পাত্রপক্ষ মেয়ের ছবি চাইলে দেওয়া কি জায়েজ আছে
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
উত্তর (ফতোয়া):
সংক্ষিপ্ত উত্তর: না, পাত্রপক্ষকে বিবাহের প্রস্তাবের উদ্দেশ্যে মেয়ের ছবি পাঠানো বা দেখানো ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েজ নয়। এটি পর্দার বিধান এবং ইসলামের সৌন্দর্যবোধের পরিপন্থী। তবে শরীয়তসম্মত পন্থা হলো—পাত্র নিজে সরাসরি দেখা (শরীয়তের সীমা রক্ষা করে) অথবা মেয়ের অভিভাবক বা নির্ভরযোগ্য মহিলার মাধ্যমে মেয়ের গুণাবলি ও অবস্থা জেনে নেওয়া।
বিস্তারিত আলোচনা:
১. পাত্র-পাত্রীর পরস্পরকে দেখা সম্পর্কে শরীয়তের বিধান:
ইসলামে বিবাহের পূর্বে পাত্র-পাত্রীর পরস্পরকে দেখা অনুমোদিত, তবে শর্তসহ। হাদিসে এসেছে—
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "যখন তোমাদের কারো অন্তরে কোনো নারীর সাথে বিবাহের প্রস্তাব জাগে, তখন যদি সে তার দিকে তাকানোকে (বিবাহের উদ্দেশ্যে) কল্যাণকর মনে করে, তবে সে যেন তা করে।" — (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২০৮২; মুসনাদে আহমাদ)
অন্য হাদিসে—
রাসূলুল্লাহ ﷺ মুগীরা ইবনে শু'বা (রাঃ)-কে বলেছিলেন: "তুমি তার দিকে তাকাও, কারণ এটা তোমাদের উভয়ের মধ্যে মিল-মহব্বত সৃষ্টি করবে।" — (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১০৮৭; সুনানে নাসাঈ)
তবে এই দেখা সরাসরি হতে হবে, শরীয়তের সীমা রক্ষা করে—যেমন মাহরামের উপস্থিতি, পূর্ণ পর্দা রক্ষা করে শুধু মুখমণ্ডল ও হাতের কব্জা দেখা। ছবি বা ভিডিওর মাধ্যমে দেখা শরীয়তসম্মত পন্থা নয়।
২. ছবি পাঠানো বা দেখানোর সমস্যা:
-
পর্দার বিধান লঙ্ঘন: মেয়ের ছবি পাত্র বা তার পরিবারের অমাহরাম পুরুষদের কাছে পাঠানো মানে মেয়ের সৌন্দর্য অমাহরামের কাছে প্রকাশ করা, যা কুরআনের নির্দেশের পরিপন্থী—
"তোমরা নারীদের বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত করে এবং লজ্জাস্থান হেফাজত করে; আর তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে..." (সূরা নূর: ৩১)
-
ছবি সংরক্ষণ ও অপব্যবহারের আশঙ্কা: ছবি একবার পাঠালে তা সংরক্ষণ, সম্পাদনা বা অপব্যবহারের ঝুঁকি থাকে। ইসলামে এমন যেকোনো কাজ নিষিদ্ধ, যা ফিতনার দরজা খুলে দেয়।
-
ফেতনার আশঙ্কা: ছবি দেখে পাত্রের মনে আকর্ষণ-বিকর্ষণ তৈরি হতে পারে, যা প্রকৃত উদ্দেশ্য (দ্বীনদারিতা ও চরিত্র) থেকে দৃষ্টি সরিয়ে দেয়।
৩. ফকীহদের অভিমত:
-
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার"-এ উল্লেখ করেছেন যে, বিবাহের প্রস্তাবের সময় পাত্র-পাত্রীর পরস্পরকে দেখা জায়েজ, তবে তা সরাসরি এবং শরীয়তের শর্তসাপেক্ষে; ছবির মাধ্যমে নয়। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড: ৫, পৃ: ২৩৭)
