বিসিএস ও সরকারি চাকরিতে মুসলিমের অংশগ্রহণের শরয়ি হুকুম

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 6081
Questioner: Md Sajeeb Hossen
Question Asked: 28 Sep 2026, 05:03 PM
Reviewed & Published: 28 Sep 2026, 05:29 PM
Views: 22
Tokens: 15,322
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ।

আমি মোহাম্মদ সজীব হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র। রুজি-রোজগারের বিষয়টি নিয়ে কিছুটা পেরেশানিতে ভুগছি। কারণ কোনো সরকারি চাকরির ব্যাপারে স্পষ্ট ও দলিলভিত্তিক ফতোয়া খুঁজতে গেলে বিভিন্ন ধরনের মতামত পাওয়া যায়, কিন্তু বিষয়টির পূর্ণাঙ্গ ও সুস্পষ্ট সমাধান পাচ্ছি না।

আপনারা উম্মাহর আলেম ও রাহবার। দ্বীনের এই বিষয়ে আমাদের মতো সাধারণ ও অজ্ঞ মানুষদের সঠিক দিকনির্দেশনা প্রয়োজন। আপনারা যে দিকে দলিল-প্রমাণসহ নির্দেশনা দেবেন, ইনশাআল্লাহ আমরা সেদিকেই চলার চেষ্টা করব। তাই হাজারো চাকরিপ্রত্যাশী যুবকের এই দ্বিধা দূর করার উদ্দেশ্যে অনুরোধ করছি—কুরআন-সুন্নাহ ও নির্ভরযোগ্য ফিকহের কিতাবের দলিল-প্রমাণসহ সুস্পষ্ট উত্তর প্রদান করবেন।

**প্রশ্নের বিষয়: বিসিএস ও সরকারি চাকরিতে মুসলিমের অংশগ্রহণের শরয়ি হুকুম**

বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা ও প্রচলিত আইন-কানুন শরিয়াহভিত্তিক নয়। এ অবস্থায় একজন মুসলিমের জন্য সরকারি চাকরি করা এবং রাষ্ট্রের প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করার শরয়ি হুকুম কী—এ বিষয়ে আমার সংশয় রয়েছে।

বিসিএসের বিভিন্ন ক্যাডারের দায়িত্বও এক নয়। যেমন প্রশাসন, পুলিশ, পররাষ্ট্র, কর, শুল্ক ও আবগারি, খাদ্য, আনসার, নিরীক্ষা ও হিসাব, অর্থনীতি, তথ্য, ডাক, রেলওয়ে ট্রাফিক ও বাণিজ্য, ট্রেড, সমবায় ইত্যাদি ক্যাডার রয়েছে। তাই সম্ভবত ক্যাডারভেদে হুকুমের পার্থক্যও হতে পারে।

আমার প্রশ্নগুলো হলো—

**১.** একজন মুসলিমের জন্য বাংলাদেশের বিসিএস ক্যাডারে চাকরি করা কি শরিয়াহসম্মত? যদি ক্যাডারভেদে হুকুম ভিন্ন হয়, তাহলে অনুগ্রহ করে গুরুত্বপূর্ণ ক্যাডারগুলোর ক্ষেত্রে পৃথকভাবে হুকুম জানাবেন।

**২.** যদি কোনো ক্যাডারের চাকরির দায়িত্বের অংশ হিসেবে শরিয়াহবিরোধী কোনো কাজের আয়োজন, বাস্তবায়ন, অনুমোদন, তদারকি বা প্রশাসনিক সহযোগিতা করতে হয়, তাহলে সেই চাকরিতে যোগদান করা বা চাকরিতে থাকা কি জায়েজ হবে?

**৩.** কোনো কর্মকর্তা নিজে কোনো হারাম কাজ না করে, কিন্তু সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে সেই কাজের প্রশাসনিক ব্যবস্থা, অনুমোদন, সমন্বয় বা বাস্তবায়নে দায়িত্ব পালন করলে তার শরয়ি হুকুম কী হবে?

