ইসলামে আর্থিক প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের বিধান কী?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
তার বন্ধু,অথবা বন্ধুর ভাবি যদি বলে টাকা না দিলে সমস্যা নাই তাহলে সে দায় থেকে মুক্ত কিনা?
Answer
উত্তর:
প্রশ্নকারী পরিবারের বর্তমান আর্থিক সংকট, ঋণের বোঝা এবং নিজেদের পারিবারিক দায়িত্বের প্রেক্ষাপটে স্বামীর পক্ষে প্রতিশ্রুত মাসিক ৩,০০০ টাকা দেওয়া সম্ভব না হলে তা গুনাহের বিষয় হবে না—ইনশাআল্লাহ। তবে শর্ত হলো, এই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের পেছনে সত্যিই অক্ষমতা (যেমন: ঋণ, নিজ পরিবারের প্রয়োজন) থাকতে হবে, অলসতা বা অপব্যয়ের কারণে নয়।
কুরআন ও হাদিসের আলোকে দলিল:
-
প্রতিশ্রুতি পূরণের নির্দেশ:
আল্লাহ বলেন:"হে ঈমানদারগণ! তোমরা অঙ্গীকারসমূহ পূর্ণ করো।" (সূরা আল-মায়িদাহ, ৫:১)
তবে এই নির্দেশ সক্ষম ব্যক্তি-এর জন্য। অক্ষম ব্যক্তি অপারগতার কারণে ছাড় পাবে। -
অক্ষমতার কারণে ছাড়:
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:"মুসলিমরা তাদের শর্তসমূহের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৭২৪)
কিন্তু ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, যে ওয়াদা পূরণে বাধ্য নয়, সেটি ভঙ্গ করলে গুনাহ হয় না, তবে তা মাকরুহ (অপছন্দনীয়) হতে পারে। (রদ্দুল মুহতার, ৬/৪১৪) -
অপর পক্ষের সম্মতি:
যদি বন্ধু বা বিধবা ভাবি নিজেরাই বলে দেয় যে টাকা না দিলে কোনো সমস্যা নেই, তাহলে এটি ওয়াদা থেকে অব্যাহতি হিসেবে গণ্য হবে। রাসূল (সা.) বলেছেন:"তোমাদের মধ্যে যাদের কাছে আমানত রয়েছে, তারা যেন তা আদায় করে দেয়।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৫৩৪)
তবে অপর পক্ষ ছেড়ে দিলে দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়।
হানাফি ফিকহের কিতাব থেকে দিকনির্দেশনা:
- ফাতাওয়া উসমানি (২/২৯৬)-তে এসেছে: কারো সাথে কোনো আর্থিক প্রতিশ্রুতি দিলে, তা পূরণের চেষ্টা করা ওয়াজিব। কিন্তু যদি সত্যিই অক্ষমতা হয় (যেমন: ঋণ, নিজের পরিবারের প্রয়োজন) এবং অপর পক্ষকে জানিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে গুনাহ হবে না।
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/২৪৫)-তে উল্লেখ আছে: যে ব্যক্তি ওয়াদা করে, পরে অক্ষম হলে তাওবা ও ইস্তিগফার করা উচিত। তবে অপর পক্ষ যদি মাফ করে দেয়, তাহলে দায়িত্ব শেষ।
- বেহেশতি জেওর (দ্বিতীয় খণ্ড, অধ্যায়: ওয়াদা ও শর্ত)-এ বলা হয়েছে: ওয়াদা ভঙ্গ করা ছোট গুনাহ, কিন্তু অপারগতার কারণে তা ক্ষমার যোগ্য।
অতএব, প্রশ্নকারীর জন্য নির্দেশনা:
১. স্বামীর করণীয়:
- বর্তমান আর্থিক অবস্থার কথা বন্ধু ও বিধবা ভাবিকে খোলাখুলি জানিয়ে দিন।
- যদি তারা ছেড়ে দেয়, তাহলে এটি ঐচ্ছিক দান হওয়ায় কোনো গুনাহ নেই।
- যদি তারা জোর দেয়, তাহলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পরে টাকা দেওয়ার ইচ্ছা পোষণ করুন।
২. গুনাহ হবে না, যদি:
তাদেরকে বিষয়টি বুঝিয়ে রাজী করান,ও ক্ষমা চেয়ে নেন,
- সত্যিই নিজেদের ঋণ ও পরিবারের প্রয়োজন অগ্রাধিকার পায়।
- ইচ্ছাকৃত প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ না করে, বরং অক্ষমতার কারণে হয়।
৩. সতর্কতা:
ভবিষ্যতে কোনো আর্থিক প্রতিশ্রুতি দেওয়ার আগে "ইনশাআল্লাহ" বলা এবং শর্তযুক্ত করা উচিত (যেমন: যদি সামর্থ্য থাকে)।
সারসংক্ষেপ:
বর্তমান সংকটে প্রতিশ্রুতি পূরণ না করায় গুনাহ হবে না, বিশেষত অপর পক্ষ যদি ছেড়ে দেয়। তবে তাদেরকে বিষয়টি জানিয়ে বুঝিয়ে দেয়া,ও ক্ষমা চেয়ে নেয়া, মনে আফসোস রাখা এবং আল্লাহর কাছে তাওবা করা ভালো। নিজের পরিবার ও ঋণ পরিশোধকে অগ্রাধিকার দেওয়া ইসলামসম্মত।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।