তালাকের অধিকারপ্রাপ্ত স্ত্রী যদি বলে, "আমাকে আর কল দিও না", "সরে যাও", "তোমার সাথে থাকব না" — এসব কথা বললে কি তালাক পতিত হয়?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 6168
Questioner: khusbo KH
Question Asked: 30 Sep 2026, 11:42 PM
Reviewed & Published: 30 Sep 2026, 11:52 PM
Views: 14
Tokens: 7,683
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম।
হুজুর ১৮ নং ধারার অধিকার পেলে একটা মেয়ে কিভাবে কি বললে সমস্যা হয় সেটা আমি জানি। ( তালাক এর কথা বলতেছি)। আমি এটা মুখে উচ্চারণ ও করতে চাই না। তাই এভাবে বললাম। এখন আমি জানতে চাচ্ছি যে, আমার সাথে আমার হাসবেন্ড এর একটু রাগারাগি হয়েছিল। তখন আমি তাকে ম্যাসেজ দিয়ে বলেছিলাম যে, "আমাকে আর কল দিও না। কল দেয়ার দরকার নাই।". এই কথা ম্যাসেজ এ টাইপ করে লিখেছি কিন্তু মনে মনে অন্য কিছু বলে ফেলেছি। চলে আসছে মাথায় হঠাত করে। মেয়েরা তো দিতে পারে না। নিতে পারে।

১) মেয়েরা যেভাবে নেয় এমন করেই মনে মনে বলে ফেলেছি। আর তাকে ম্যাসেজ এ বলেছি "আমাকে আর কল দিল না" এখন কি আমার বিবাহিত জীবনে কোন সমস্যা হবে হুজুর? আমার বিবাহিত জীবন কি ঠিক আছে হুজুর? দয়া করে উত্তর দিবেন।

২) হুজুর হাসবেন্ড এর সাথে তো রাগ করা ঠিক না। কিন্তু মাঝে মাঝেই তো এভাবে বলি যে, আমাকে আর কল দিও না। সরে যাও তুমি। তোমার সাথে আর থাকবো না। আমি চলে যাবো বাপের বাড়ি। এখন এগুলো বলার সময় যদি কোনো মেয়ের নিতে পারার মত কথা চলে আসে মনে মনে তাহলে কি এগুলা কেনায়া বাক্য হবে? তালাকের অধিকার দেয়া হয়েছে এমন মেয়ে কি কেনায়া বাক্য বলতে পারবে?

৩) আমার আশে পাশে কোনো বিজ্ঞ মুফতি নাই। তাই চ্যাট জিপিটি কে হুবহু এই প্রশ্ন করেছি। চ্যাট জিপিটি কে আরো প্রশ্ন করেছি যে," মেয়েরা যদি নেয়ার মত করে বলে"- এভাবে এসব প্রশ্ন করার কারনে মানে শব্দগত কোনো ভুলে হয়ে থাকলে এতে কি কোনো সমস্যা হবে বিবাহিত জীবনে??

Answer

بسم الله الرحمن الرحيم

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নগুলো অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং গুরুত্বপূর্ণ। তালাকের বিষয়টি অত্যন্ত সূক্ষ্ম, তাই ধৈর্য ধরে পুরো উত্তরটি পড়ার অনুরোধ করছি। প্রথমেই একটি মূল বিষয় পরিষ্কার করে নিই:


মূলনীতি: তালাকের ক্ষেত্রে নিয়ত (ইচ্ছা) ও উচ্চারণের সম্পর্ক

হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, তালাক সংঘটিত হওয়ার জন্য দুটি উপাদান প্রয়োজন:

১. উচ্চারণ (শব্দ বা লিখিত) — যা স্পষ্ট (সরীহ) অথবা ইঙ্গিতবাহী (কেনায়া) ২. নিয়ত (ইচ্ছা) — অর্থাৎ তালাক দেওয়ার সংকল্প

সরীহ (স্পষ্ট) তালাকের শব্দে নিয়ত ছাড়াও তালাক পতিত হয়। কিন্তু কেনায়া (ইঙ্গিতবাহী) শব্দে নিয়ত বা পরিস্থিতির প্রমাণ ছাড়া তালাক পতিত হয় না।

আল-হিদায়া ও রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ আছে: "কেনায়া শব্দে তালাক নিয়ত বা দালালতুল হাল (পরিস্থিতির প্রমাণ) ছাড়া পতিত হয় না।" (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, তালাক অধ্যায়)


আপনার প্রশ্নের উত্তর

১) "আমাকে আর কল দিও না" — এই মেসেজে কি তালাক হবে?

