"মা রক্ত দিতে নিষেধ করলে কি করব"

Family Life · Hanafi

Question No: 6067
Questioner: sheikh md abdus salam 25
Question Asked: 28 Sep 2026, 01:26 PM
Reviewed & Published: 28 Sep 2026, 02:33 PM
Views: 13
Tokens: 8,249
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম।

আমি একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে জানতে চাই।

ধরুন, কোনো ব্যক্তি অসুস্থ এবং তার রক্তের প্রয়োজন হয়েছে। আমার রক্তদানের মাধ্যমে যদি তার চিকিৎসা বা জীবন রক্ষা সম্ভব হয়, তাহলে আমি কি তাকে রক্ত দিতে পারব?

কিন্তু যদি আমার মা আমাকে রক্তদান করতে নিষেধ করেন, তাহলে এ ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান কী?

উল্লেখ্য, রক্তদান করলে আমার নিজের কোনো ক্ষতি হবে না; বরং একজন মানুষের উপকার হবে। আমি যদি আমার মাকে বুঝিয়ে বলি যে রক্তদান একটি মানবিক কাজ এবং এতে আমার কোনো ক্ষতি নেই, তবুও যদি তিনি আমাকে রক্ত দিতে নিষেধ করেন এবং বারবার মানা করেন, তাহলে আমার করণীয় কী?

এ অবস্থায় কি আমার মায়ের কথা মেনে রক্তদান থেকে বিরত থাকা উচিত, নাকি একজন অসুস্থ মানুষের উপকার ও জীবন রক্ষার উদ্দেশ্যে আমি রক্তদান করতে পারব?

এছাড়াও জানতে চাই, তখন কি আমার মায়ের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে গণ্য হবে? কারণ আল্লাহ তাআলা পিতা-মাতার আনুগত্য করতে নির্দেশ দিয়েছেন। তবে আমরা জানি, যদি তারা শিরক করতে বলেন বা আল্লাহর আদেশ, উপদেশ কিংবা নবী-রাসূলের নির্দেশনার বিরোধী কোনো কথা বলেন, তাহলে সে ক্ষেত্রে তাদের আনুগত্য করা বাধ্যতামূলক নয়। রক্তদানের এই বিষয়টি কি সেই ধরনের কোনো বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত হবে, নাকি এখানে পিতা-মাতার সিদ্ধান্তই অনুসরণ করতে হবে?

কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে এ বিষয়ে সঠিক দিকনির্দেশনা জানালে উপকৃত হব।

জাযাকাল্লাহু খাইরান।

Answer

সংক্ষিপ্ত উত্তর

রক্তদান ইসলামে একটি মহৎ ও সওয়াবের কাজ — যদি তা নিজের জীবনের জন্য ক্ষতিকর না হয় এবং প্রকৃতপক্ষে কোনো মুসলিম (বা নিরাপরাধ) মানুষের জীবন রক্ষার الوسيلة হয়। তবে মায়ের নিষেধাজ্ঞা এখানে চূড়ান্ত বাধা নয়, কারণ এটি শিরক বা আল্লাহ-রাসূলের নির্দেশের বিরোধী কোনো আদেশ নয়; বরং এটি একটি ইজতেহাদি/পার্থিব (দুনিয়াবি) বিষয়। তাই সন্তানের জন্য উত্তম পথ হলো — মাকে স্নেহ ও হিকমতের সাথে বুঝিয়ে রক্তদান করা, এবং সম্ভব হলে তার সম্মতি নিয়ে করা। যদি মা একেবারেই না মানেন, তাহলে নিজের ক্ষতি না থাকলে এবং রোগীর জীবন সংশয়াপন্ন হলে রক্তদান করা জায়েজ ও উত্তম; তবে মায়ের সাথে সদ্ব্যবহার ও সম্পর্ক বজায় রাখা অপরিহার্য।


১. রক্তদানের মূল হুকুম

আল্লাহ তাআলা বলেন:

"যে ব্যক্তি একজনের জীবন রক্ষা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতির জীবন রক্ষা করল।" — (সূরা আল-মায়িদা: ৩২)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের দুনিয়ার কষ্টসমূহের একটি কষ্ট দূর করবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার কষ্টসমূহের একটি কষ্ট দূর করবেন।" — (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৯৯)

রক্তদান চিকিৎসার الوسيلة হিসেবে মুস্তাহাব বা ওয়াজিব-এর কাছাকাছি হতে পারে, যখন রোগীর জীবন রক্ষা এর উপর নির্ভরশীল হয়। ফকিহগণ বলেন:

"الضرورات تبيح المحظورات" — "প্রয়োজন নিষিদ্ধ বস্তুকে বৈধ করে।" — (আল-আশবাহ ওয়ান-নাযাইর, ইবনে নুজাইম)

রক্ত নিজে নাপাক হলেও প্রয়োজনের সময় রোগীর জীবন রক্ষার জন্য রক্তদান ও গ্রহণ জায়েজ — এটি ফুকাহায়ে কেরামের ঐকমত্য। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ৩০০; ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ৩, পৃ. ৪২৫)