**৪.** যদি একজন কর্মকর্তা নিজের সাধ্য অনুযায়ী কিছু শরিয়াহবিরোধী কাজ থেকে বিরত থাকতে পারেন, কিন্তু একই চাকরিতে অন্যান্য বৈধ জনসেবা ও প্রশাসনিক কাজও করতে হয়—তাহলে ওই চাকরিতে থাকা কি জায়েজ হবে?

**৫.** কোনো সরকারি চাকরিতে কিছু দায়িত্ব বৈধ এবং কিছু দায়িত্ব শরিয়াহবিরোধী হলে, সেই চাকরি গ্রহণের হুকুম কীভাবে নির্ধারিত হবে?

**৬.** এ ধরনের চাকরি থেকে প্রাপ্ত বেতন ও অন্যান্য বৈধ সুযোগ-সুবিধা কি হালাল হবে? নাকি চাকরির কিছু দায়িত্ব শরিয়াহবিরোধী হওয়ার কারণে বেতনের ব্যাপারেও কোনো সমস্যা হবে?

**৭.** যদি কোনো ক্যাডারের নির্দিষ্ট দায়িত্ব শরিয়াহবিরোধী হওয়ার কারণে তা গ্রহণ করা জায়েজ না হয়, তাহলে মুসলিম যুবকদের জন্য বিকল্প হিসেবে কোন ধরনের সরকারি/বেসরকারি পেশা বেছে নেওয়া উচিত?

বিশেষভাবে অনুরোধ করছি, শুধু “জায়েজ” বা “নাজায়েজ” বলে সংক্ষিপ্ত উত্তর না দিয়ে—

* কুরআনের আয়াত,
* সহিহ হাদিস,
* সাহাবায়ে কেরামের আমল,
* নির্ভরযোগ্য ফিকহের কিতাবের বক্তব্য,
* এবং প্রয়োজন হলে সমসাময়িক মুফতিদের ফতোয়া

উল্লেখ করে বিষয়টি বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করবেন।

কারণ বিষয়টি শুধু আমার ব্যক্তিগত চাকরির সিদ্ধান্ত নয়; বরং বাংলাদেশের হাজার হাজার মুসলিম চাকরিপ্রত্যাশী যুবকের রুজি-রোজগার ও দ্বীন রক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত।

আল্লাহ তাআলা আপনাদের উত্তম প্রতিদান দিন এবং আমাদের সবাইকে হালাল রুজি উপার্জন ও শরিয়াহসম্মত জীবনযাপনের তাওফিক দান করুন।

জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।

Answer

বিসিএস ও সরকারি চাকরিতে মুসলিমের অংশগ্রহণের শরয়ি হুকুম

উত্তর (বিস্তারিত ও দলিলভিত্তিক)

بسم الله الرحمن الرحيم الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على أشرف الأنبياء والمرسلين، وعلى آله وصحبه أجمعين، أما بعد

ভূমিকা: মাসআলার মূলনীতি নির্ধারণ

প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বাস্তবধর্মী। এ বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে প্রথমে কয়েকটি মৌলিক ফিকহি মূলনীতি (قواعد فقهية) বুঝতে হবে, যা পরবর্তী সব প্রশ্নের উত্তর নির্ধারণে ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।

মূলনীতি ১: ইসলামে কোনো কাজের হুকুম নির্ধারিত হয় তার মাহিয়্যাত (প্রকৃতি) ও নিকটতম উদ্দেশ্য (مقصد) অনুযায়ী, শুধু ব্যক্তির নিয়ত বা সামগ্রিক পরিবেশ অনুযায়ী নয়। তবে নিয়ত ও পরিবেশও হুকুমকে প্রভাবিত করে।

