স্বামী রাগের মাথায় বলেছে "তোমার সাথে থাকতে পারব না", "মরে যেতে চাই" — এতে কি তালাক হয়েছে?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 6224
Questioner: Afrin Islam
Question Asked: 01 Oct 2026, 11:12 PM
Reviewed & Published: 02 Oct 2026, 12:22 AM
Views: 11
Tokens: 5,798
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমার স্বামী আমাকে রাগের মাথায় ঝগড়ার সময় বলেছে যে সে মরে যেতে চায় আর বলেছে যে আমি বাঁচতে চাই না আরো কত কিছু বলেছে আর আমি তোমার সাথে থাকতে পারবো না , এখন এই কথার ধারা কি বিয়ে ভাঙার কোনো সমস্যা হয়েছে কি ? এরপর আমার স্বামী নাকি আমার শাশুড়ি সামনে বলেছে যে আমার সাথে সে থাকবে না আমার দেখবে না আমার গিফট এর জিনিস দিয়ে দিবে সব এরপর আমি আমার স্বামী কে জিজ্ঞেস করছি কিন্তু অমন ভাবে না কারণ সে রেগে যায় অল্প তে সে কোনো মতে বলেছে যে সে বলেছে মরে যেতে চায় তাই বলেছে আর নিয়ত এর কথা সে জানে না আর বলেছে হইতে পারে এমন নিয়ত করসি এখন সে যেহেতু বলেছে এমন নিয়ত করতে ও পারি ঐসময় যেসময় বলেছে যে তোমার সাথে থাকতে পারব না ঐসময় এর মাধ্যমে কি কোনো বিয়ে ভাঙার সমস্যা হয়েছে কি ??

Answer

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ

আপনার স্বামী রাগের মাথায় ঝগড়ার সময় বলেছে:

  1. "আমি মরে যেতে চাই"
  2. "আমি বাঁচতে চাই না"
  3. "আমি তোমার সাথে থাকতে পারব না"
  4. শাশুড়ির সামনে বলেছে: "আমার সাথে সে থাকবে না, তাকে দেখব না, তার গিফটের জিনিস সব দিয়ে দেব"
  5. পরে জিজ্ঞেস করলে বলেছে: "মরে যেতে চাই বলেছি তাই বলেছি, নিয়তের কথা জানি না, হতে পারে এমন নিয়ত করেছি"

প্রশ্ন: এই কথাগুলোর দ্বারা কি বিবাহ ভেঙে গেছে (তালাক হয়েছে)?


উত্তর

সংক্ষিপ্ত উত্তর

না, শুধু এই কথাগুলোর দ্বারা আপনার বিবাহ ভাঙেনি। কারণ এখানে তালাকের সুস্পষ্ট শব্দ (সরীহ) ব্যবহার হয়নি, আর কোনো ইঙ্গিতবাহী শব্দ (কিনায়া) থেকেও তালাক পতিত হয়নি — কারণ আপনার স্বামী তালাকের নিয়ত করেনি এবং "তোমার সাথে থাকতে পারব না" এ ধরনের কথা তালাকের কিনায়া শব্দও নয়।

তবে সতর্কতা প্রয়োজন — ভবিষ্যতে এমন কথা বলা থেকে বিরত থাকা জরুরি।


বিস্তারিত দলিলসহ আলোচনা

১. তালাকের প্রকারভেদ (হানাফি ফিকহ অনুযায়ী)

হানাফি মাযহাবে তালাকের শব্দ দুই প্রকার:

(ক) সরীহ (স্পষ্ট) শব্দ: যেমন — "তালাক", "ফাসখ", "ছাড়া", "আজাদ" ইত্যাদি। এগুলোতে নিয়ত ছাড়াই তালাক পতিত হয়।

(খ) কিনায়া (ইঙ্গিতবাহী) শব্দ: যেমন — "তুমি হারাম", "তোমার সাথে থাকব না", "তুমি আমার জন্য নয়" ইত্যাদি। এগুলোতে নিয়ত বা অবস্থার প্রমাণ (দালালাতুল হাল) ছাড়া তালাক পতিত হয় না।

