পাত্রপক্ষ মেয়ের ছবি চাইলে দেওয়া কি জায়েজ আছে
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
পাত্রপক্ষ মেয়ের ছবি চাইলে দেওয়া কি জায়েজ আছে?
সংক্ষিপ্ত উত্তর
না, পাত্রপক্ষকে বিয়ের প্রস্তাবের সময় মেয়ের ছবি পাঠানো বা দেখানো ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েজ নয়। এটি পর্দা ও হিজাবের বিধান পরিপন্থী। তবে শরীয়তে বিয়ের প্রস্তাবের সময় পাত্র নিজে সরাসরি (পর্দার বিধান রক্ষা করে) পাত্রীকে দেখা বা তার সম্পর্কে জেনে নেওয়ার অনুমতি রয়েছে — কিন্তু ছবি আদান-প্রদান তার বিকল্প নয়।
বিস্তারিত আলোচনা
১. ছবি পাঠানো বা দেখা — মূল বিধান
ইসলামে নারীর সতর (শরীর) দেখা-দেখানো নিষিদ্ধ। ছবি মূলত ব্যক্তির অনুরূপ (প্রতিচ্ছবি), তাই ছবির মাধ্যমেও নারীর সৌন্দর্য দেখা বা দেখানো নিষিদ্ধতার অন্তর্ভুক্ত। বিশেষ করে বর্তমানে ছবি সহজে সংরক্ষণ, সম্পাদনা ও অপব্যবহারের আশঙ্কা থাকে, যা আরও বেশি নিষিদ্ধতার কারণ।
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا
"মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত করে এবং লজ্জাস্থান হেফাজত করে; আর তারা যেন নিজেদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, যা প্রকাশ্য তা ছাড়া।" — (সূরা আন-নূর: ৩১)
২. বিয়ের প্রস্তাবের সময় পাত্রীর প্রতি দেখা — শরীয়তের অনুমতি
শরীয়তে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার সময় পাত্রের জন্য পাত্রীকে দেখা বৈধ, তবে শর্তসহ:
হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِذَا خَطَبَ أَحَدُكُمُ الْمَرْأَةَ فَإِنِ اسْتَطَاعَ أَنْ يَنْظُرَ إِلَى مَا يَدْعُوهُ إِلَى نِكَاحِهَا فَلْيَفْعَلْ
"তোমাদের কেউ যখন কোনো নারীকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়, তখন যদি সে তার কাছে এমন কিছু দেখতে সক্ষম হয় যা তাকে বিয়ের প্রতি আগ্রহী করে, তবে সে যেন তা করে।" — (সুনানে আবু দাউদ: ২০৮২; মুসনাদে আহমাদ: ১৭৯২৫; মিশকাত: ৩২০৯)
শর্তসমূহ:
- পাত্র নিজে সরাসরি দেখবে, ছবির মাধ্যমে নয়।
- পাত্রী বা তার পরিবারের অনুমতিক্রমে দেখবে।
- পূর্ণ পর্দার বিধান রক্ষা করে, নির্জনতায় নয়, মাহরামের উপস্থিতিতে।
- শুধু চেহারা ও হাতের কব্জা পর্যন্ত দেখা যাবে (যা বিয়ের সিদ্ধান্তে সহায়ক)।
- কামনা-বাসনা নিয়ে দেখা যাবে না।
ফিকহী কিতাবে উল্লেখ: ইমাম কাসানী (রহ.) বলেন, "বিয়ের প্রস্তাবকারীর জন্য পাত্রীর চেহারা ও হাতের কব্জা দেখা মুস্তাহাব, কারণ এতেই সৌন্দর্য সম্পর্কে ধারণা হয়।" — (বাদায়েউস সানায়ে: ২/২৫৭)
ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) বলেন, "প্রস্তাবকারীর জন্য দেখা বৈধ, তবে শুধু চেহারা ও হাতের কব্জা পর্যন্ত।" — (রাদ্দুল মুহতার: ৬/৩৬৮)
৩. ছবি পাঠানো কেন জায়েজ নয়?