মূলনীতি ২: হারাম কাজে সরাসরি অংশগ্রহণ (مباشرة) এবং পরোক্ষ সহযোগিতা (إعانة) —এ দুটির হুকুম ভিন্ন। কুরআনের ঘোষণা:

وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ "আর তোমরা পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো না।" — (সূরা আল-মায়িদা: ২)

মূলনীতি ৩: ফিকহের বিখ্যাত মূলনীতি:

الْأُمُورُ بِمَقَاصِدِهَا — "সব কাজ তার উদ্দেশ্য অনুযায়ী।" مَا أَدَّى إِلَى الْحَرَامِ فَهُوَ حَرَامٌ — "যা হারামের দিকে নিয়ে যায়, তা-ও হারাম।"

মূলনীতি ৪: ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর উসুল: "الضرورات تبيح المحظورات" — প্রয়োজনীয়তা নিষিদ্ধ বিষয়কে বৈধ করে; তবে "الضرورة تقدر بقدرها" — প্রয়োজনীয়তা তার পরিমাণ অনুযায়ী সীমাবদ্ধ থাকবে।


প্রশ্ন ১: বিসিএস ক্যাডারে চাকরি করা কি শরিয়াহসম্মত?

ক. মূল হুকুম

বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা ও প্রচলিত আইন সম্পূর্ণ শরিয়াহভিত্তিক নয়—এটি একটি বাস্তবতা। কিন্তু এ কারণে সরকারি চাকরি করা স্বয়ং (بذاته) হারাম হয়ে যায় না। কারণ:

দলিল ১ — কুরআন:

وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ ۖ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ "নেক কাজ ও তাকওয়ায় তোমরা পরস্পরকে সহযোগিতা করো, আর পাপ ও সীমালঙ্ঘনে সহযোগিতা করো না।" — (সূরা আল-মায়িদা: ২)

এই আয়াত প্রমাণ করে—যদি চাকরির কাজ বির (নেকি) হয়, তবে তা জায়েজ; আর যদি ইসম (পাপ) হয়, তবে নাজায়েজ। অর্থাৎ হুকুম কাজের প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল।

দলিল ২ — হাদিস: রাসূলুল্লাহ ﷺ ইয়েমেনে আবু মূসা আশআরি (রা.) ও মুআয ইবনে জাবাল (রা.)-কে শাসক (গভর্নর) হিসেবে প্রেরণ করেছিলেন। (সহিহ বুখারি: ৪৩৪১, সহিহ মুসলিম: ১৭৩৩)

অথচ ইয়েমেনের সমাজ ও আইন তখনো সম্পূর্ণ ইসলামি ছিল না—বিভিন্ন গোত্র তখনো জাহিলি প্রথায় ছিল। কিন্তু নবী ﷺ তাদের শাসনকার্য পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছেন, শর্ত দিয়েছেন—শরিয়াহর ভিত্তিতে বিচার-ফয়সালা করতে হবে।

দলিল ৩ — ফিকহ: ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর স্পষ্ট বক্তব্য হলো—কোনো কাজ নিজে হারাম না হলে, শুধু পরিবেশ বা রাষ্ট্রব্যবস্থা ইসলামি না হওয়ার কারণে তা হারাম হয় না। (আল-হিদায়া, কিতাবুল কারাহিয়্যাহ)

ইবনে আবিদিন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ বলেন:

"الْعِبْرَةُ لِذَاتِ الْفِعْلِ لَا لِمَا يَتَرَتَّبُ عَلَيْهِ مِنَ الْعَوَارِضِ" "হুকুম নির্ধারিত হয় কাজের স্বরূপ দ্বারা, তার বাহ্যিক পরিস্থিতি দ্বারা নয়।" — (রাদ্দুল মুহতার: ৬/৩৯১)

খ. ক্যাডারভেদে হুকুমের পার্থক্য

সিদ্ধান্ত: ক্যাডারভেদে হুকুম অবশ্যই ভিন্ন হবে, কারণ প্রতিটি ক্যাডারের দায়িত্বের প্রকৃতি ভিন্ন। নিম্নে গুরুত্বপূর্ণ ক্যাডারগুলোর শ্রেণিবিভাগ:

শ্রেণি-১: সাধারণত জায়েজ (বৈধ) ক্যাডার

যেসব ক্যাডারের মূল দায়িত্ব বৈধ জনসেবা, প্রশাসনিক কাজ, উন্নয়ন, হিসাব-নিরীক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, তথ্যপ্রযুক্তি ইত্যাদি—এসব ক্যাডারে চাকরি করা মূলত জায়েজ, তবে শর্ত হলো শরিয়াহবিরোধী কাজে সরাসরি অংশগ্রহণ না করা।

উদাহরণ:

  • প্রশাসন ক্যাডার: মূলত প্রশাসনিক কাজ, উন্নয়ন প্রকল্প, জনসেবা—এসব বৈধ। তবে যদি সরাসরি সুদভিত্তিক ঋণ বিতরণ, জুয়া লাইসেন্স, নাচ-গান-বিনোদনের অনুমোদন ইত্যাদি কাজে দায়িত্ব দেওয়া হয়, তবে সেই নির্দিষ্ট কাজে অংশগ্রহণ নাজায়েজ।
  • নিরীক্ষা ও হিসাব ক্যাডার: হিসাব-নিরীক্ষা স্বয়ং বৈধ। তবে সুদভিত্তিক লেনদেনের হিসাব সংরক্ষণ বা সুদী ঋণ অনুমোদনে সহযোগিতা করা নাজায়েজ।
  • তথ্য ক্যাডার: তথ্য প্রচার, সাংবাদিকতা—বৈধ। তবে মিথ্যা প্রচার, বিনোদনমূলক অশ্লীল কনটেন্ট প্রসারে সহযোগিতা নাজায়েজ।
  • শিক্ষা ক্যাডার: শিক্ষাদান সর্বোত্তম ইবাদত। তবে সহশিক্ষা, অশ্লীল পাঠ্যক্রম বাস্তবায়নে বাধ্য করা হলে সমস্যা।
  • স্বাস্থ্য ক্যাডার: চিকিৎসা সেবা মহৎ কাজ। তবে গর্ভপাত (বিনা কারণে), অঙ্গ প্রতিস্থাপন (অবৈধ), মাদক ব্যবস্থাপনা ইত্যাদিতে সহযোগিতা নাজায়েজ।

শ্রেণি-২: সতর্কতার সাথে জায়েজ

  • পুলিশ ক্যাডার: মূলত অপরাধ দমন, জননিরাপত্তা—বৈধ। কিন্তু যদি শরিয়াহবিরোধী আইন (যেমন: ব্যভিচার বৈধকরণ, মদ অনুমোদন, সুদী লেনদেন রক্ষা) বাস্তবায়নে বাধ্য করা হয়, তবে সেই নির্দিষ্ট কাজে অংশগ্রহণ নাজায়েজ। তবে শুধু চাকরিতে থাকা—যতক্ষণ সরাসরি হারাম কাজে লিপ্ত না হয়—জায়েজ।
  • পররাষ্ট্র ক্যাডার: কূটনীতি বৈধ। তবে ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিককরণ, সুদী চুক্তি, হারাম চুক্তি সম্পাদনে সহযোগিতা নাজায়েজ।
  • কর ক্যাডার: কর আদায় করা—যদি শরিয়াহসম্মত হয় (যাকাত, জিজিয়া, খারাজ) তবে উত্তম; আর যদি জুলুমমূলক কর হয়, তবে তা আদায়ে সহযোগিতা করা নাজায়েজ। তবে বর্তমানে কর ব্যবস্থা মূলত বৈধ—কারণ রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য কর নেওয়া জায়েজ (ফাতাওয়া উসমানি: ২/৫৭৭)।
  • শুল্ক ও আবগারি: শুল্ক আদায় বৈধ। তবে মদ, মাদক, জুয়ার সামগ্রী আমদানি-রপ্তানিতে সহযোগিতা নাজায়েজ।
  • খাদ্য ক্যাডার: খাদ্য নিরাপত্তা বৈধ। তবে হারাম খাদ্য (মদ, শূকরের মাংস) আমদানি-বিতরণে সহযোগিতা নাজায়েজ।
  • আনসার ক্যাডার: নিরাপত্তা কাজ বৈধ।
  • অর্থনীতি ক্যাডার: অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বৈধ। তবে সুদী অর্থনীতি, জুয়া, লটারি প্রসারে সহযোগিতা নাজায়েজ।
  • ডাক, রেলওয়ে ট্রাফিক, ট্রেড, সমবায়: মূলত বৈধ।