দলিল:
ইমাম কাসানী (রহ.) বলেন:
"الْكِنَايَاتُ لَا يَقَعُ بِهَا الطَّلَاقُ إِلَّا بِالنِّيَّةِ أَوْ دَلَالَةِ الْحَالِ"
(বাদায়েউস সানায়ে, খণ্ড ৩, পৃ. ২৭৭)

ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) বলেন:
"وَالْكِنَايَةُ لَا يَقَعُ بِهَا الطَّلَاقُ إِلَّا بِالنِّيَّةِ أَوْ دَلَالَةِ الْحَالِ"
(রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃ. ২৯৮)

২. আপনার স্বামীর কথাগুলোর বিশ্লেষণ

| কথাবার্তা | প্রকার | তালাক পতিত হবে? | |---|---|---| | "আমি মরে যেতে চাই" | তালাকের শব্দই নয় | না | | "আমি বাঁচতে চাই না" | তালাকের শব্দই নয় | না | | "আমি তোমার সাথে থাকতে পারব না" | কিনায়া (দুর্বল) | নিয়ত ছাড়া না | | "তোমাকে দেখব না, গিফটের জিনিস দিয়ে দেব" | কিনায়া নয়, বরং বিচ্ছেদের হুমকি | না |

"তোমার সাথে থাকতে পারব না" — এ কথাটি হানাফি ফিকহের পরিভাষায় তালাকের সুস্পষ্ট কিনায়া শব্দও নয়। এটি মূলত দাম্পত্য অসন্তোষের অভিব্যক্তি। তালাকের কিনায়া শব্দ হলো: "তুমি হারাম", "তুমি বাইন", "তোমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন", "তুমি آزাদ" ইত্যাদি।

দলিল:
ইমাম সারাখসী (রহ.) বলেন:
"وَلَيْسَ فِي هَذِهِ الْأَلْفَاظِ شَيْءٌ مِنْ أَلْفَاظِ الطَّلَاقِ لَا صَرِيحًا وَلَا كِنَايَةً"
(আল-মাবসূত, খণ্ড ৬, পৃ. ১৪২)

৩. আপনার স্বামীর বক্তব্য — "নিয়ত করিনি, জানি না"

আপনার স্বামী স্পষ্ট বলেছে:

  • "নিয়তের কথা জানি না"
  • "হতে পারে এমন নিয়ত করেছি"

হানাফি ফিকহে সন্দেহ (শাক) থাকলে তালাক পতিত হয় না। তালাকের জন্য নিয়ত নিশ্চিত (ইয়াকীন) হতে হবে।

দলিল:
ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) বলেন:
"وَلَا يَقَعُ الطَّلَاقُ بِالشَّكِّ، بَلْ لَا بُدَّ مِنَ الْيَقِينِ"
(রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃ. ২৯৯)

ফাতাওয়া আলমগিরিতে আছে:
"لَوْ قَالَ: لَا أُرِيدُ أَنْ أُطَلِّقَكِ، وَلَكِنْ لَا أَسْتَطِيعُ الْبَقَاءَ مَعَكِ، لَا يَقَعُ الطَّلَاقُ"
(ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃ. ৩৭৫)

৪. "মরে যেতে চাই" — এ কথার হুকুম

এ ধরনের কথা তালাকের সাথে সম্পর্কিত নয়। এটি রাগের মুহূর্তের আবেগপ্রসূত কথা। ইসলামে রাগের অবস্থায় বলা কথার জন্য বিশেষ বিধান রয়েছে, তবে তালাকের ক্ষেত্রে রাগের মাত্রা গুরুত্বপূর্ণ।

