বাজি রাখা বা বিনিময় চাওয়া কি জায়েয?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
বেশ অনেক বছর আগে একবার আমার বড় ভাই হঠাত করে কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়, শয্যাশায়ী ছিল। পরিবারের আমরা সবাই অনেক ভেঙ্গে পড়ি। সেই পরিস্থিতিতে আমি নামাজ কালাম পরার পাশাপাশি , অজ্ঞতার দরুন আমি আল্লাহ তা'লার সাথে বিনিময় করতে চাই। বিনিময় স্বরুপ পরিবারের শান্তি, শৃংখলা, কষ্ট, সদ্য ফল দিতে শুরু করা দুটো গাছ, পারিবারিক সম্পর্কগুলোতে ভাংগন এরকম আরো কিছুর বিনিময় হিসেবে তার সুস্থতা কামনা করি এবং নিজে কিছু প্রতিজ্ঞা করি সম্ভবত এবং ভাবি এসব না করলে আপানার বান্দাকে আপনি ফিরিয়ে নিয়েন। আলহামদুলিল্লাহ, সে যাত্রায় সে সুস্থ হয়ে যায় এবং ধীরে ধীরে বেশীর ভাগ বিনিময়ের চাওয়া আসলেই ঘটে যায়। বর্তমানে আমাদের পরিবারে অনেক অশান্তি বিরাজ করে, নিজেদের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি, ফলের গাছ দুটো নেই, অনেক আশান্তির মাঝে আছি আমরা। এবং সে সময় আমি ভেবে বসি আমার ভাই সুস্থ হলে আমি আর চাইবো না যে আল্লাহ আমাদের শান্তি ফিরিয়ে দিন। কিন্তু বেশ অনেকগুলো বছর ধরেই চলমান চাপা কষ্ট গুলাতে হাপিয়ে উঠছি। ইদানিং আল্লাহর কাছে দোয়া করি " আল্লাহ আপনার অধম বান্দাকে মাফ করে দিন, আপনি তো মহান , দয়া করে আমাদের সেই সুন্দর দিন গুলো ফিরিয়ে দিন, দয়া করুন ইয়া রব্ব"।।
১। আল্লাহ তো মহান উনি কি ওনার রহমতের চাদরে আমাদের আবৃত করবেন না আর? আমি কি দুয়া করতে পারি নিজেরদের জন্য, শান্তির জন্য?
২। আমি নিজে যে সমস্ত প্রতিজ্ঞা করি করবো ভেবে কিন্তু পালন করছি না সেগুলোর জন্য কি আমি কাফফারা আদায় করতে পারি?
৩। অনেক সময় আমি নিজেকে কন্ট্রোল করতে না পেরে কষ্ট থেকে অভিসম্পাত করি, পরে অনেক ক্ষেত্রে সময় খারাপ লাগে আবার ভুল করি নি মনে হয় কিছু ক্ষেত্রে, পরিত্রাণের উপায় বলবেন।
Answer
উত্তর:
وَعَلَيْكُمُ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ
প্রথমেই জেনে রাখা জরুরি যে, আল্লাহ তাআলার সাথে বিনিময় বা শর্তারোপ করা (যেমন—"এসব দিলে ভাই সুস্থ হবে, না দিলে সুস্থ হবে না") ইসলামী আকীদার পরিপন্থি। আল্লাহর ইচ্ছা ও কুদরতের ওপর পূর্ণ বিশ্বাস রাখা ওয়াজিব। আপনি যা করেছেন তা ছিল অজ্ঞতাবশত, তাই আল্লাহ তা ক্ষমা করবেন ইনশাআল্লাহ। এখন আপনার প্রশ্নগুলোর জবাব দেওয়া হলো:
১. আল্লাহ কি রহমতের চাদরে আবৃত করবেন না? আমি কি দু‘আ করতে পারি?