উত্তর: না, ইনশাআল্লাহ আপনার বিবাহিত জীবনে কোনো সমস্যা হবে না।

কারণ:

  • "আমাকে আর কল দিও না" — এটি তালাকের কেনায়া শব্দও নয়। এটি সাধারণ রাগের কথাবার্তা।
  • তালাকের কেনায়া শব্দগুলো হলো: "তুমি চলে যাও", "তোমার সাথে আর থাকব না", "বাপের বাড়ি চলে যাও" ইত্যাদি — তবে এগুলোও নিয়ত বা পরিস্থিতির প্রমাণ ছাড়া তালাক পতিত করে না।
  • আপনি মনে মনে যা বলেছেন — সেটি মুখে উচ্চারণ করেননি, লিখেননি। শুধু মনের কথা (হাদীসে নফস) তালাক পতিত করে না।

হাদীস: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের মনের কথা (ওয়াসওয়াসা) ক্ষমা করে দিয়েছেন, যতক্ষণ না সে তা বলে বা আমল করে।" (সহীহ বুখারী, হাদীস ৫২৬৯; সহীহ মুসলিম, হাদীস ১২৭)

সিদ্ধান্ত: আপনার বিবাহিত জীবন ঠিক আছে। কোনো তালাক পতিত হয়নি।


২) "সরে যাও তুমি", "তোমার সাথে আর থাকব না", "আমি চলে যাব বাপের বাড়ি" — এগুলো কি কেনায়া বাক্য? তালাকের অধিকারপ্রাপ্ত মেয়ে কি এগুলো বলতে পারবে?

উত্তর:

ক) এগুলো কেনায়া বাক্য কি না?

হ্যাঁ, এগুলো কেনায়া (ইঙ্গিতবাহী) বাক্য। তবে কেনায়া বাক্যে তালাক পতিত হওয়ার জন্য নিয়ত বা পরিস্থিতির প্রমাণ আবশ্যক।

রাদ্দুল মুহতার-এ ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন: "কেনায়া শব্দে তালাক নিয়ত ছাড়া পতিত হয় না, তবে যদি পরিস্থিতি তালাকের দিকে ইঙ্গিত করে, তাহলে পতিত হয়।" (খণ্ড ৩, পৃ. ২৯৮)

খ) তালাকের অধিকারপ্রাপ্ত (তাফবিজ) মেয়ে কি কেনায়া বাক্য বলতে পারবে?

তাফবিজে তালাক (স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে তালাকের অধিকার প্রদান) দু'প্রকার:

  1. তাফবিজে মুতলাক (সাধারণ অধিকার): মেয়ে যখনই চায় তালাক দিতে পারে।
  2. তাফবিজে মুকাইয়াদ (শর্তসাপেক্ষ অধিকার): নির্দিষ্ট শর্তে তালাক দিতে পারে।

গুরুত্বপূর্ণ: তাফবিজের ক্ষেত্রে মেয়েকে সরীহ (স্পষ্ট) তালাকের শব্দ ব্যবহার করতে হয়, যেমন: "আমি নিজেকে তালাক দিলাম" বা "আমার তালাক কবুল হলো"। কেনায়া বাক্যে তাফবিজ কার্যকর হয় না — কারণ কেনায়া বাক্যে নিয়ত প্রয়োজন, আর তাফবিজে নিয়তের সাথে স্পষ্ট শব্দও প্রয়োজন।

ফাতাওয়া আলমগিরি-তে আছে: "তাফবিজে তালাকের ক্ষেত্রে স্ত্রী সরীহ শব্দ ব্যবহার করবে, কেনায়া শব্দে তালাক পতিত হবে না।" (খণ্ড ১, পৃ. ৪২৩)