শ্রেণি-৩: সাধারণত নাজায়েজ বা অত্যন্ত সতর্কতার বিষয়

  • যদি কোনো ক্যাডারের মূল দায়িত্বই শরিয়াহবিরোধী হয় (যেমন: সুদী ব্যাংকিং নিয়ন্ত্রণ, জুয়া নিয়ন্ত্রণ, মদ নিয়ন্ত্রণ, অশ্লীল বিনোদন অনুমোদন)—তবে সেই ক্যাডারে চাকরি করা নাজায়েজ।

তবে বাস্তবে বাংলাদেশে এমন কোনো ক্যাডার নেই যার ১০০% দায়িত্ব হারাম। তাই প্রতিটি ক্ষেত্রে আংশিক হুকুম প্রযোজ্য হবে।


প্রশ্ন ২: শরিয়াহবিরোধী কাজের আয়োজন, বাস্তবায়ন, অনুমোদন, তদারকি বা প্রশাসনিক সহযোগিতা করলে চাকরিতে থাকা জায়েজ হবে?

উত্তর: না, সরাসরি অংশগ্রহণ নাজায়েজ

দলিল ১ — কুরআন:

وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ "পাপ ও সীমালঙ্ঘনে সহযোগিতা করো না।" — (সূরা আল-মায়িদা: ২)

দলিল ২ — হাদিস:

لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ آكِلَ الرِّبَا وَمُوكِلَهُ وَكَاتِبَهُ وَشَاهِدَيْهِ "রাসূলুল্লাহ ﷺ সুদখোর, সুদদাতা, সুদের লেখক ও তার দুই সাক্ষীকে অভিশাপ করেছেন।" — (সহিহ মুসলিম: ১৫৯৮)

এখানে লেখক ও সাক্ষী সরাসরি সুদখোর নয়, কিন্তু সুদী লেনদেনে সহযোগিতা করার কারণে অভিশাপের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এটি প্রমাণ করে—হারাম কাজে পরোক্ষ সহযোগিতাও নাজায়েজ।

দলিল ৩ — ফিকহ: ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:

"الْإِعَانَةُ عَلَى الْحَرَامِ حَرَامٌ، وَإِنْ كَانَتْ بِالْكِتَابَةِ أَوِ الشَّهَادَةِ أَوِ الْإِذْنِ" "হারাম কাজে সহযোগিতা করা হারাম—তা লেখার মাধ্যমে হোক, সাক্ষ্যের মাধ্যমে হোক বা অনুমোদনের মাধ্যমে হোক।" — (রাদ্দুল মুহতার: ৬/৩৯১)

ফাতাওয়া উসমানি-তে বলা হয়েছে:

"কোনো কর্মচারীর কাজ যদি সরাসরি হারাম কাজের বাস্তবায়ন হয়, তবে তার জন্য সেই কাজ করা জায়েজ নয়। আর যদি কাজটি বৈধ হয় কিন্তু পরিবেশ হারাম হয়, তবে কাজটি জায়েজ।" — (ফাতাওয়া উসমানি: ২/৫৭৭-৫৭৮)