তবে সতর্কতা: যদি রাগ এতটা তীব্র হয় যে ব্যক্তির বিবেক-বুদ্ধি লোপ পায় (গযবের শিদ্দত), তাহলে হানাফি মাযহাবে সেই অবস্থায় বলা তালাকও পতিত হয় — কারণ হানাফি মাযহাবে "ইগলাক" (বুদ্ধি লোপ) তালাক পতিত হওয়া থেকে বিরত রাখে না। কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে যেহেতু তালাকের শব্দই বলা হয়নি, তাই এই আলোচনা প্রযোজ্য নয়।

দলিল:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"لَا طَلَاقَ فِي إِغْلَاقٍ"
(সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ২১৯৩ — তবে হানাফি মাযহাবে এই হাদিসের ব্যাখ্যা ভিন্ন)

৫. শাশুড়ির সামনে বলা কথাগুলো

"আমার সাথে সে থাকবে না, তাকে দেখব না, তার গিফটের জিনিস দিয়ে দেব" — এগুলো তালাকের শব্দ নয়, বরং বিচ্ছেদের ইচ্ছা প্রকাশ বা হুমকি। এতে তালাক পতিত হয় না।

দলিল:
ইমাম তাহতাবী (রহ.) বলেন:
"وَمَا كَانَ مِنَ الْكَلَامِ لَيْسَ فِيهِ ذِكْرُ الطَّلَاقِ وَلَا الْفِرَاقِ، فَهُوَ لَغْوٌ لَا يَقَعُ بِهِ شَيْءٌ"
(হাশিয়াতুত তাহতাবী আলা মিরকাতিল ফালাহ, পৃ. ৩২১)


গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ

১. আপনার বিবাহ এখনো বহাল আছে। তালাক হয়নি। আপনি এখনো আপনার স্বামীর স্ত্রী।

২. স্বামীকে বোঝান: রাগের মাথায় তালাকের মতো শব্দ বলা অত্যন্ত বিপজ্জনক। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"لَا يَتَزَوَّجُ الرَّجُلُ عَلَى غَضَبٍ" — অর্থ: রাগের অবস্থায় তালাকের সিদ্ধান্ত নিও না।
(মিশকাত, হাদিস ৩২৮২)

৩. ভবিষ্যতে সতর্কতা: যদি কখনো "তালাক" শব্দটি স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করেন, তাহলে নিয়ত ছাড়াই তালাক পতিত হবে। তাই রাগের সময় মুখ বন্ধ রাখা উত্তম।

৪. পারিবারিক পরামর্শ: উভয়ের মধ্যে শান্তিপূর্ণ আলোচনা, প্রয়োজনে পরিবারের বড়দের হস্তক্ষেপ, এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন।

৫. যদি সন্দেহ থাকে: স্থানীয় বিশ্বস্ত মুফতির কাছে সরাসরি গিয়ে বিস্তারিত বলুন, কারণ অনলাইনে পুরো পরিস্থিতি জানা সম্ভব নয়।


সারসংক্ষেপ

| প্রশ্ন | উত্তর | |---|---| | "তোমার সাথে থাকতে পারব না" — তালাক? | না, কারণ এটি তালাকের কিনায়া শব্দও নয়, আর নিয়তও নেই | | "মরে যেতে চাই" — তালাক? | না, এটি তালাকের শব্দই নয় | | শাশুড়ির সামনে বলা কথা — তালাক? | না, এটি হুমকি বা অসন্তোষ প্রকাশ | | নিয়ত সম্পর্কে স্বামীর সন্দেহ — তালাক? | না, সন্দেহে তালাক পতিত হয় না | | চূড়ান্ত রায় | বিবাহ বহাল আছে, তালাক হয়নি |


মূল রেফারেন্স:

  • রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন শামী) — খণ্ড ৩
  • বাদায়েউস সানায়ে (কাসানী) — খণ্ড ৩
  • আল-মাবসূত (সারাখসী) — খণ্ড ৬
  • ফাতাওয়া আলমগিরি — খণ্ড ১
  • ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি)
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী)
  • আল-হিদায়া (মারগীনানী)

আল্লাহ সর্বজ্ঞ।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.