- ছবি = দেখা নয়: শরীয়ত যে "দেখা"র অনুমতি দিয়েছে, তা সরাসরি দৃষ্টি দ্বারা, ছবির মাধ্যমে নয়। ছবি সংরক্ষিত থাকে, যা অপব্যবহারের দরজা খুলে দেয়।
- পর্দার বিধান লঙ্ঘন: ছবি পাঠানোর অর্থ হলো পাত্রসহ অন্যান্য পুরুষের কাছে নারীর সৌন্দর্য প্রকাশ করা, যা পর্দার মূল উদ্দেশ্যের পরিপন্থী।
- ফিতনার আশঙ্কা: ছবি হাতে পেলে কেউ কেউ তা অপব্যবহার করতে পারে, ব্ল্যাকমেইল করতে পারে — যা সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে।
- ফকীহদের ফতোয়া: সমসাময়িক ফকীহগণ স্পষ্টভাবে বলেছেন, বিয়ের প্রস্তাবের সময়ও ছবি পাঠানো জায়েজ নয়।
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) বলেন: "বিয়ের প্রস্তাবের সময় পাত্রীকে দেখা শরীয়তসম্মত, কিন্তু ছবি পাঠানো বা মোবাইলে ছবি দেখা শরীয়তসম্মত নয়। কারণ ছবি সংরক্ষিত থাকে এবং অপব্যবহারের আশঙ্কা থাকে।" — (ফতোয়ায়ে উসমানি: ২/৩৩০-৩৩১)
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) বলেন: "ছবির মাধ্যমে পাত্রী দেখা শরীয়তের অনুমতির অন্তর্ভুক্ত নয়। শরীয়ত সরাসরি দেখার অনুমতি দিয়েছে, শর্তসহ।" — (ইমদাদুল ফতোয়া: ৪/২৩৫)
৪. পাত্রপক্ষের করণীয়
- ছবি চাওয়া বা পাঠানো থেকে বিরত থাকুন।
- পাত্রী সম্পর্কে জানতে চাইলে তার পরিবারের নিকট থেকে গুণাবলি, দ্বীনদারি, পরিবার, শিক্ষা ইত্যাদি সম্পর্কে জেনে নিন।
- সরাসরি দেখার ব্যবস্থা করুন — পাত্রীর পরিবারের অনুমতিক্রমে, মাহরামের উপস্থিতিতে, পর্দার বিধান রক্ষা করে।
- পাত্রী যদি সরাসরি দেখাতে সম্মত না হন, তবে তার সিদ্ধান্তকে সম্মান করুন; জোর করবেন না।
৫. পাত্রীর করণীয়
- ছবি পাঠাতে অস্বীকার করুন — এটি আপনার দ্বীনি দায়িত্ব।
- পরিবারকে বোঝান, শরীয়ত ছবি পাঠানোর অনুমতি দেয়নি।
- সরাসরি দেখার ব্যবস্থা হলে পর্দার বিধান রক্ষা করে দেখাতে পারেন, অথবা অভিভাবকের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিন।
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | বিধান | |------|------| | পাত্রপক্ষকে ছবি পাঠানো | নাজায়েজ | | পাত্রের সরাসরি দেখা (শর্তসহ) | জায়েজ/মুস্তাহাব | | ছবি চাওয়া | নাজায়েজ | | ছবি ছাড়া তথ্য জেনে বিয়ে | জায়েজ |
উপসংহার: পাত্রপক্ষ মেয়ের ছবি চাইলে দেওয়া জায়েজ নেই। শরীয়ত সরাসরি দেখার অনুমতি দিয়েছে শর্তসহ, কিন্তু ছবি আদান-প্রদান নয়। দ্বীনদারি ও চরিত্রের মানদণ্ডে বিয়ের সিদ্ধান্ত নিন, ছবির সৌন্দর্যে নয়।
References (হানাফি কিতাব)
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন শামী) — ৬/৩৬৮
- বাদায়েউস সানায়ে (ইমাম কাসানী) — ২/২৫৭
- ফতোয়ায়ে উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি) — ২/৩৩০-৩৩১
- ইমদাদুল ফতোয়া (মুফতি মুহাম্মদ শফি) — ৪/২৩৫
- ফতোয়ায়ে আলমগিরি — ৫/৩২৯
- আল-হিদায়া (ইমাম মারগিনানী) — ২/৩০৭
- সুনানে আবু দাউদ — হাদীস ২০৮২
- সূরা আন-নূর — আয়াত ৩১