাই ১০. বোন ... ইত্যাদি।
মেয়ের জন্য: ১. মা ২. মায়ের মা (নানী) ৩. মায়ের দাদি ৪. বাবা ৫. বাবার মা (দাদি) ৬. বাবার দাদি ... ইত্যাদি।