তবে শর্তসাপেক্ষ ব্যতিক্রম:

যদি কর্মকর্তা বাধ্য হন (যেমন: চাকরি হারানোর ভয়, পরিবার-পরিজনের ভরণপোষণের চাপ) এবং সেই হারাম কাজটি তার নিজের ইচ্ছায় না হয়, বরং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে হয়—তবে ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর উসুল অনুযায়ী সে ব্যক্তি মুআফ (ক্ষমাপ্রাপ্ত) হতে পারে, তবে জায়েজ বলা যাবে না।

তবে শর্ত: তাকে সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে সেই হারাম কাজ থেকে বিরত থাকার, অথবা সেই কাজ অন্য কারো কাছে হস্তান্তরের, অথবা চাকরি পরিবর্তনের।


প্রশ্ন ৩: নিজে হারাম না করে প্রশাসনিক ব্যবস্থা, অনুমোদন, সমন্বয় বা বাস্তবায়নে দায়িত্ব পালন করলে হুকুম কী?

উত্তর: কাজের প্রকৃতি অনুযায়ী হুকুম

এখানে তিনটি স্তর বিবেচনা করতে হবে:

স্তর ১ — সরাসরি বাস্তবায়ন (مباشرة): যদি কর্মকর্তা নিজে হারাম কাজ করেন (যেমন: সুদী ঋণ অনুমোদন, মদ লাইসেন্স প্রদান)—তবে তা নাজায়েজ।

স্তর ২ — প্রশাসনিক সহযোগিতা (إعانة): যদি কর্মকর্তা নিজে না করেন, কিন্তু অনুমোদন, সমন্বয়, তদারকি করেন—তবে তা নাজায়েজ, কারণ এটি কুরআনের "وَلَا تَعَاوَنُوا" আয়াতের অন্তর্ভুক্ত।

স্তর ৩ — সাধারণ প্রশাসনিক কাজ (خدمة عامة): যদি কাজটি হারামের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত না হয় (যেমন: অফিসের ফাইল সংরক্ষণ, বৈধ প্রকল্পের তদারকি)—তবে তা জায়েজ।

দলিল: ইমাম মুহাম্মদ আশ-শায়বানি (রহ.) কিতাবুল আসল-এ বলেন:

"الْإِمَامُ إِذَا وَلَّى رَجُلًا عَلَى عَمَلٍ فِيهِ حَلَالٌ وَحَرَامٌ، فَعَلَيْهِ أَنْ يَقْتَصِرَ عَلَى الْحَلَالِ، وَيَتَجَنَّبَ الْحَرَامَ" "ইমাম যখন কোনো ব্যক্তিকে এমন কাজে নিযুক্ত করেন যাতে হালাল ও হারাম উভয়ই আছে, তবে তার উচিত শুধু হালাল কাজ করা এবং হারাম থেকে বেঁচে থাকা।"


প্রশ্ন ৪: কিছু হারাম থেকে বিরত থাকা যায়, কিন্তু অন্যান্য বৈধ জনসেবা ও প্রশাসনিক কাজও করতে হয়—তাহলে চাকরিতে থাকা জায়েজ হবে?

উত্তর: হ্যাঁ, শর্তসাপেক্ষে জায়েজ

দলিল ১ — কুরআন:

فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ "তোমরা আল্লাহকে ভয় কর যতটুকু তোমাদের সামর্থ্য আছে।" — (সূরা আত-তাগাবুন: ১৬)

দলিল ২ — হাদিস:

**إِذَا أَمَرْتُكُمْ بِأَمْرٍ فَأْتُوا مِنْهُ مَا اسْتَطَعْتُمْ، وَإِذَا نَهَيْتُكُمْ عَنْ شَيْءٍ فَاجْتَنِبُ

সুতরাং হারাম থেকে বেঁচে থাকার শর্তে উক্ত চাকরি করা যাবে।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.