হ্যাঁ, অবশ্যই পারেন এবং করা উচিত। আল্লাহর রহমত অপরিসীম। তিনি কুরআনে বলেছেন:
"হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের প্রতি জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেন। নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" (সূরা আয-যুমার: ৫৩)
আপনি আপনার তওবা ও ইস্তিগফারের সাথে পরিবারের শান্তির জন্য দু‘আ করতে পারেন। আপনার পূর্বের ভুল ধারণা (যেমন—"শান্তি ফিরিয়ে চাইব না") আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে নিন। আল্লাহ তওবা কবুলকারী। (সূত্র: মাআরিফুল কুরআন, ৮/৪২৭; ফাতাওয়া ওসমানি, ১/৩৪৫)
২. প্রতিজ্ঞা করেও না পালন করলে কাফফারা?
এখানে দু’ধরনের প্রতিজ্ঞা হতে পারে:
(ক) কোনো সৎকাজের প্রতিজ্ঞা (নযর):
যেমন—"ভাই সুস্থ হলে আমি ১০ টাকা সদকা করব" বা "একটি রোযা রাখব"। এটি শরিয়তের দৃষ্টিতে ওয়াজিব হয়ে যায়। তা আদায় না করলে কাফফারা দিতে হবে। কাফফারা হলো: দশজন মিসকিনকে দু’বেলা খাওয়ানো বা কাপড় দেওয়া, অথবা সামর্থ্য না থাকলে তিন দিন রোযা রাখা। (সূত্র: রদ্দুল মুহতার, ৩/৭০৬; ফাতাওয়া আলমগীরি, ১/৪২৩)
(খ) হারাম বা অপছন্দনীয় কাজের প্রতিজ্ঞা:
যেমন—"আমি আর আল্লাহর কাছে শান্তি চাইব না" বা "আমি পরিবারের সম্পর্ক ছিন্ন করব"। এটি নযর নয়, বরং গুনাহের প্রতিজ্ঞা। এর কোনো কাফফারা নেই, তবে তওবা করতে হবে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। (সূত্র: ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/২৮০)
তাই আপনার প্রতিজ্ঞাগুলো পর্যালোচনা করুন। যদি সৎকর্মের (যেমন সদকা, রোযা) প্রতিজ্ঞা করে থাকেন এবং তা পালন না করে থাকেন, তাহলে কাফফারা আদায় করুন। অন্যথায় শুধু তওবা করলেই যথেষ্ট।
৩. কষ্ট থেকে অভিসম্পাত করলে পরিত্রাণের উপায়?
অভিসম্পাত (লানত বা বদদু‘আ) করা মারাত্মক গুনাহ। বিশেষ করে নিজের পরিবার বা নিজের ওপর। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"মুমিন ব্যক্তি অভিসম্পাতকারী (লানতকারী) হয় না।" (তিরমিজি, হাদিস: ১৯৭৭)
পরিত্রাণের উপায়:
১. তওবা ও ইস্তিগফার—অভিসম্পাত করার পরই বলে ফেলুন, "আস্তাগফিরুল্লাহ, আমি তওবা করছি।"
২. রাগ নিয়ন্ত্রণ করুন—অভিসম্পাত সাধারণত রাগের বশে হয়। রাগ এলে ‘আউযুবিল্লাহ’ পড়ুন, চুপ থাকুন বা ওজু করুন। (সূত্র: বুখারি, হাদিস: ৬১১৪)
৩. দু‘আ করুন—আল্লাহর কাছে ধৈর্য ও শান্তি প্রার্থনা করুন। কুরআনে এসেছে:
"ধৈর্যশীলদেরই তাদের পুরস্কার অগণিতভাবে দেওয়া হবে।" (সূরা আয-যুমার: ১০)
৪. মনে রাখবেন—আপনার কষ্টের কারণেই আপনি এই অবস্থায় পড়েছেন। তাই বেশি বেশি সদকা, নফল নামাজ ও কুরআন তিলাওয়াত করুন।
সারকথা:
- আপনার পূর্বের ভুলের জন্য তওবা করুন।
- পরিবারের শান্তির জন্য দু‘আ করতে থাকুন।
- সৎ প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করলে কাফফারা দিন।
- অভিসম্পাত বাদ দিয়ে ধৈর্য ও ইস্তিগফারে অভ্যস্ত হোন।
আল্লাহ আপনার তওবা কবুল করুন ও পরিবারকে শান্তি দান করুন। আমীন।