মৃত মা ও জীবিত বাবার সম্পদ বন্টন প্রসঙ্গে
Halal and Haram · Hanafi
Question
শ্রদ্ধেয় মুফতি সাহেব।
আমার আম্মা দুই বছর আগে ইন্তেকাল করেছেন। তারপরে আমরা তিন ভাই ও আব্বা মিলে আম্মার রেখে যাওয়া ক্যাশ টাকা, জামা কাপড় ইত্যাদি সম্পদ ইলমে ফারায়েজের আলোকে বন্টণ করে নেই স্থানীয় এক মুফতি সাহেবের পরামর্শে।
তবে আম্মার রেখে যাওয়া জমি গুলো এখনো ভাগ করে উত্তরাধিকারদের দখলে নেইনি। শুধু আলোচনা করে রেখেছি যে আমরা ইলমে ফারাজ অনুসারে এখানে চার ওয়ারিশ মিলে কে কতটুকু জমির অংশ পাব।
গ্রামে আমাদের বসতভিটা যেখানে সেখানে আব্বার জমির সাথে আমার আম্মারও জমি একত্রে রয়েছে। এই প্লটে টোটাল জমির রয়েছে প্রায় ২০ শতক। এখানে ৭.৫ আম্মার আর বাকি টুকু আব্বার একত্রে রয়েছে। আম্মা মৃত ও আব্বা জীবিত।
আবার এই প্লটের সাথে লাগোয়া রাস্তার পাশেই আব্বার আরেকটি প্লট রয়েছে যেখানে জমির পরিমাণ ৭.৫ শতাংশ।
এমতাঅবস্থায় আমরা তিন ভাই আব্বার কাছে বিনয়ের সাথে আবদার করেছি যে আমাদের কে যদি আপনি দয়া করে এই ২০ শতকের প্লটটিকে (যেখানে মৃত আম্মার ৭.৫ শতক ও বাকিটা জীবিত আব্বার) তিন ভাইকে ইলমে ফারায়েজ অনুযায়ী ভাগ করে দেন আপনি জীবিত থাকতেই তাহলে আমাদের তিন ভাইয়ের জন্য বাসা করতে অনেক সুবিধা হবে।
এর কারণ শুধু ৭.৫ শতক জমি ৪ ভাগে ভাগ করতে গেলে আমরা ২ শতকেরও কম জমি পাচ্ছি যেটা একটা ভালো বাসা বাড়ি করার জন্য যথেষ্ট নয়। যদিও এই প্লটে অল রেডি ছোট ভাইকে আব্বা বাসা করে দিচ্ছেন।
উল্লেখ্য যে আমাদের আম্মা ইন্তেকালের পরে আমরা আব্বাকে নতুন করে বিয়ে দিয়েছি। এখন আব্বা যদি রাজি হয় যে এই ২০ শতকের প্লটটি আমাদের তিন ভাইকে ভাগ করে দিবেন আর উনার বাকি অন্য প্লটের জমি বা অন্যান্য সম্পদ ভাগ করবেন না তাহলে সেগুলির ক্ষেত্রে ইসলামের/ইলমে ফারায়েজের হুকুমটা কি হবে?
মানে কয় সুরুতে আব্বা আমাদেরকে জীবিত অবস্থায় তার সম্পদ বন্টণ করে দিতে পারেন? এবং আব্বার আংশিক বা সম্পুর্ন সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রে কি কি বিষয় আমাদেরকে মাথায় রাখতে হবে এবং কি কি সতর্কতা অবলম্বন করার জরুরী?
আমাদের তিন ছেলেকে জীবিত অবস্থায় সম্পদ বন্টন করে দিলে কি নতুন মাকেও আমাদের প্রাপ্ত সম্পদের সমান দিতে হবে? নাকি কোরআনে বর্ণিত আট ভাগের এক ভাগই তিনি পাবেন?
এ বিষয়ে ইনসাফপূর্ণ এবং সবথেকে উত্তম পন্থায় কিভাবে আমরা এই বণ্টন করতে পারি এ বিষয়ে যদি আমাদেরকে সমাধান দিতেন খুবই খুবই ভালো হতো ইনশাআল্লাহ।
Answer
উত্তর: মৃত মা ও জীবিত বাবার সম্পদ বণ্টন প্রসঙ্গে
بسم الله الرحمن الرحيم الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على أشرف الأنبياء والمرسلين، أما بعد:
ভূমিকা
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সূক্ষ্ম। এতে দুটি পৃথক বিষয় জড়িত: ১. মৃত মায়ের রেখে যাওয়া সম্পদ (যা ইলমে ফারায়েজ অনুযায়ী বণ্টন করতে হবে) ২. জীবিত বাবার সম্পদ (যা তিনি জীবিত থাকতে হেবা/দান করতে পারেন, তবে কিছু শর্তসাপেক্ষে)
প্রথম বিষয়: মৃত মায়ের সম্পদ বণ্টন
মায়ের ওয়ারিশ কারা?
