রাগের মাথায় স্বামী বলেছে "তোমার সাথে থাকতে পারব না" — এতে কি তালাক পতিত হয়েছে?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 6225
Questioner: Afrin Islam
Question Asked: 01 Oct 2026, 11:17 PM
Reviewed & Published: 02 Oct 2026, 12:18 AM
Views: 16
Tokens: 5,616
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমার স্বামী আমাকে রাগের মাথায় ঝগড়ার সময় বলেছে যে সে মরে যেতে চায় আর বলেছে যে আমি বাঁচতে চাই না আরো কত কিছু বলেছে আর আমি তোমার সাথে থাকতে পারবো না , এখন এই কথার ধারা কি বিয়ে ভাঙার কোনো সমস্যা হয়েছে কি ? এরপর আমার স্বামী নাকি আমার শাশুড়ি সামনে বলেছে যে আমার সাথে সে থাকবে না আমার দেখবে না আমার গিফট এর জিনিস দিয়ে দিবে সব এরপর আমি আমার স্বামী কে জিজ্ঞেস করছি কিন্তু অমন ভাবে না কারণ সে রেগে যায় অল্প তে সে কোনো মতে বলেছে যে সে বলেছে মরে যেতে চায় তাই বলেছে আর নিয়ত এর কথা সে জানে না আর বলেছে হইতে পারে এমন নিয়ত করসি এখন সে যেহেতু বলেছে এমন নিয়ত করতে ও পারি ঐসময় যেসময় বলেছে যে তোমার সাথে থাকতে পারব না তুমি আমার জন্য না তমাকে বিয়ে করে ভুল করেছি এসব কথা যে যদি বলে নিয়ত হতেও পারে জানি না ঐসময় এর মাধ্যমে কি কোনো বিয়ে ভাঙার সমস্যা হয়েছে কি ?

Answer

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ

আপনার স্বামী রাগের মাথায় ঝগড়ার সময় বলেছে:

  1. "আমি মরে যেতে চাই, আমি বাঁচতে চাই না"
  2. "আমি তোমার সাথে থাকতে পারব না"
  3. শাশুড়ির সামনে বলেছে: "আমার সাথে সে থাকবে না, তাকে দেখব না, তার গিফটের জিনিস দিয়ে দিব"
  4. পরে বলেছে: "মরে যেতে চাই তাই বলেছি, নিয়তের কথা জানি না, হতে পারে এমন নিয়ত করেছি"
  5. "তোমার সাথে থাকতে পারব না, তোমাকে বিয়ে করে ভুল করেছি" — এসব যদি নিয়তসহ বলে থাকে?

ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ

১. তালাক সংঘটিত হওয়ার শর্তাবলি

হানাফী মাযহাব অনুযায়ী, তালাক সংঘটিত হওয়ার জন্য নিম্নলিখিত শর্তাবলি প্রয়োজন:

(ক) স্পষ্ট তালাকের শব্দ (صريح) বা ইঙ্গিতবাহী শব্দ (كناية) ব্যবহার করা

(খ) তালাকের নিয়ত থাকা — তবে স্পষ্ট শব্দে নিয়ত ছাড়াও তালাক পতিত হয়; ইঙ্গিতবাহী শব্দে নিয়ত বা পরিস্থিতির প্রমাণ প্রয়োজন।

আল-হিদায়া গ্রন্থে আছে: "وَأَمَّا الْكِنَايَاتُ فَلَا يَقَعُ بِهَا الطَّلَاقُ إِلَّا بِالنِّيَّةِ أَوْ دَلَالَةِ الْحَالِ" (ইঙ্গিতবাহী শব্দ দ্বারা তালাক পতিত হয় না, তবে নিয়ত বা অবস্থার প্রমাণ থাকলে হয়)

রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন) ৩/২৪৭: "الْكِنَايَةُ لَا يَقَعُ بِهَا الطَّلَاقُ إِلَّا بِالنِّيَّةِ أَوْ دَلَالَةِ الْحَالِ"


২. আপনার স্বামীর বাক্যগুলোর বিশ্লেষণ

(ক) "আমি মরে যেতে চাই, বাঁচতে চাই না"

এটি তালাকের শব্দ নয়। এটি মৃত্যু কামনার কথা, তালাকের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। এতে বিয়ে ভাঙে না।

(খ) "আমি তোমার সাথে থাকতে পারব না"

এটি কিনায়া (ইঙ্গিতবাহী) শব্দ। হানাফী মাযহাব অনুযায়ী, এই ধরনের শব্দে তালাক পতিত হতে হলে তালাকের নিয়ত থাকতে হবে অথবা অবস্থার প্রমাণ (দালালাতুল হাল) থাকতে হবে।

ফাতাওয়া আলমগীরী (১/৩৭৫): "الْكِنَايَاتُ لَا يَقَعُ بِهَا الطَّلَاقُ إِلَّا بِالنِّيَّةِ أَوْ دَلَالَةِ الْحَالِ"

আপনার স্বামী নিজেই বলেছে: "নিয়তের কথা জানি না, হতে পারে এমন নিয়ত করেছি" — অর্থাৎ সে নিশ্চিতভাবে তালাকের নিয়ত করেনি। শুধু "হতে পারে" বলা দ্বারা নিয়ত প্রমাণিত হয় না।

