তালাকের নিয়ত ও স্পষ্ট শব্দ ছাড়া তালাক হয় কিনা?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 6199
Questioner: koly akhi
Question Asked: 01 Oct 2026, 01:28 PM
Reviewed & Published: 01 Oct 2026, 01:40 PM
Views: 14
Tokens: 6,424
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

১.আসসালামু আলাইকুম ওরাহমাতুল্লাহ। স্ত্রী অভিমান করে ভাত খেতে না চাওয়ায় ।স্বামী বলে খাও।আর স্বামী বলতেছিল স্বামীকে খাইয়ে দিতে স্ত্রী বলে দিবে না।তারপর বলে আমার ভাত নষ্ট করবা না।আমার ভাত এগুলো। স্ত্রীর রাগ উঠে বলে খাব না মানে আমার ভাত এমন বলায়। স্ত্রী তালাকের নিয়তে বলে নি এমনিতে খাবে না বুঝিয়েছে।স্ত্রীকে পাওয়ার দেওয়া আছে তালাকের এতে কি কোন সমস্যা হবে?

আর এর কিছুক্ষণ আগে বলতেছিল বাসায় যাও মানে বাপের বাড়ি গিয়ে ঘুরে আসতে বলে।তহ স্ত্রী বলে তুমি কি আমাকে তাড়িয়ে দিতে চাইতেছ? স্বামী বলে হ্যা বাসায় গিয়ে ট্রেনিং নিয়ে এস।শিখে এস। মানে কিভাবে ব্যাবহার করতে হয় এটা।

২.একদিন হেসে হেসে একজন স্বামী বলতেছিল তুমাকে বাসা থেকে বের করে দিব তারপর দরজা বন্ধ করে দিব যাতে ডুকতে না পার।তহ স্ত্রী বলে মানে! বলে খালার স্বামী তহ খালাকে ছেড়ে দিতে চাইছিল।তহ স্বামী বলে আমি তহ ছেড়ে দিতে চায় না।মানে স্বামী তালাকের নিয়তে বলে নি। এতে কি কোন সমস্যা হয়?

Answer

উত্তর: স্ত্রীর সাথে কথোপকথনে তালাক পতিত হওয়ার বিধান

بسم الله الرحمن الرحيم الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على سيد المرسلين، وعلى آله وأصحابه أجمعين، أما بعد

ভূমিকা: তালাক সংঘটিত হওয়ার মূলনীতি

তালাক সংঘটিত হওয়ার জন্য তালাকের নিয়ত (ইচ্ছা) অথবা স্পষ্ট তালাকের শব্দ অপরিহার্য। রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:

إنما الأعمال بالنيات، وإنما لكل امرئ ما نوى "নিশ্চয়ই সকল কাজ নিয়তের উপর নির্ভরশীল, আর প্রত্যেক ব্যক্তি তাই পাবে যা সে নিয়ত করেছে।" — সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৯০৭

১ম প্রশ্নের বিশ্লেষণ

ঘটনার সারসংক্ষেপ:

  • স্ত্রী অভিমান করে ভাত খেতে চাইছিল না।
  • স্বামী বলল: "খাও।"
  • স্বামী আরও বলল: "আমাকে খাইয়ে দাও।" স্ত্রী বলল: "দিব না।"
  • স্বামী বলল: "আমার ভাত নষ্ট করো না, এগুলো আমার ভাত।"
  • স্ত্রী রাগের বশে বলল: "খাব না।"
  • স্ত্রী তালাকের নিয়তে বলেনি, বরং সাধারণভাবে "খাব না" বলেছে।

ফিকহি বিধান:

স্ত্রীর এই উক্তিতে কোনো তালাক পতিত হয়নি। কারণ:

১. তালাকের নিয়ত ছিল না — স্ত্রী শুধু রাগের বশে ভাত খেতে অস্বীকার করেছে, তালাকের ইচ্ছা করে বলেনি।

২. তালাকের স্পষ্ট শব্দও উচ্চারণ করেনি — "খাব না" এ ধরনের কথা তালাকের শব্দ (সরীহ) বা ইঙ্গিতবাহী (কিনায়া) শব্দের অন্তর্ভুক্ত নয়।

৩. তালাকের অধিকার স্ত্রীর হাতে থাকলেও — প্রশ্নে বলা হয়েছে "স্ত্রীকে পাওয়ার দেওয়া আছে তালাকের" অর্থাৎ স্বামী স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার ক্ষমতা অর্পণ করেছে (তাফবিজ)। কিন্তু তাফবিজের ক্ষেত্রেও তালাকের নিয়ত ও স্পষ্ট শব্দ অপরিহার্য। শুধু "খাব না" বললে তাফবিজ কার্যকর হয় না।

ইমাম সারাখসি রহ. বলেন:

التفويض لا يعمل إلا بالتصريح أو النية مع الكناية "তাফবিজ (তালাকের ক্ষমতা অর্পণ) কেবল স্পষ্ট শব্দ দ্বারা অথবা ইঙ্গিতবাহী শব্দের সাথে নিয়ত দ্বারা কার্যকর হয়।" — আল-মাবসুত, খণ্ড ৬, পৃ. ১৭৫

উপসংহার: এই ঘটনায় কোনো তালাক পতিত হয়নি। স্ত্রী-স্বামী উভয়ে পূর্বের মতোই বৈবাহিক সম্পর্কে বহাল আছেন।

"বাসায় যাও" প্রসঙ্গে:

স্বামী বলেছিল: "বাসায় যাও, বাপের বাড়ি গিয়ে ঘুরে আসো।" স্ত্রী বলল: "তুমি কি আমাকে তাড়িয়ে দিতে চাও?" স্বামী বলল: "হ্যাঁ, বাসায় গিয়ে ট্রেনিং নিয়ে এসো, শিখে এসো।"

