কুরবানীতে গরু দেওয়া যায় কি
Qurbani-Slaughtering · Hanafi
Question
Answer
গরু কুরবানী করা কি কুরবানীর অংশ নয়? ইসলামের দৃষ্টিতে ব্যাখ্যা
প্রশ্নটির মাধ্যমে বোঝা যাচ্ছে যে, কেউ হয়তো বলেছেন যে গরু কুরবানী করা কুরবানীর অংশ নয়। এটি একটি ভুল ধারণা। ইসলামী শরিয়তের স্পষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী গরু, মহিষ, উট, ছাগল, ভেড়া, দুম্বা ইত্যাদি পশু কুরবানী করা জায়েজ এবং এটি কুরবানীরই অংশ। নিচে কুরআন, হাদিস ও হানাফি ফিকহের আলোকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হলো।
১. কুরআনে কুরবানীর পশুর প্রকারভেদ
কুরআনে কুরবানীর পশুর প্রকার নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা না হলেও সাধারণভাবে ‘বাহীমাতুল আন‘আম’ (চতুষ্পদ গৃহপালিত পশু) বলতে উট, গরু, ছাগল, ভেড়া প্রভৃতি বোঝানো হয়েছে। যেমন—
وَلِكُلِّ أُمَّةٍ جَعَلْنَا مَنْسَكًا لِيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ عَلَىٰ مَا رَزَقَهُمْ مِنْ بَهِيمَةِ الْأَنْعَامِ
“আর প্রত্যেক উম্মতের জন্য আমি কুরবানীর নিয়ম করেছি, যাতে তারা আল্লাহর নাম স্মরণ করে তাঁর দেওয়া চতুষ্পদ জন্তু যবেহ করার সময়।” (সূরা হজ, ২২:৩৪)
এখানে ‘বাহীমাতুল আন‘আম’ শব্দটি উট, গরু, ছাগল, ভেড়া—সবকিছুকেই অন্তর্ভুক্ত করে। তাই গরু ‘বাহীমাতুল আন‘আম’-এর অংশ, সুতরাং গরু কুরবানী কুরআনের নির্দেশনারই অংশ।
২. হাদিসে গরু কুরবানীর অনুমতি ও নির্দেশনা
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিজে ও সাহাবাগণ বিভিন্ন সময় গরু কুরবানী করেছেন এবং সাহাবাদের গরু কুরবানী করতে নির্দেশ দিয়েছেন।
-
হাদিস: হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
“একটি গরু সাত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানী করা যায় এবং একটি উটও সাত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানী করা যায়।” (সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১৩১৮; সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ২৮০৮)
এই হাদিস স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, গরু কুরবানী করা জায়েজ এবং এটি কুরবানীরই অংশ। একইভাবে একটি ছাগল বা ভেড়া এক ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানী করা যায় (সহীহ মুসলিম)।
-
হাদিস: হযরত জাবির (রা.) আরো বর্ণনা করেন:
“আমরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাথে হুদাইবিয়ায় উট ও গরু কুরবানী করেছি, সাত জন মিলে একটি গরু ও একটি উট কুরবানী করেছি।” (সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১৩১৮)
৩. হানাফি ফিকহে গরু কুরবানীর বিধান
হানাফি মাজহাবের বড় বড় কিতাবে গরু কুরবানী জায়েজ ও শরিয়তসম্মত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন): বলা হয়েছে, “উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, দুম্বা—এগুলো দ্বারা কুরবানী জায়েজ। গরু ও উট সাত অংশীদারে ভাগে কুরবানী করা যাবে।” (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩২৪)
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি মুহাম্মদ তাকী উসমানী): স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, “গরু, মহিষ ও উট প্রতিটি সাত জনের পক্ষ থেকে কুরবানী করা জায়েজ। আর ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা একজনের পক্ষ থেকে কুরবানী করা যায়।” (ফাতাওয়া উসমানী, ২/২২৩)
- বেহেশতি জেওর (হাকীমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভী): কুরবানীর পশুর তালিকায় গরুকেও রাখা হয়েছে এবং সাত ভাগে ভাগ করার নিয়ম বর্ণিত হয়েছে। (বাহিশ্তি জেওর, ৩য় খণ্ড, কুরবানী অধ্যায়)
৪. ভুল ধারণার কারণ ও উত্তর
কেউ কেউ বলে থাকেন যে “গরু কুরবানী কুরবানীর অংশ নয়” – এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। এর পেছনে হয়তো নিম্নোক্ত কারণ থাকতে পারে:
- ভুল তাফসির বা হাদিসের অপব্যাখ্যা: কোনো কোনো ব্যক্তি মনে করতে পারেন যে কুরবানী শুধু ছাগল বা ভেড়া দিয়েই করতে হবে, কিন্তু হাদিসে গরু ও উটও স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে।
- সাংস্কৃতিক সংশয়: ভারতীয় উপমহাদেশে গরুকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয় এবং কিছু সম্প্রদায় গরু যবেহ করাকে পাপ মনে করে। কিন্তু ইসলামী দৃষ্টিতে গরু যবেহ করা জায়েজ এবং এটি কুরবানীর অন্যতম অনুষঙ্গ।
- সাওয়াবের পরিমাণ: কেউ কেউ মনে করতে পারেন যে গরু কুরবানী করলে কম সাওয়াব হয়, কিন্তু বাস্তবে গরু কুরবানী করাও সুন্নত ও নবীপ্রথার অন্তর্ভুক্ত এবং এর সাওয়াবও নির্ধারিত।
৫. উপসংহার
ইসলামের দৃষ্টিতে গরু কুরবানী করা কুরবানীরই অংশ এবং এটি সম্পূর্ণ বৈধ, জায়েজ ও সুন্নত। কেউ যদি গরু কুরবানী না করার জন্য বলে বা ভুল ধারণা দেয়, তবে তা কুরআন-হাদিস ও হানাফি ফিকহের বিপরীত।
মুসলমানদের জন্য কর্তব্য হলো, সঠিক জ্ঞান অর্জন করে ইসলামের নির্দেশনা অনুযায়ী আমল করা। গরু কুরবানী করা আল্লাহর আদেশ পালনের একটি মাধ্যম এবং এটি আগের নবী-রাসূলদের থেকেও চলে আসা ইবাদত।
হানাফি মাযহাব অনুযায়ী: গরুতে সাত ভাগে কুরবানী করা যায়, এবং গরু কুরবানী করলে অন্যান্য পশুর মতোই সাওয়াব ও কবুলিয়তের আশা করা যায়। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ ও আমল করার তাওফিক দান করুন।