ইজাব-কবুল ছাড়া শুধু কাগজে "স্বামী-স্ত্রী" লিখে স্বাক্ষর করলে নিকাহ হয় কি?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
হুজুর,
একটি মাসআলা জানার জন্য আপনার শরণাপন্ন হলাম।
ঘটনার বিবরণ:
১. একজন অবিবাহিত ছেলে এবং একজন অবিবাহিত মেয়ে (উভয়ই প্রাপ্তবয়স্ক, বিবেকবান এবং হানাফি মাযহাবের অনুসারী) নিজেদের স্বামী-স্ত্রী হিসেবে পরিচয় কাগজে লিখিতভাবে দিয়ে কাগজে স্বাক্ষর করেছেন সাক্ষীদের সামনে।
২.কাগজটি কোন কাবিননামা ছিল না,একটি দলিলের কাগজ ছিল যেখানে স্বামী স্ত্রী পরিচয় লিপিবদ্ধ করে ছেলে ও মেয়ে সেখানে সাক্ষীদের সামনে সাইন করেছে।
৩. সেখানে উপস্থিত সাক্ষীরাই মূলত তাদের বলেছিলেন, "আপনারা নিজেদের স্বামী-স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেন।" সাক্ষীদের কথা অনুযায়ীই তারা ওই কাগজে নিজেদের স্বামী স্ত্রী হিসাবে লিখে বা পরিচয় লিপিবদ্ধ করেন এবং স্বাক্ষর করেন, যেখানে সাক্ষীরাও জানতেন তারা পূর্বে অবিবাহিত ছিলেন।
জানার বিষয়:
ক) মুখে ইজাব ও কবুল (বিয়ের প্রস্তাব ও গ্রহণ) না করে, কেবল সাক্ষীদের কথায় কাগজের মধ্যে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে পরিচয় লিখে স্বাক্ষর করলে কি হানাফি মাযহাব অনুযায়ী তাদের বিবাহ সম্পন্ন হয়েছে?
খ) যদি কাগজে স্পষ্ট করে বিবাহের ইজাব-কবুলের শব্দ লেখা না থাকে, তবে শুধু "আমরা স্বামী-স্ত্রী" এই স্বীকারোক্তিতে ছেলে মেয়ের উভয়ের নিজ ইচ্ছায় স্বাক্ষর করার দ্বারা কি শরিয়তের দৃষ্টিতে নিকাহ (বিয়ে) সংঘটিত হয়?
গ) যদি এই কাজের মাধ্যমে বিবাহ সম্পন্ন না হয়ে থাকে,তবে মেয়েটি কি পরবর্তীতে শরিয়ত মোতাবেক অন্য কোনো ছেলেকে বিয়ে করতে পারবে? নাকি এর জন্য তাকে ওই ছেলের কাছ থেকে তালাক নিতে হবে?
কুরআন ও হাদিসের আলোকে সঠিক সমাধান জানিয়ে বাধিত করবেন।
জাজাকুমুল্লাহু খাইরান।
Answer
বিবাহের বৈধতা: ইজাব-কবুল ছাড়া শুধু লিখিত স্বীকারোক্তির হুকুম
উত্তর (হানাফি মাযহাব অনুযায়ী)
بسم الله الرحمن الرحيم الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على أشرف الأنبياء والمرسلين، أما بعد
মূল নীতি (প্রথমে জেনে নিন)
হানাফি মাযহাব অনুযায়ী নিকাহ সহীহ হওয়ার জন্য দুটি মূল রুকন (স্তম্ভ) অপরিহার্য:
১. ইজাব (প্রস্তাব) — পাত্রপক্ষ বা তাদের উকিলের পক্ষ থেকে বিয়ের প্রস্তাব। ২. কবুল (গ্রহণ) — পাত্রীপক্ষ বা তাদের উকিলের পক্ষ থেকে গ্রহণ।
এবং শর্ত হলো— একই মজলিসে (একই বৈঠকে) ইজাব ও কবুল শ্রবণযোগ্য শব্দে উচ্চারিত হওয়া, এবং দুইজন পুরুষ বা এক পুরুষ দুই মহিলা মুসলিম সাক্ষী উপস্থিত থাকা।