সিদ্ধান্ত: আপনি যদি তালাকের অধিকারপ্রাপ্তও হন, তবুও "সরে যাও", "থাকব না" — এসব কেনায়া বাক্যে তালাক পতিত হবে না, যদি না আপনি স্পষ্টভাবে তালাকের নিয়ত করেন এবং সরীহ শব্দ উচ্চারণ করেন।

তবে সতর্কতা: রাগের বশে বারবার এসব কথা বলা শরীয়তের দৃষ্টিতে অনুচিত। হাদীসে এসেছে:

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "যে নারী বিনা কারণে স্বামীর কাছে তালাক চায়, তার জন্য জান্নাতের সুগন্ধিও হারাম।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২২২৬; সুনানে তিরমিজি, হাদীস ১১৮৭)

তাই এসব কথা বলা থেকে বিরত থাকুন। রাগের সময় চুপ থাকা উত্তম।


৩) চ্যাট জিপিটি-কে প্রশ্ন করার কারণে শব্দগত ভুল হলে কি সমস্যা হবে?

উত্তর: না, ইনশাআল্লাহ কোনো সমস্যা হবে না।

কারণ:

  • চ্যাট জিপিটি একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), কোনো মুফতি নয়। এর উত্তর শরীয়তের দলিল নয়।
  • আপনি যদি চ্যাট জিপিটিকে প্রশ্ন করার সময় তালাকের নিয়ত না করেন এবং সরীহ তালাকের শব্দ উচ্চারণ না করেন, তাহলে শুধু প্রশ্ন করার কারণে তালাক পতিত হবে না।
  • মনে মনে যা বলেছেন — সেটি শয়তানের ওয়াসওয়াসা (কুমন্ত্রণা)। এটি তালাক পতিত করে না।

হাদীস: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "শয়তান মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়, কিন্তু যতক্ষণ সে তা বলে বা আমল না করে, ততক্ষণ তা ক্ষতিকর নয়।" (সহীহ মুসলিম, হাদীস ১২৭)

তবে: ভবিষ্যতে তালাক সংক্রান্ত কোনো প্রশ্ন থাকলে বিজ্ঞ মুফতির কাছে সরাসরি জিজ্ঞাসা করুন। চ্যাট জিপিটি বা অনলাইন AI-এর উপর নির্ভর করবেন না। আপনার এলাকায় মুফতি না থাকলে দারুল ইফতা দারুল উলূম দেওবন্দ (darulifta-deoband.com) বা islamqaproo.com- তে লিখে জিজ্ঞাসা করতে পারেন।


সারসংক্ষেপ

| প্রশ্ন | উত্তর | |--------|--------| | ১. "আমাকে আর কল দিও না" মেসেজে তালাক হবে? | না, তালাক পতিত হয়নি। বিবাহিত জীবন ঠিক আছে। | | ২. "সরে যাও", "থাকব না" — কেনায়া বাক্য? | হ্যাঁ, তবে নিয়ত/পরিস্থিতির প্রমাণ ছাড়া তালাক পতিত হয় না। তাফবিজে সরীহ শব্দ প্রয়োজন। | | ৩. চ্যাট জিপিটি-কে প্রশ্ন করার কারণে সমস্যা? | না, ইনশাআল্লাহ কোনো সমস্যা নেই। |


উপদেশ

প্রিয় বোন, দাম্পত্য জীবনে রাগারাগি স্বাভাবিক, কিন্তু তালাকের কথা বারবার মুখে আনা অত্যন্ত বিপজ্জনক। রাগের সময়:

  • চুপ থাকুন — রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "রাগের সময় চুপ থাকো।" (মুসনাদে আহমাদ)
  • তালাকের কথা মুখে আনবেন না — এটি শয়তানের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
  • স্বামীর সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ুন — কুরআনে আল্লাহ বলেন: "তোমরা তাদের সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।" (সূরা নিসা: ১৯)

আল্লাহ আপনার দাম্পত্য জীবনকে বরকতময় করুন। আমিন।


والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.