সামান্য ছেঁড়া নোট টেপ লাগিয়ে ব্যবহার করার শরয়ী বিধান

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 6007
Questioner: Khurshid Jahan Sania
Question Asked: 27 Sep 2026, 11:19 AM
Reviewed & Published: 27 Sep 2026, 12:05 PM
Views: 10
Tokens: 4,889
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ,
আমার মায়ের একটি ২০ টাকার নোট ছিল, যার একপাশে একদম সামান্য একটু ছেঁড়া ছিল। দোকানদার প্রথমে নোটটি নিতে চাননি। পরবর্তীতে আমি ছেঁড়া অংশে স্কচটেপ লাগিয়ে ছোট বোনকে দিয়ে দোকান থেকে চিপস আনি (দোকানদার নোটটি গ্রহণ করেছিলেন)।
এখন আমার জানার বিষয় হলো—
১. এভাবে স্কচটেপ লাগানো নোট দিয়ে কেনাকাটা করা কি শরীয়তের দৃষ্টিতে কোনো ধরনের ধোঁকা বা গুনাহের কাজ হয়েছে?
২. এই কেনাকাটা কি সম্পূর্ণ হালাল হয়েছে?

Answer

স্কচটেপ লাগানো ছেঁড়া নোট দিয়ে কেনাকাটার শরয়ী বিধান

উত্তর (সংক্ষেপে): প্রশ্নে বর্ণিত পদ্ধতিতে—অর্থাৎ নোটের ছেঁড়া অংশে স্কচটেপ লাগিয়ে, দোকানদারকে বিষয়টি না জানিয়ে বা প্রকৃত অবস্থা গোপন রেখে—নোটটি খরচ করা শরীয়তের দৃষ্টিতে ধোঁকা (গিশ) ও প্রতারণার অন্তর্ভুক্ত। তবে যেহেতু দোকানদার নোটটি গ্রহণ করেছেন এবং চিপসের মূল্য পরিশোধিত হয়েছে, তাই কেনাকাটা বাতিল বা হারাম হয়নি; বরং মূল্য পরিশোধ সহীহ হয়েছে। তবে এভাবে করা থেকে বিরত থাকা কর্তব্য এবং ভবিষ্যতে এমনটি না করার জন্য তাওবা করা উচিত।


১. বিস্তারিত আলোচনা

ক. ছেঁড়া/নষ্ট নোট ব্যবহারের মূলনীতি

ইসলামী শরীয়তে ক্রয়-বিক্রয়ের মূল ভিত্তি হলো পারস্পরিক সন্তুষ্টি (তরাদি) এবং প্রতারণা থেকে মুক্ত থাকা। আল্লাহ তা'আলা বলেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُم بَيْنَكُم بِالْبَاطِلِ إِلَّا أَن تَكُونَ تِجَارَةً عَن تَرَاضٍ مِّنكُمْ

"হে ঈমানদারগণ! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না, তবে পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসার মাধ্যমে হলে ভিন্ন কথা।" — (সূরা নিসা: ২৯)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

مَنْ غَشَّنَا فَلَيْسَ مِنَّا

"যে ব্যক্তি আমাদের সাথে প্রতারণা করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।" — (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১০১; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৩৪৫২)

আরও ইরশাদ হয়েছে:

الْمُسْلِمُونَ عَلَى شُرُوطِهِمْ

"মুসলিমগণ তাদের শর্তাবলির উপর প্রতিষ্ঠিত।" — (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৩৫৯৪; সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ১৩৫২)

খ. ফিকহে হানাফীর দৃষ্টিভঙ্গি

হানাফী ফিকহের মূলনীতি হলো—বিক্রয়ের বিষয়বস্তু (মাবী') এবং মূল্য (সামান) উভয়টিই নির্দিষ্ট, পরিচিত ও ত্রুটিমুক্ত হতে হবে। যদি মূল্যে (নোটে) এমন ত্রুটি থাকে যা সাধারণত মানুষ গ্রহণ করে না, তবে তা গোপন করে দেওয়া প্রতারণা।

আল্লামা ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেন:

وَالْغِشُّ حَرَامٌ فِي الْبَيْعِ وَغَيْرِهِ، وَهُوَ كِتْمَانُ الْعَيْبِ

"প্রতারণা ক্রয়-বিক্রয়সহ সব ক্ষেত্রেই হারাম; আর তা হলো দোষ গোপন করা।" — (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৫, পৃ. ২৩৭, দারুল ফিকর সংস্করণ)

ফাতাওয়া আলমগীরী-তে এসেছে:

لَا يَجُوزُ بَيْعُ الْمَعِيبِ بِدُونِ بَيَانِ الْعَيْبِ

"দোষ প্রকাশ না করে ত্রুটিযুক্ত বস্তু বিক্রয় করা জায়েয নয়।" — (ফাতাওয়া আলমগীরী, খণ্ড ৩, পৃ. ৯৮)