ইসলামী ফিকহের মূলনীতি: সন্দেহ দ্বারা তালাক পতিত হয় না।

রাদ্দুল মুহতার ৩/২৪৯: "الشَّكُّ لَا يَعْمَلُ عَمَلَهُ فِي الطَّلَاقِ"

(গ) "তুমি আমার জন্য না, তোমাকে বিয়ে করে ভুল করেছি"

এটিও কিনায়া শব্দ। তবে এটি তালাকের স্পষ্ট ইঙ্গিত নয়। রাগের মাথায় বলা এই কথায় তালাকের নিয়ত ছাড়া তালাক পতিত হয় না।

(ঘ) শাশুড়ির সামনে বলা কথা

"আমার সাথে সে থাকবে না, তাকে দেখব না, তার গিফটের জিনিস দিয়ে দিব" — এগুলো তালাকের শব্দ নয়। এগুলো বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন করার হুমকি বা মনোভাব প্রকাশ, কিন্তু তালাকের স্পষ্ট ঘোষণা নয়।


৩. রাগের মাথায় বলা তালাকের হুকুম

রাগের মাথায় বলা তালাক সম্পর্কে হানাফী মাযহাবের বিধান:

  • যদি রাগ এতটা তীব্র হয় যে বিবেক-বুদ্ধি লোপ পায় (যাকে বলে "গযবের শিদ্দত" বা "ইগলাক") — তাহলে সেই তালাক পতিত হয় না।
  • কিন্তু যদি রাগ স্বাভাবিক মাত্রার হয় এবং ব্যক্তি কী বলছে তা জানে — তাহলে তালাক পতিত হয়।

ফাতাওয়া উসমানী (২/৩০০) — মুফতি তাকী উসমানী: "غضب کی حالت میں اگر عقل زائل نہ ہو تو طلاق واقع ہو جاتی ہے، ورنہ نہیں"

আপনার বর্ণনায় দেখা যাচ্ছে আপনার স্বামী রাগের মাথায় কথাগুলো বলেছে, কিন্তু সে জ্ঞান-বুদ্ধি হারায়নি। তবে সে তালাকের নিয়ত করেনি — এটাই মূল বিষয়।


৪. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

উপরোক্ত আলোচনার ভিত্তিতে:

| বিষয় | হুকুম | |------|-------| | "মরে যেতে চাই" | তালাক নয় | | "তোমার সাথে থাকতে পারব না" | কিনায়া — নিয়ত ছাড়া তালাক নয় | | "তোমাকে বিয়ে করে ভুল করেছি" | কিনায়া — নিয়ত ছাড়া তালাক নয় | | শাশুড়ির সামনে বলা কথা | তালাক নয় | | স্বামী নিজেই বলেছে "নিয়ত জানি না" | নিয়ত প্রমাণিত নয় |

সিদ্ধান্ত: আপনার স্বামীর এসব কথার দ্বারা তালাক পতিত হয়নি। বিয়ে ভাঙেনি। আপনি এখনও তার স্ত্রী হিসেবে বহাল আছেন।

তবে সতর্কতা: যদি ভবিষ্যতে সে স্পষ্টভাবে "তালাক" শব্দ বলে বা তালাকের নিয়তসহ কিনায়া শব্দ বলে, তাহলে তালাক পতিত হবে। তাই এ বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।


৫. করণীয়

  1. স্বামী-স্ত্রী উভয়ে শান্তভাবে বসে কথা বলুন — রাগের মাথায় কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না।
  2. তালাকের বিষয়ে সতর্ক থাকুন — ভবিষ্যতে রাগের মাথায় তালাকের শব্দ ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন।
  3. পরিবারের বড়দের মাধ্যমে মীমাংসা করুন।
  4. প্রয়োজনে নির্ভরযোগ্য মুফতির কাছে সরাসরি মাসআলা জিজ্ঞেস করুন — কারণ এ বিষয়ে সঠিক ফতোয়া ব্যক্তিগত পরিস্থিতি জানা সাপেক্ষ।
  5. দুআ করুন — আল্লাহ আপনার সংসারকে বরকত দান করুন।

মা'আরিফুল কুরআন (সূরা নিসা ৩৫) — মুফতি মুহাম্মদ শাফী: "স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া হলে আল্লাহর নির্দেশ হলো: উভয় পক্ষের লোক দিয়ে মীমাংসা করানো"


রেফারেন্স (References)

  1. আল-হিদায়া — ইমাম বুরহানুদ্দীন আল-মারগীনানী
  2. রাদ্দুল মুহতার — ইবনে আবিদীন শামী (৩/২৪৭-২৪৯)
  3. ফাতাওয়া আলমগীরী (১/৩৭৫)
  4. ফাতাওয়া উসমানী — মুফতি তাকী উসমানী (২/৩০০)
  5. মা'আরিফুল কুরআন — মুফতি মুহাম্মদ শাফী
  6. ইমদাদুল ফাতাওয়া — মাওলানা আশরাফ আলী থানভী
  7. বেহেশতী জেওর — মাওলানা আশরাফ আলী থানভী

বিশেষ দ্রষ্টব্য: এটি একটি সাধারণ ফতোয়া। আপনার নির্দিষ্ট পরিস্থিতির সঠিক সমাধানের জন্য একজন নির্ভরযোগ্য মুফতির কাছে সরাসরি মাসআলা জিজ্ঞেস করা উত্তম। আল্লাহ আপনার সংসারকে হেফাজত করুন। আমীন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.