২. পিতা-মাতার আনুগত্যের সীমা

আল্লাহ তাআলা বলেন:

"তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তিনি ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে।" — (সূরা বনী ইসরাইল: ২৩)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"আল্লাহর সন্তুষ্টি পিতা-মাতার সন্তুষ্টিতে, আর আল্লাহর অসন্তুষ্টি পিতা-মাতার অসন্তুষ্টিতে।" — (তিরমিজি, হাদিস: ১৮৯৯)

তবে আনুগত্যের সীমা হলো — মা'রুফ (নেক কাজ) পর্যন্ত। রাসূল ﷺ বলেছেন:

"আনুগত্য কেবল মা'রুফ (নেক কাজে)।" — (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭২৫৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৮৪০)

ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:

"لا طاعة لمخلوق في معصية الخالق" — "সৃষ্টির আনুগত্য নেই স্রষ্টার অবাধ্যতায়।" — (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৪২৩)


৩. রক্তদানের ক্ষেত্রে মায়ের নিষেধাজ্ঞার প্রকৃতি

এখানে মূল প্রশ্ন: মায়ের নিষেধাজ্ঞা কি "আল্লাহর অবাধ্যতার নির্দেশ" এর অন্তর্ভুক্ত?

উত্তর: না। কারণ —

  1. রক্তদান নিজে ফরজ বা ওয়াজিব নয় (যদি না রোগীর জীবন রক্ষা এর উপর নির্ভরশীল হয়)।
  2. মায়ের নিষেধাজ্ঞা শিরক বা হারাম কাজের নির্দেশ নয়; বরং এটি সন্তানের প্রতি মায়ের অতিরিক্ত স্নেহ, ভয় বা ভুল ধারণা থেকে আসতে পারে।

ফাতাওয়া উসমানি-তে এসেছে:

"পিতা-মাতার আনুগত্য ওয়াজিব, তবে তা কেবল মুবাহ ও মুস্তাহাব বিষয়ে। যদি সন্তান কোনো মুস্তাহাব বা মুবাহ কাজ করে এবং তাতে পিতা-মাতার অবাধ্যতা না হয়, বরং তা দ্বীন বা মানবতার উপকারে হয়, তাহলে তাদের নিষেধাজ্ঞা মানা জরুরি নয়।" — (ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ৩, পৃ. ৬১২)


৪. করণীয়: ধাপে ধাপে সমাধান

ধাপ ১: মাকে হিকমতের সাথে বোঝানো

  • রক্তদানের উপকারিতা, সওয়াব ও মানবিক গুরুত্ব বোঝান।
  • ডাক্তারের পরামর্শ ও স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তার কথা জানান।
  • "আমি আপনার সন্তান, আপনার সেবা করতে কোনো ত্রুটি করব না" — এই আশ্বাস দিন।

ধাপ ২: মায়ের সম্মতি নেওয়ার চেষ্টা

  • সম্ভব হলে মাকে সাথে নিয়ে হাসপাতালে যান, ডাক্তারের মুখ থেকে শুনান।
  • মায়ের ভয় দূর করুন — "রক্তদানে আমার কোনো ক্ষতি হবে না" — এটা প্রমাণ করুন।

ধাপ ৩: যদি মা একেবারেই না মানেন

এখানে দুটি অবস্থা:

(ক) যদি রোগীর জীবন সংশয়াপন্ন না হয় (অর্থাৎ রক্তদান ছাড়াও চিকিৎসা সম্ভব):

  • মায়ের কথা মেনে রক্তদান থেকে বিরত থাকা উত্তম, কারণ এটি মুবাহ কাজ এবং মায়ের অসন্তুষ্টি এড়ানো অগ্রগণ্য।
  • তবে অন্য কোনো উপায়ে রোগীর সাহায্য করুন (রক্তদাতা খুঁজে দেওয়া, আর্থিক সহায়তা ইত্যাদি)।

(খ) যদি রোগীর জীবন রক্তদানের উপর নির্ভরশীল হয় (ডাক্তার বলেছেন, রক্ত না পেলে মৃত্যু নিশ্চিত):

  • এমতাবস্থায় রক্তদান করা জায়েজ ও উত্তম, মায়ের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও।
  • কারণ এটি জীবন রক্ষার ওয়াজিব এর অন্তর্ভুক্ত, আর ওয়াজিব পরিত্যাগের নির্দেশ মানা জায়েজ নয়।

ধাপ ৪: মায়ের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা

  • রক্তদানের পর মায়ের খেদমত ও সেবা আগের চেয়ে বেশি করুন।
  • তাকে বুঝান যে "আমি আপনার অবাধ্য হইনি, বরং একজন মুসলিমের জীবন রক্ষা করেছি — এতে আপনারও সওয়াব হবে।"
  • মায়ের জন্য দুআ করুন।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ ও আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.