আপনার মা ইন্তেকাল করেছেন। তার ওয়ারিশ হিসেবে আছেন:
- স্বামী (আপনার আব্বা) → ১/৪ অংশ (যেহেতু সন্তান রয়েছে)
- তিন ছেলে → অবশিষ্ট (আসাবা) সম্পদ সমানভাগে ভাগ হবে
সূত্র: সূরা নিসা (৪:১২) — «فَإِن كَانَ لَهُنَّ وَلَدٌ فَلَكُمُ الرُّبُعُ مِمَّا تَرَكْنَ» অর্থ: "যদি তাদের সন্তান থাকে, তবে তোমাদের জন্য তাদের রেখে যাওয়া সম্পদের এক-চতুর্থাংশ।"
মায়ের ৭.৫ শতক জমির হিসাব
মায়ের মোট সম্পদ = ৭.৫ শতক জমি (এবং অন্যান্য সম্পদ যা ইতিমধ্যে বণ্টন হয়েছে)
| ওয়ারিশ | অংশ | জমি (শতকে) | |---------|------|------------| | আব্বা (স্বামী) | ১/৪ | ১.৮৭৫ | | তিন ছেলে (বাকি ৩/৪) | ৩/৪ ÷ ৩ = ১/৪ প্রত্যেকে | ১.৮৭৫ প্রত্যেকে |
অর্থাৎ:
- আব্বা পাবেন: ১.৮৭৫ শতক
- প্রত্যেক ছেলে পাবেন: ১.৮৭৫ শতক
- তিন ছেলের মোট: ৫.৬২৫ শতক
সূত্র: রাদ্দুল মুহতার (৬/৭৬৭), আল-হিদায়া (৪/১৭০), ফাতাওয়া আলমগিরি (৬/৪৪৮)
গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
আপনারা যদি মায়ের জমি এখনো ভাগ না করে থাকেন, তবে প্রতিটি ওয়ারিশের অংশ শরীয়ত অনুযায়ী নির্ধারিত হয়ে গেছে। শুধু দখল হয়নি। তাই:
- মায়ের ৭.৫ শতকের মধ্যে আব্বার ১.৮৭৫ শতক শরীয়তসিদ্ধ মালিকানা।
- প্রত্যেক ছেলের ১.৮৭৫ শতক শরীয়তসিদ্ধ মালিকানা।
দ্বিতীয় বিষয়: জীবিত বাবার সম্পদ বণ্টন
বাবা জীবিত থাকতে সম্পদ বণ্টন করতে পারেন কি?
হ্যাঁ, করতে পারেন — তবে এটি হেবা (দান) হিসেবে গণ্য হবে, উত্তরাধিকার (ইরস) হিসেবে নয়। কারণ:
- জীবিত ব্যক্তির সম্পদ তার মৃত্যুর আগে "তরকা" (উত্তরাধিকার সম্পদ) হয় না।
- জীবিত অবস্থায় সম্পদ দান করলে তা হেবা-এর বিধানের অধীন।
সূত্র: রাদ্দুল মুহতার (৫/৬৮৮), ফাতাওয়া উসমানি (২/৪৯৭)
হেবার শরীয়তসম্মত পদ্ধতি
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«اتَّقُوا اللَّهَ وَاعْدِلُوا بَيْنَ أَوْلَادِكُمْ» "আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমাদের সন্তানদের মধ্যে ইনসাফ করো।" — সহিহ বুখারি (২৫৮৭), সহিহ মুসলিম (১৬২৩)
অন্য হাদিসে:
«إِنَّ النُّعْمَانَ بْنَ بَشِيرٍ... قَالَ: أَعْطَانِي أَبِي عَطِيَّةً... فَقَالَ النَّبِيُّ ﷺ: فَارْجِعْ فَرُدَّهُ» — সহিহ বুখারি (২৫৮৬)
অর্থ: নুমান ইবনে বশীর (রা.)-এর পিতা তাকে একটি দান দিয়েছিলেন, নবী ﷺ তা ফিরিয়ে দিতে বলেছিলেন কারণ অন্য সন্তানদের সমান দেওয়া হয়নি।
হেবার শর্তাবলি (হানাফি মাযহাব অনুযায়ী):
