স্বামী যদি স্ত্রীকে বোন হিসেবে দেখে এবং শারীরিক সম্পর্কে অনিচ্ছুক থাকে, ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী স্ত্রীর করণীয় কী?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
**উত্তর **
بسم الله الرحمن الرحيم الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على أشرف الأنبياء والمرسلين، أما بعد:
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল। ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো ভালোবাসা, দয়া, পারস্পরিক অধিকার ও দায়িত্ব পালন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ "আর তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।" (সূরা আন-নিসা: ১৯)
আরেক আয়াতে ইরশাদ হয়েছে:
هُنَّ لِبَاسٌ لَكُمْ وَأَنْتُمْ لِبَاسٌ لَهُنَّ "তারা তোমাদের জন্য পোশাক এবং তোমরা তাদের জন্য পোশাক।" (সূরা আল-বাকারা: ১৮৭)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ "তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি সে, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম।" (তিরমিযী: ৩৮৯৫; ইবনে মাজাহ: ১৯৭৭)
আরও ইরশাদ হয়েছে:
وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ "আর নারীদের রয়েছে পুরুষদের উপর অধিকার, যেমন পুরুষদের রয়েছে নারীদের উপর অধিকার, নিয়ম অনুযায়ী।" (সূরা আল-বাকারা: ২২৮)
আপনার সমস্যার শরয়ী বিশ্লেষণ:
১. স্বামীর দায়িত্ব: বিবাহের পর স্বামীর উপর স্ত্রীর নিম্নলিখিত অধিকার রয়েছে—
- স্ত্রীর সাথে সদ্ভাবে বসবাস করা।
- স্ত্রীর ভরণপোষণ (নফকা) প্রদান করা।
- স্ত্রীর সাথে সময় কাটানো ও তার প্রতি মনোযোগ দেওয়া।
- স্ত্রীর সাথে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করা (সামর্থ্য থাকলে)।
২. স্বামীর এই আচরণ: আপনার স্বামী আপনাকে "বোন" হিসেবে দেখেন এবং শারীরিক সম্পর্কে অনিচ্ছুক—এটি ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে স্বামীর দায়িত্ব পালনে অবহেলা। তবে এটি সরাসরি তালাক বা বিচ্ছেদের কারণ হিসেবে বিবেচিত হবে কি না, তা নির্ভর করে তার মানসিক অবস্থা ও উদ্দেশ্যের উপর।
৩. সম্ভাব্য কারণ: হতে পারে—
- মানসিক বা শারীরিক কোনো সমস্যা (যেমন: হরমোনের সমস্যা, বিষণ্নতা, বা অতীতের কোনো ট্রমা)।
- বাল্যবিবাহ বা জোরপূর্বক বিবাহের কারণে মানসিক প্রস্তুতির অভাব।
- পারিবারিক চাপ বা অন্য কোনো সামাজিক কারণ।
- অথবা সে সত্যিই এই বিবাহে অনিচ্ছুক ছিল।
আপনার করণীয় (শরয়ী সমাধান):
১. ধৈর্য ও সংলাপ:
- রাগ বা অভিমান না করে শান্তভাবে কথা বলার চেষ্টা করুন। সরাসরি "তুমি আমাকে বোন দেখো" বলে চিৎকার করলে সে আরও দূরে সরে যাবে।
- তাকে বুঝান যে, ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক কেবল "ভাই-বোন" নয়; বরং এটি একটি পবিত্র বন্ধন যা আল্লাহ তাআলা Himself "মীসাকান গালীযা" (দৃঢ় অঙ্গীকার) বলেছেন (সূরা আন-নিসা: ২১)।
২. অভিভাবকদের হস্তক্ষেপ:
- যদি সরাসরি কথা বলে সমাধান না হয়, তাহলে উভয় পরিবারের বড়দের (বিশেষ করে তার বাবা-মা বা আপনার বাবা-মা) মাধ্যমে বিষয়টি তুলে ধরুন।
- ইসলামে পারিবারিক সমস্যা সমাধানে বড়দের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ বলেন:
وَإِنْ خِفْتُمْ شِقَاقَ بَيْنِهِمَا فَابْعَثُوا حَكَمًا مِنْ أَهْلِهِ وَحَكَمًا مِنْ أَهْلِهَا "আর যদি তোমরা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরোধের আশঙ্কা করো, তবে একজন মধ্যস্থতাকারী পাঠাও তার পরিবার থেকে এবং একজন তার (স্ত্রীর) পরিবার থেকে।" (সূরা আন-নিসা: ৩৫)
ডাক্তারি পরীক্ষা:
- যদি তার শারীরিক বা মানসিক সমস্যা থাকে, তবে ডাক্তারি পরীক্ষা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করুন।
** সবর ও দুআ:**
- আল্লাহর কাছে দুআ করুন। বিশেষ করে সূরা আল-ফুরকানের ৭৪ নং আয়াত পড়ুন:
رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا "হে আমাদের রব! আমাদের স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততিদেরকে আমাদের চোখের শীতলতা দান করুন এবং আমাদেরকে মুত্তাকীদের নেতা বানান।"
ধৈর্যের সীমা:
- যদি দীর্ঘ সময় (যেমন: ৬ মাস থেকে ১ বছর) ধরে সব প্রচেষ্টার পরও অবস্থার পরিবর্তন না হয় এবং স্বামী তার দায়িত্ব পালনে সম্পূর্ণ অবহেলা করে, তাহলে ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী খুলা' (বিচ্ছেদের জন্য স্ত্রীর আবেদন) বা তালাকের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে এটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এবং তা সরাসরি মুফতির পরামর্শ ছাড়া নেওয়া উচিত নয়।
গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা:
- আপনার স্বামী যদি মানসিকভাবে অসুস্থ হয় বা তার কোনো শারীরিক সমস্যা থাকে, তবে তাকে দোষারোপ না করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করুন।
- যদি সে ইচ্ছাকৃতভাবে অবহেলা করে এবং ইসলামী দায়িত্ব পালনে অস্বীকার করে, তাহলে তা শরীয়তের দৃষ্টিতে গুনাহ। তবে তালাক দেওয়া বা নেওয়ার সিদ্ধান্ত না করে ধৈর্য ধরে সমাধানের চেষ্টা করুন।
- কোনো অবস্থাতেই নিজে থেকে তালাকের সিদ্ধান্ত নেবেন না। প্রথমে পরিবারের বড়দের ও মুরব্বিদের পরামর্শ নিন।
সারসংক্ষেপ: আপনার স্বামীর এই আচরণ ইসলামী দায়িত্ব পালনে অবহেলা। আপনি প্রথমে ধৈর্য ধরে কথা বলুন, পরিবারের বড়দের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করুন, প্রয়োজনে ডাক্তারি ও কাউন্সেলিং করান। যদি সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং স্বামী তার দায়িত্ব পালনে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে, তাহলে পারিবারিক মুরব্বিদের পরামর্শে খুলা' বা বিচ্ছেদের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে সবর ও দুআ অব্যাহত রাখুন।
والله أعلم بالصواب