এখানেও তালাকের কোনো নিয়ত বা স্পষ্ট শব্দ নেই। "বাসায় যাও" বা "ট্রেনিং নিয়ে এসো" — এগুলো তালাকের শব্দ নয়। বরং এটি স্বাভাবিক পারিবারিক কথোপকথন। এতে কোনো তালাক পতিত হয়নি।


২য় প্রশ্নের বিশ্লেষণ

ঘটনার সারসংক্ষেপ:

  • স্বামী হেসে হেসে বলল: "তোমাকে বাসা থেকে বের করে দিব, তারপর দরজা বন্ধ করে দিব যাতে ঢুকতে না পার।"
  • স্ত্রী বলল: "মানে! খালার স্বামী তো খালাকে ছেড়ে দিতে চাইছিল।"
  • স্বামী বলল: "আমি তো ছেড়ে দিতে চাই না।"
  • স্বামী তালাকের নিয়তে বলেনি, বরং হাসি-মশকরা করে বলেছে।

ফিকহি বিধান:

এই ঘটনাতেও কোনো তালাক পতিত হয়নি। কারণ:

১. তালাকের নিয়ত ছিল না — স্বামী হাসি-মশকরা করে কথাটি বলেছে, তালাকের ইচ্ছা করে নয়।

২. "বের করে দিব" শব্দটি তালাকের স্পষ্ট শব্দ নয় — এটি কিনায়া শব্দের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, তবে কিনায়া শব্দ দ্বারা তালাক পতিত হতে নিয়ত বা পরিস্থিতির প্রমাণ অপরিহার্য।

ইমাম কাসানি রহ. বলেন:

الكنايات لا يقع بها الطلاق إلا بالنية أو بدلالة الحال "কিনায়া শব্দ দ্বারা তালাক পতিত হয় না, তবে নিয়ত বা পরিস্থিতির দলীল থাকলে হয়।" — বাদায়েউস সানায়ে, খণ্ড ৩, পৃ. ১০০

৩. স্বামী নিজেই বলেছে "আমি ছেড়ে দিতে চাই না" — এটি স্পষ্ট প্রমাণ যে স্বামীর তালাকের কোনো ইচ্ছা ছিল না।

উপসংহার: এই ঘটনায়ও কোনো তালাক পতিত হয়নি। বৈবাহিক সম্পর্ক অটুট আছে।


গুরুত্বপূর্ণ ফিকহি নোট

তালাক পতিত হওয়ার শর্তসমূহ (হানাফি মাযহাব):

| শর্ত | বিবরণ | |------|--------| | ১. তালাকের নিয়ত | অন্তরে তালাক দেওয়ার ইচ্ছা থাকতে হবে | | ২. স্পষ্ট শব্দ (সরীহ) | যেমন: "তুমি তালাক", "তোমাকে ছেড়ে দিলাম" | | ৩. অথবা কিনায়া শব্দ + নিয়ত | যেমন: "বাসায় যাও" + তালাকের নিয়ত | | ৪. জ্ঞান ও ইচ্ছা | পাগল, নেশাগ্রস্ত, বা জোরপূর্বক অবস্থায় তালাক পতিত হয় না |

لا طلاق إلا بنية أو لفظ صريح "নিয়ত বা স্পষ্ট শব্দ ছাড়া তালাক হয় না।" — আল-হিদায়া, খণ্ড ২, পৃ. ৩৫৫

রাগের অবস্থায় তালাক:

রাগের অবস্থায় যদি তালাকের স্পষ্ট শব্দ উচ্চারণ করা হয়, তবে তালাক পতিত হয়। কিন্তু শুধু রাগের বশে মনের ভাব প্রকাশ করলে বা অস্পষ্ট কথা বললে তালাক পতিত হয় না। ইমাম তাহতাবি রহ. বলেন:

الغضب لا يمنع وقوع الطلاق إذا تلفظ به، لكن لا يقع بمجرد الغضب "রাগ তালাক পতিত হওয়াকে বাধা দেয় না যদি মুখে উচ্চারণ করে, কিন্তু শুধু রাগ দ্বারা তালাক পতিত হয় না।" — মিরকাতুল মাফাতিহ, খণ্ড ৫, পৃ. ২১০


চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

উভয় ঘটনাতেই কোনো তালাক পতিত হয়নি। কারণ:

✅ স্ত্রী বা স্বামী কেউই তালাকের নিয়ত করেনি ✅ কেউই তালাকের স্পষ্ট শব্দ উচ্চারণ করেনি ✅ কথাগুলো ছিল সাধারণ পারিবারিক কথোপকথন ও রাগ-অভিমানের প্রকাশ ✅ স্বামী নিজেই বলেছে "আমি ছেড়ে দিতে চাই না"

অতএব, উভয়ে পূর্বের মতোই বৈবাহিক সম্পর্কে বহাল আছেন। স্ত্রীকে পাওয়ার দেওয়া থাকলেও (তাফবিজ) তা কার্যকর হয়নি, কারণ তাফবিজের ক্ষেত্রেও তালাকের নিয়ত ও স্পষ্ট শব্দ অপরিহার্য।

পরামর্শ:

  • স্বামী-স্ত্রী উভয়ের উচিত রাগের সময় সংযত থাকা এবং তালাকের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করা।
  • রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "তালাক হলো আল্লাহর নিকট সবচেয়ে ঘৃণিত হালাল বিষয়।" — সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ২১৭৮
  • পারিবারিক কলহের সময় ধৈর্য ধারণ করা এবং মধুর ভাষায় কথা বলা কর্তব্য।

والله سبحانه وتعالى أعلم بالصواب والسلام عليكم ورحمة الله وبركاته


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.