১. সন্তানদের মধ্যে সমতা রক্ষা করা — ছেলে-মেয়ে সবাইকে সমান দিতে হবে (হানাফি মাযহাব মতে)। তবে ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে ছেলেদের মধ্যে সমান, আর ছেলে-মেয়ের মধ্যে ফারায়েজের নিয়মে (ছেলে দ্বিগুণ) দেওয়াও জায়েজ — তবে সর্বোত্তম হলো সবাইকে সমান দেওয়া।
সূত্র: রাদ্দুল মুহতার (৫/৬৯০), ফাতাওয়া উসমানি (২/৪৯৮)
২. হেবা সম্পূর্ণ ও দখলদারিসহ হতে হবে — শুধু মুখে বলা যথেষ্ট নয়; দখল হস্তান্তর করতে হবে।
৩. মৃত্যুশয্যায় (মারাদুল মাউত) হেবা — তখন ওয়ারিশদের ১/৩-এর বেশি বৈধ নয়।
৪. অন্য ওয়ারিশদের বঞ্চিত করার উদ্দেশ্য থাকা যাবে না — এটি গুনাহ।
আপনার নির্দিষ্ট প্রশ্নের উত্তর
প্রশ্ন ১: আব্বা যদি ২০ শতকের প্লটটি তিন ভাইকে ভাগ করে দেন এবং বাকি সম্পদ না ভাগ করেন — এটা কি জায়েজ?
উত্তর: এতে দুটি দিক রয়েছে:
(ক) শরীয়তের দিক থেকে:
- আব্বা জীবিত, তাই তিনি তার সম্পদ যাকে ইচ্ছা দান করতে পারেন (হেবা)।
- তবে সন্তানদের মধ্যে ইনসাফ করা ওয়াজিব।
- যদি তিনি শুধু এই ২০ শতক প্লট তিন ছেলেকে দেন এবং বাকি সম্পদ (অন্য প্লট, টাকা-পয়সা) না দেন, তবে অন্য সন্তান (যদি থাকে) বা নতুন স্ত্রীর সন্তানদের প্রতি ইনসাফ লঙ্ঘন হতে পারে।
(খ) বাস্তব দিক:
- যেহেতু এই প্লটে মায়ের ৭.৫ শতক রয়েছে, তাই মায়ের অংশ ইতিমধ্যে তিন ছেলে ও আব্বার মধ্যে শরীয়তসিদ্ধভাবে বিভক্ত।
- আব্বা তার নিজের অংশ (১২.৫ শতক) থেকে তিন ছেলেকে দান করতে পারেন।
- কিন্তু মায়ের অংশের হিসাব আলাদা — সেখানে আব্বার ১.৮৭৫ শতকও রয়েছে।
সঠিক পদ্ধতি: ১. প্রথমে মায়ের ৭.৫ শতক ফারায়েজ অনুযায়ী ভাগ করুন:
- আব্বা: ১.৮৭৫ শতক
- প্রত্যেক ছেলে: ১.৮৭৫ শতক ২. এরপর আব্বা তার নিজের ১২.৫ শতক + মায়ের থেকে পাওয়া ১.৮৭৫ শতক = ১৪.৩৭৫ শতক থেকে তিন ছেলেকে হেবা করতে পারেন। ৩. তবে অন্য সন্তান বা নতুন স্ত্রীর সন্তান থাকলে তাদেরকেও সমান দিতে হবে, নাহলে ইনসাফ লঙ্ঘন হবে।
প্রশ্ন ২: আব্বা আংশিক বা সম্পূর্ণ সম্পদ বণ্টনে কী কী সতর্কতা?
সতর্কতাসমূহ:
| নং | সতর্কতা | সূত্র | |-----|---------|------| | ১ | সন্তানদের মধ্যে সমতা রক্ষা করা | সহিহ বুখারি ২৫৮৭ | | ২ | হেবা সম্পূর্ণ ও দখলসহ হওয়া | রাদ্দুল মুহতার ৫/৬৮৮ | | ৩ | মৃত্যুশয্যায় ১/৩-এর বেশি না হওয়া | আল-হিদায়া ৪/১৩২ | | ৪ | ওয়ারিশ বঞ্চিত করার নিয়ত না থাকা | ফাতাওয়া উসমানি ২/৪৯৯ | | ৫ | নতুন স্ত্রীর হক নষ্ট না করা | সূরা নিসা ৪:১৯ | | ৬ | ঋণ থাকলে আগে পরিশোধ | সহিহ মুসলিম ১৬২৮ | | ৭ | ওসিয়ত থাকলে ১/৩-এর মধ্যে | সূরা নিসা ৪:১১ |
প্রশ্ন ৩: নতুন মা কি আমাদের প্রাপ্ত সম্পদের সমান পাবেন, নাকি কুরআনের ১/৮?
