আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।*প্রশ্ন:* আমার স্বামী আমাকে তালাক দিয়ে

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 6294
Questioner: Mumtahina
Question Asked: 03 Oct 2026, 01:05 AM
Reviewed & Published: 03 Oct 2026, 05:53 AM
Views: 6
Tokens: 4,883
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

*প্রশ্ন:* আমার স্বামী আমাকে তালাক দিয়েছে বলে দাবি করছে, কিন্তু সে আমাকে সরাসরি বা ফোনে স্পষ্ট ভাষায় ‘তালাক দিলাম’ বলেনি। শুধু বলেছে, ‘তোমার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই, ডিভোর্স হয়ে গেছে।’ আমাকে কোনো লিখিত তালাকনামা বা ডিভোর্স লেটারও দেয়নি এবং নির্ধারিত দেনমোহরও পরিশোধ করেনি।

এ অবস্থায় শরীয়তের দৃষ্টিতে কি তালাক কার্যকর হয়েছে? আর দেনমোহর পরিশোধ না করার হুকুম কী?

দয়া করে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে জানাবেন।

Answer

তালাক ও দেনমোহর সংক্রান্ত ফতোয়া

উত্তর (সংক্ষেপে):

আপনার স্বামী যদি শুধু বলে থাকে—"তোমার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই, ডিভোর্স হয়ে গেছে"—এবং স্পষ্টভাবে "তালাক দিলাম" বা "তালাক" শব্দ উচ্চারণ না করে থাকে, তাহলে শরীয়তের দৃষ্টিতে তালাক সংঘটিত হয়নি। কেননা হানাফি মাযহাবে তালাক সংঘটিত হওয়ার জন্য স্পষ্ট (সরীহ) শব্দ অথবা ইঙ্গিতবাহী (কিনায়া) শব্দের সাথে তালাকের নিয়ত অপরিহার্য। শুধু "ডিভোর্স হয়ে গেছে" বা "সম্পর্ক নেই" বললে—যদি সে তালাকের নিয়তও না করে থাকে—তালাক পতিত হয় না।

তবে সতর্কতা: যদি সে "ডিভোর্স হয়ে গেছে" বলার সময় তালাকের নিয়ত করে থাকে, তাহলে হানাফি মাযহাবে কিনায়া শব্দ হিসেবে এক তালাকে রাজয়ী (ফিরিয়ে আনা যায় এমন তালাক) পতিত হবে। নিয়তের বিষয়টি তার মুখেই নির্ভরশীল; আপনি নিশ্চিত না হলে সরাসরি তালাক হয়েছে বলে ধরে নেবেন না।

আর দেনমোহর পরিশোধ না করা তালাকের কার্যকারিতার উপর কোনো প্রভাব ফেলে না। দেনমোহর ছিল স্বামীর যিম্মায় একটি ঋণ; তালাক হোক বা না হোক, তা পরিশোধ করা তার উপর ওয়াজিব। ইচ্ছাকৃতভাবে না দেওয়া গুনাহ ও জুলুম। তবে দেনমোহর না দেওয়ার কারণে তালাক বাতিল বা অকার্যকর হয় না।


বিস্তারিত আলোচনা

১. তালাক সংঘটিত হওয়ার শর্ত (হানাফি মাযহাব)

হানাফি ফিকহ অনুযায়ী তালাক দুই প্রকার:

(ক) সরীহ (স্পষ্ট) শব্দ: যেমন—"তালাক", "তালাক দিলাম", "তোমাকে তালাক দিলাম", "তুমি তালাকপ্রাপ্তা" ইত্যাদি। এসব ক্ষেত্রে নিয়ত ছাড়াই তালাক পতিত হয়।

(খ) কিনায়া (ইঙ্গিতবাহী) শব্দ: যেমন—"তুমি আমার থেকে আলাদা", "তোমার সাথে সম্পর্ক নেই", "ডিভোর্স হয়ে গেছে", "তুমি মুক্ত" ইত্যাদি। এসব ক্ষেত্রে তালাকের নিয়ত থাকলে তালাক পতিত হয়, নিয়ত না থাকলে পতিত হয় না।

আল-হিদায়া ও রাদ্দুল মুহতার-এ স্পষ্ট আছে: "কিনায়া শব্দ দ্বারা তালাক তখনই পতিত হয় যখন তালাকের নিয়ত থাকে অথবা বাহ্যিক অবস্থা (হাল) তা প্রমাণ করে।" — (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুত তালাক; আল-হিদায়া, কিতাবুত তালাক)

আপনার বর্ণনা অনুযায়ী স্বামী স্পষ্ট "তালাক" শব্দ বলেনি, বরং কিনায়া ধরনের কথা বলেছে। সুতরাং নিয়ত ছাড়া তালাক পতিত হয়নি।