আল-হিদায়া গ্রন্থে ইমাম বুরহানুদ্দীন আল-মারগীনানী (রহ.) বলেন: "النكاح ينعقد بالإيجاب والقبول؛ لأن الشرع ورد به، ولا ينعقد بغير لفظ الإيجاب والقبول عندنا" (নিকাহ ইজাব ও কবুল দ্বারা সম্পন্ন হয়; কারণ শরীয়ত এটাই নির্ধারণ করেছে। আমাদের (হানাফি) মতে ইজাব-কবুলের শব্দ ছাড়া নিকাহ সংঘটিত হয় না।) — আল-হিদায়া, কিতাবুন নিকাহ
রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন শামী রহ.)-এ উল্লেখ আছে: "وينعقد بالإيجاب والقبول بلفظ الماضي، ولا بد من سماع الشاهدين كلامهما معاً في مجلس واحد" (নিকাহ ইজাব-কবুল দ্বারা সম্পন্ন হয়; এবং একই মজলিসে উভয়ের কথা সাক্ষীদ্বয়ের শোনা জরুরি।) — রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, কিতাবুন নিকাহ
প্রশ্ন (ক)-এর উত্তর
প্রশ্ন: মুখে ইজাব ও কবুল না করে, কেবল সাক্ষীদের কথায় কাগজে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে পরিচয় লিখে স্বাক্ষর করলে কি হানাফি মাযহাব অনুযায়ী বিবাহ সম্পন্ন হয়েছে?
উত্তর: না, এভাবে নিকাহ সম্পন্ন হয়নি।
কারণ:
- ইজাব-কবুল মুখে উচ্চারিত শব্দ হতে হবে (বা লিখিতভাবে হলেও তা ইজাব-কবুলের স্পষ্ট শব্দে হতে হবে এবং একই মজলিসে উভয়ের সম্মতি প্রকাশ পেতে হবে)।
- শুধু কাগজে "স্বামী-স্ত্রী" লিখে স্বাক্ষর করা ইজাব-কবুলের শব্দ নয়; এটি কেবল একটি স্বীকারোক্তি বা ঘোষণা।
- সাক্ষীদের কথায় প্রভাবিত হয়ে কাগজে সই করা নিকাহর ইজাব-কবুল হিসেবে গণ্য হবে না।
প্রশ্ন (খ)-এর উত্তর
প্রশ্ন: কাগজে স্পষ্ট ইজাব-কবুলের শব্দ না থাকলে, শুধু "আমরা স্বামী-স্ত্রী" এই স্বীকারোক্তিতে উভয়ের স্বাক্ষর দ্বারা কি নিকাহ সংঘটিত হয়?
উত্তর: না, এতে নিকাহ সংঘটিত হয় না।
কারণ:
- "আমরা স্বামী-স্ত্রী" — এটি একটি ইখবার (সংবাদ/ঘোষণা), ইজাব-কবুল নয়।
- নিকাহর জন্য প্রয়োজন إنشاء (সৃষ্টি/প্রতিষ্ঠা) — অর্থাৎ বিয়ের প্রস্তাব ও গ্রহণ।
- শুধু স্বীকারোক্তি দ্বারা নিকাহ প্রতিষ্ঠিত হয় না; বরং এটি ইকলাব (স্বীকারোক্তি) যা নিকাহর জন্য যথেষ্ট নয়।
প্রশ্ন (গ)-এর উত্তর
প্রশ্ন: যদি এই কাজের মাধ্যমে বিবাহ সম্পন্ন না হয়ে থাকে, তবে মেয়েটি কি পরবর্তীতে শরিয়ত মোতাবেক অন্য কোনো ছেলেকে বিয়ে করতে পারবে? নাকি তালাক নিতে হবে?
উত্তর: যেহেতু নিকাহই সংঘটিত হয়নি, তাই:
- তালাকের কোনো প্রয়োজন নেই — কারণ তালাক কেবল বৈধ নিকাহর পরই হয়।
- মেয়েটি সম্পূর্ণ স্বাধীন — সে শরিয়তসম্মত পন্থায় অন্য কোনো যোগ্য ছেলেকে বিয়ে করতে পারবে।
- ছেলেটির সাথেও তার কোনো শরয়ী সম্পর্ক নেই; তারা পরস্পর নামাহরাম হিসেবে বিবেচিত হবেন।
- তবে ইদ্দতেরও প্রয়োজন নেই কারন নিকাহই হয়নি।