উত্তর: এটি দুটি ভিন্ন বিষয়:
(ক) হেবার ক্ষেত্রে:
- আব্বা জীবিত থাকতে যদি তিন ছেলেকে সম্পদ দান করেন, তবে নতুন স্ত্রীর কোনো অধিকার নেই সেই হেবায়। কারণ হেবা হলো জীবিত ব্যক্তির ইচ্ছাধীন দান।
- নতুন মা শুধু আব্বার মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার পাবেন।
(খ) উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে (আব্বার মৃত্যুর পর):
- যেহেতু আব্বার মৃত্যুর সময় সন্তান(সৎ) রয়েছে, তাই নতুন মা পাবেন ১/৮ অংশ।
- সূত্র: সূরা নিসা (৪:১২) — «فَإِن كَانَ لَكُمْ وَلَدٌ فَلَهُنَّ الثُّمُنُ مِمَّا تَرَكْتُم»
সর্বোত্তম পন্থা: আব্বা যেন নতুন মাকেও ইনসাফের সাথে কিছু দেন, যাতে ভবিষ্যতে বিবাদ না হয়।
সর্বোত্তম ও ইনসাফপূর্ণ সমাধান
প্রস্তাবিত পদ্ধতি:
ধাপ ১: মায়ের ৭.৫ শতক ফারায়েজ অনুযায়ী ভাগ করুন:
- আব্বা: ১.৮৭৫ শতক
- প্রত্যেক ছেলে: ১.৮৭৫ শতক
ধাপ ২: আব্বা তার নিজের ১২.৫ শতক + মায়ের থেকে পাওয়া ১.৮৭৫ শতক = ১৪.৩৭৫ শতক থেকে:
- তিন ছেলেকে সমানভাবে হেবা করুন (প্রত্যেকে ৪.৭৯ শতক)
- অথবা ফারায়েজের নিয়মে দান করুন (ছেলেরা সমান, নতুন মা ও অন্যান্য ওয়ারিশদের হিসাব রেখে)
ধাপ ৩: অন্য প্লট (৭.৫ শতক) ও অন্যান্য সম্পদ:
- আব্বা চাইলে সেগুলোও হেবা করতে পারেন, তবে সব সন্তানকে সমান দিতে হবে।
- অথবা মৃত্যুর পর ফারায়েজ অনুযায়ী বণ্টনের জন্য রেখে দিতে পারেন।
ধাপ ৪: নতুন মাকে:
- আব্বা চাইলে তাকে কিছু হেবা করতে পারেন (ইনসাফের সাথে)।
- অথবা আব্বার মৃত্যুর পর তিনি ১/৮ পাবেন।
চূড়ান্ত পরামর্শ:
১. স্থানীয় বিশ্বস্ত মুফতি সাহেবের তত্ত্বাবধানে একটি লিখিত হেবানামা তৈরি করুন। ২. সব ওয়ারিশের সম্মতি নিন। ৩. দখল হস্তান্তর নিশ্চিত করুন। ৪. নতুন মা ও তার সন্তানদের (যদি থাকে) হক সংরক্ষণ করুন। ৫. ওয়ারিশ বঞ্চিত করার নিয়ত থেকে বিরত থাকুন — এটি কবিরা গুনাহ।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: «مَنْ فَرَّ مِنْ مِيرَاثِ وَارِثِهِ...» — যে ব্যক্তি ওয়ারিশের উত্তরাধিকার থেকে পলায়ন করে... (এটি নিষিদ্ধ)
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | হুকুম | |------|-------| | মায়ের ৭.৫ শতক | ফারায়েজ অনুযায়ী ভাগ করতে হবে (আব্বা ১/৪, তিন ছেলে ৩/৪) | | আব্বার জীবিত অবস্থায় হেবা | জায়েজ, তবে সন্তানদের মধ্যে সমতা ওয়াজিব | | নতুন মা | হেবায় অংশ পাবেন না; আব্বার মৃত্যুর পর ১/৮ পাবেন | | আংশিক বণ্টন | জায়েজ, তবে ইনসাফ রক্ষা করতে হবে | | ওয়ারিশ বঞ্চিত করা | নাজায়েজ ও গুনাহ |
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে ইনসাফের সাথে আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
والله أعلم بالصواب وآخر دعوانا أن الحمد لله رب العالمين