২. কুরআন ও সুন্নাহর দলিল

আল্লাহ তা'আলা বলেন:

"হে নবী! যখন তোমরা নারীদের তালাক দেবে, তখন তাদের ইদ্দতের হিসাব রেখে তালাক দেবে..." — (সূরা আত-তালাক: ১)

এখানে "তালাক" শব্দটি স্পষ্টভাবে ব্যবহৃত হয়েছে; শরীয়ত তালাককে একটি সুনির্দিষ্ট ঘোষণা হিসেবে নির্ধারণ করেছে।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা আমার উম্মতের অন্তরের কুমন্ত্রণা, ভুল ও বিস্মৃতিজনিত কাজ ক্ষমা করে দিয়েছেন।" — (সহীহ বুখারী, হাদিস: ৫২৬৯; সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১২৭)

অর্থাৎ স্পষ্ট উচ্চারণ ও নিয়ত ছাড়া কেবল মনের কথা বা অস্পষ্ট বাক্যে তালাক সংঘটিত হয় না।

৩. দেনমোহর পরিশোধ না করার হুকুম

আল্লাহ তা'আলা বলেন:

"আর তোমরা নারীদের তাদের দেনমোহর সন্তুষ্টচিত্তে দিয়ে দাও।" — (সূরা আন-নিসা: ৪)

"তোমরা তাদের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না..." — (সূরা আন-নিসা: ২৯)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"যার কাছে কারো হক (ঋণ) আছে, সে তা পরিশোধ করবে; নইলে কিয়ামতের দিন তা তার জন্য ক্ষতির কারণ হবে।" — (সহীহ বুখারী, হাদিস: ২৪০০-এর অধ্যায়)

হানাফি ফিকহে দেনমোহর স্বামীর যিম্মায় দীন (ঋণ) হিসেবে সাব্যস্ত হয়। তালাক দিলে বা না দিলে—সর্বাবস্থায় তা পরিশোধ করা ওয়াজিব। ইচ্ছাকৃতভাবে আটকে রাখা হারাম ও জুলুম।

ফাতাওয়া উসমানি-তে আছে: "দেনমোহর স্ত্রীর হক; তা আদায় না করা স্বামীর জন্য গুনাহ। তবে তা তালাকের বৈধতাকে প্রভাবিত করে না।" — (ফাতাওয়া উসমানি, কিতাবুন নিকাহ, দেনমোহর অধ্যায়)

৪. আপনার করণীয়

  1. নিশ্চিত হোন: স্বামী "ডিভোর্স হয়ে গেছে" বলার সময় তালাকের নিয়ত করেছিল কি না—তা সরাসরি বা বিশ্বস্ত সূত্রে জেনে নিন। নিয়ত ছাড়া তালাক হয়নি।

  2. সন্দেহ থাকলে: সরাসরি তালাক হয়েছে ধরে নেবেন না; বরং কোনো নির্ভরযোগ্য মুফতি বা দারুল ইফতায় সরাসরি বিষয়টি উপস্থাপন করুন।

  3. দেনমোহর: স্বামীকে দেনমোহর পরিশোধের জন্য বলুন। না দিলে স্থানীয় শরীয়াহ বোর্ড/দারুল কাযার মাধ্যমে দাবি করুন।

  4. ইদ্দত: যদি সত্যিই তালাক পতিত হয়ে থাকে (নিয়তসহ), তবে আপনাকে ইদ্দত পালন করতে হবে—তিন হায়েজ (মাসিক) অথবা গর্ভবতী হলে সন্তান প্রসব পর্যন্ত।

  5. সালাত ও দু'আ: আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন, ইস্তিখারা ও দু'আ করুন—যেন তিনি সঠিক পথ দেখান।


সারসংক্ষেপ

| বিষয় | হুকুম | |---|---| | স্পষ্ট "তালাক" শব্দ ছাড়া শুধু "ডিভোর্স হয়ে গেছে" বলা | নিয়ত ছাড়া তালাক পতিত হয় না | | নিয়ত থাকলে | এক তালাকে রাজয়ী পতিত হয় | | দেনমোহর পরিশোধ না করা | তালাকের কার্যকারিতা প্রভাবিত করে না; তবে তা ওয়াজিব ও ঋণ, না দেওয়া গুনাহ | | করণীয় | মুফতির কাছে সরাসরি বিষয় উপস্থাপন; দেনমোহর দাবি; প্রয়োজনে ইদ্দত পালন |

আল্লাহ তা'আলা আপনার বিষয়টি সহজ করে দিন এবং হক অনুযায়ী ফয়সালা দান করুন। আমিন।


আল্লাহ সর্বজ্ঞ।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.