-
মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) "মা'আরিফুল কুরআন"-এ সূরা নূরের তাফসীরে বলেন, নারীর সৌন্দর্য অমাহরামের কাছে প্রকাশ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ; ছবি বা অন্য কোনো মাধ্যমে তা করা আরও গুরুতর।
-
মুফতি তাকি উসমানী (দা.বা.) "ফতোয়ায়ে উসমানী"-তে উল্লেখ করেছেন, বিবাহের প্রস্তাবের জন্য ছবি পাঠানো বা মোবাইলে ছবি দেখা শরীয়তসম্মত পন্থা নয়; বরং সরাসরি দেখা বা নির্ভরযোগ্য মহিলার মাধ্যমে তথ্য নেওয়া উচিত। (ফতোয়ায়ে উসমানী, খণ্ড: ২, পৃ: ৩২১)
-
হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভী (রহ.) "বেহেশতী জেওর"-এ বলেছেন, পাত্র-পাত্রীর দেখা সরাসরি হওয়া চাই; ছবি বা ভিডিওর মাধ্যমে নয়।
৪. শরীয়তসম্মত বিকল্প পন্থা:
১. সরাসরি দেখা: পাত্র নিজে মেয়ের অভিভাবকের অনুমতিক্রমে, মাহরামের উপস্থিতিতে, পর্দার বিধান রক্ষা করে মেয়ের মুখমণ্ডল ও হাতের কব্জা দেখতে পারে।
২. নির্ভরযোগ্য মহিলার মাধ্যমে তথ্য: পাত্রের মা, বোন বা অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য মহিলা মেয়েটিকে দেখে এসে তার রূপ, চরিত্র, দ্বীনদারিতা ও পারিবারিক অবস্থা সম্পর্কে জানাতে পারেন।
৩. গুণাবলির বিবরণ: মেয়ের দ্বীনদারিতা, চরিত্র, শিক্ষা, পারিবারিক অবস্থা ইত্যাদি লিখিত বা মৌখিকভাবে জানানো।
৪. মহিলাদের মাঝে ছবি বিনিময়: যদি একান্তই ছবির প্রয়োজন হয়, তবে শুধু মহিলাদের মাঝে (পাত্রের মা/বোন ও পাত্রীর মা/বোন) ছবি বিনিময় করা যেতে পারে, তবে পাত্রের কাছে তা পৌঁছানো যাবে না। তবে উত্তম হলো ছবির মাধ্যম সম্পূর্ণ পরিহার করা।
৫. সতর্কতা:
- পাত্রপক্ষের চাপে পড়ে মেয়ের ছবি পাঠানো উচিত নয়। এটি মেয়ের সম্মান ও পর্দার হেফাজতের বিষয়।
- অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের বিবাহের বিষয়ে শরীয়তসম্মত পন্থা অবলম্বন করা এবং ছবি চাওয়া-দেওয়ার মতো কাজ পরিহার করা।
- যদি কেউ ইতিমধ্যে ছবি পাঠিয়ে ফেলে, তবে তওবা করা এবং ভবিষ্যতে তা পরিহার করা কর্তব্য।
সারসংক্ষেপ:
পাত্রপক্ষকে মেয়ের ছবি দেওয়া বা পাঠানো ইসলামী শরীয়তে জায়েজ নয়। বিবাহের প্রস্তাবের সময় পাত্র-পাত্রীর পরস্পরকে দেখা শরীয়তসম্মত, তবে তা সরাসরি এবং পর্দার বিধান রক্ষা করে। ছবি বা ভিডিওর মাধ্যমে দেখা বা দেখানো শরীয়তের সীমা লঙ্ঘন এবং ফিতনার কারণ। শরীয়তসম্মত পন্থা হলো—সরাসরি দেখা অথবা নির্ভরযোগ্য মহিলার মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা।
আল্লাহ তা'আলা আমাদের সবাইকে শরীয়তসম্মত পন্থায় বিবাহ সম্পন্ন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।