গ. প্রশ্নের প্রথম অংশের বিশ্লেষণ

আপনার মায়ের নোটে যে ছেঁড়া ছিল, তা সামান্য হলেও একটি দৃশ্যমান ত্রুটি। দোকানদার প্রথমে নোটটি নিতে চাননি—এতে প্রমাণিত হয় যে, তিনি ত্রুটিপূর্ণ নোট পছন্দ করেন না। পরে আপনি স্কচটেপ লাগিয়ে ত্রুটিটি ঢেকে দিয়েছেন এবং ছোট বোনকে পাঠিয়েছেন। এখানে দু'টি বিষয় লক্ষণীয়:

  1. স্কচটেপ লাগিয়ে ত্রুটি গোপন করা—এটি এক প্রকার গিশ (প্রতারণা)। কারণ দোকানদার যদি জানতেন যে নোটটি ছেঁড়া ছিল এবং স্কচটেপ দিয়ে জোড়া লাগানো, তবে তিনি হয়তো গ্রহণ করতেন না বা শর্তসাপেক্ষে গ্রহণ করতেন।

  2. ছোট বোনকে পাঠানো—এতে সরাসরি মিথ্যা বলা হয়নি, তবে পরিস্থিতি এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যেন নোটটি স্বাভাবিক। এটি তাদলীস (ধোঁকা)-এর শামিল।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—দোকানদার নোটটি গ্রহণ করেছেন। তিনি যদি নোটটি দেখে গ্রহণ করেন এবং তাতে সন্তুষ্ট থাকেন, তবে ক্রয়-বিক্রয় সহীহ হয়ে গেছে। কারণ বিক্রয়ের রুকন (তরাদি) পূর্ণ হয়েছে।

ঘ. প্রশ্নের দ্বিতীয় অংশের বিশ্লেষণ

যেহেতু দোকানদার নোটটি গ্রহণ করেছেন এবং চিপস দিয়েছেন, তাই:

  • মূল্য পরিশোধ সহীহ হয়েছে—কারণ নোটটি দোকানদারের কাছে হস্তান্তরিত হয়েছে এবং তিনি তা গ্রহণ করেছেন।
  • চিপস হালাল—কারণ এটি বৈধ পণ্য এবং মূল্য পরিশোধিত হয়েছে।
  • কেনাকাটা সহীহ—কারণ তরাদি (পারস্পরিক সম্মতি) বিদ্যমান।

তবে স্কচটেপ লাগিয়ে ত্রুটি গোপন করার বিষয়টি একটি আলাদা গুনাহ, যা ক্রয়-বিক্রয়ের বৈধতাকে প্রভাবিত করে না, বরং এটি একটি নৈতিক ত্রুটি। এর জন্য তাওবা করা উচিত।


২. ফিকহী সিদ্ধান্ত

| বিষয় | সিদ্ধান্ত | |------|----------| | স্কচটেপ লাগিয়ে ত্রুটি গোপন করা | মাকরূহ তাহরীমী (নিকটবর্তী হারাম), কারণ এটি প্রতারণার অন্তর্ভুক্ত | | দোকানদার নোট গ্রহণ করলে কেনাকাটা | সহীহ ও হালাল | | চিপস ভক্ষণ | হালাল | | ভবিষ্যতে করণীয় | এমনটি না করা; তাওবা করা; দোকানদারকে জানানো উত্তম (যদি সম্ভব হয়) |


৩. করণীয়

  1. তাওবা করুন—কারণ ত্রুটি গোপন করা প্রতারণার শামিল ছিল।
  2. ভবিষ্যতে বিরত থাকুন—ছেঁড়া বা ত্রুটিপূর্ণ নোট ব্যবহার করতে হলে দোকানদারকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিন।
  3. দোকানদারকে জানানো—যদি সম্ভব হয় এবং দোকানদার চেনা হয়, তবে তাকে জানিয়ে দেওয়া উত্তম, যাতে তিনি সচেতন হন। তবে এটি বাধ্যতামূলক নয়, কারণ তিনি নোটটি গ্রহণ করেছেন।
  4. সততার সাথে লেনদেন—রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "যে ব্যক্তি আমাদের সাথে প্রতারণা করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।" (সহীহ মুসলিম)

৪. সারসংক্ষেপ

  • প্রশ্ন ১: হ্যাঁ, এভাবে স্কচটেপ লাগিয়ে ত্রুটি গোপন করা শরীয়তের দৃষ্টিতে ধোঁকা ও গুনাহের কাজ। এটি প্রতারণার অন্তর্ভুক্ত।
  • প্রশ্ন ২: যেহেতু দোকানদার নোটটি গ্রহণ করেছেন, তাই কেনাকাটা সহীহ ও হালাল হয়েছে। চিপস ভক্ষণও হালাল। তবে প্রতারণার জন্য তাওবা করা কর্তব্য।

৫. রেফারেন্স

  • আল-কুরআন: সূরা নিসা, আয়াত ২৯
  • সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১০১
  • সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৩৪৫২, ৩৫৯৪
  • সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ১৩৫২
  • রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন শামী), খণ্ড ৫, পৃ. ২৩৭
  • ফাতাওয়া আলমগীরী, খণ্ড ৩, পৃ. ৯৮
  • ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড ৩, পৃ. ৪৫ (প্রতারণা অধ্যায়)
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ৪, পৃ. ২১২

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.