ইসলামি ব্যাংকে ইন্টার্নশিপ করা ও মাসিক পেমেন্ট নেওয়া কি জায়েয?
Halal and Haram · Hanafi
Question
আমার এমবিএ শেষে একটা কোর্স হচ্ছে ইন্টার্নশিপ, সেখানে কোনো একটা ব্যাংক বা কোম্পানির আন্ডারে ৩-৪ মাস কাজ করে এটা উপর রিপোর্ট করতে হয়, সেক্ষেএে কি আমি কি একটা ইসলামি ব্যাংকে ইন্টার্ণশিপ করতে পারবো? কারণ অন্য ব্যাংকে নিকাব এলাও না, ইসলামি ব্যাংকে শুধু মাএ নিকাব পড়ে কাজ করা যায় আর ইন্টার্নশীপ যারা করে তাদের মাসিক একটা পেমেন্ট দেওয়া হয়। সেটা নেওয়া এবং ইন্টার্নশীপ করা কি জায়েজ হবে?
Answer
উত্তর (ফতোয়া)
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
ইসলামি ব্যাংকে ইন্টার্নশিপ করা এবং এর বিনিময়ে মাসিক পেমেন্ট নেওয়া শরীয়তসম্মতভাবে জায়েয, যদি নিম্নোক্ত শর্তগুলো পূরণ হয়:
- ইন্টার্নশিপের কাজটি নিজেই হালাল ও শরীয়তসম্মত হয় (যেমন: হিসাবরক্ষণ, ডকুমেন্টেশন, শরীয়াহ কমপ্লায়েন্স বিভাগে সহায়তা, গ্রাহকসেবা ইত্যাদি)।
- কাজের মধ্যে সুদ, জুয়া, ঘুষ, হারাম চুক্তি সম্পাদন ইত্যাদি হারাম বিষয়ে সরাসরি অংশগ্রহণ বা সহায়তা না থাকে।
- ইসলামি ব্যাংকটি প্রকৃতপক্ষে শরীয়ত মেনে পরিচালিত হয় (শরীয়াহ সুপারভাইজরি বোর্ড কর্তৃক অনুমোদিত)।
- মাসিক পেমেন্টটি ইজারাহ/জুয়ালাহ (কাজের বিনিময়) হিসেবে প্রদান করা হয়, সুদ হিসেবে নয়।
বিস্তারিত:
ইসলামি ব্যাংকগুলো প্রচলিত সুদভিত্তিক ব্যাংক থেকে ভিন্ন। এগুলো মুদারাবা, মুশারাকা, ইজারা, মুরাবাহা, সালাম, ইস্তিসনা ইত্যাদি শরীয়তসম্মত চুক্তির ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। তাই এসব ব্যাংকে ইন্টার্নশিপ করা এবং কাজের বিনিময়ে পারিশ্রমিক নেওয়া নাজায়েজ নয়; বরং এটি জায়েয।
তবে শর্ত হলো—ইন্টার্ন হিসেবে আপনাকে এমন কোনো কাজ করতে দেওয়া হবে না, যা সরাসরি সুদি লেনদেন, হারাম চুক্তি, বা শরীয়তবিরোধী কার্যক্রমের সাথে সম্পৃক্ত। যেমন: সুদি ঋণ অনুমোদন, সুদি হিসাব রক্ষণ, জুয়া বা হারাম ব্যবসার লেনদেন সম্পাদন ইত্যাদি। যদি ইসলামি ব্যাংকটি প্রকৃতপক্ষে শরীয়ত মেনে চলে, তাহলে সেখানে ইন্টার্নশিপ করা ও পারিশ্রমিক নেওয়া জায়েয।
দলিল:
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
“আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।”
(সূরা আল-বাকারা: ২৭৫)
আল্লাহ আরও বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ
“হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যা বাকি আছে তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা মুমিন হও।”
(সূরা আল-বাকারা: ২৭৮)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ آكِلَ الرِّبَا وَمُوكِلَهُ وَكَاتِبَهُ وَشَاهِدَيْهِ، وَقَالَ: هُمْ سَوَاءٌ
“রাসূলুল্লাহ ﷺ সুদ খাওয়ালে, খাওয়ানোতে, লেখনিতে ও সাক্ষীদ্বয়ে লানত করেছেন এবং বলেছেন: তারা সবাই সমান (গুনাহে)।”
(সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১৫৯৮)
এই হাদিস দ্বারা বোঝা যায়, সুদি লেনদেনে সরাসরি সহায়তা করা নাজায়েয। কিন্তু ইসলামি ব্যাংকের শরীয়তসম্মত কার্যক্রমে সহায়তা করা এর অন্তর্ভুক্ত নয়।
হানাফি ফিকহের কিতাবসমূহে উল্লেখ আছে:
- ইজারাহ (কাজের বিনিময়ে পারিশ্রমিক) জায়েয। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৪)
- যদি কাজটি হালাল হয় এবং পারিশ্রমিক নির্ধারিত হয়, তবে তা জায়েয। (আল-হিদায়া, কিতাবুল ইজারাহ)
- শরীয়তবিরোধী কাজে সহায়তা করা নাজায়েয। (ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৩৪৮)
ফাতাওয়া উসমানি (খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৪২১) ও ইমদাদুল ফাতাওয়া (খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ২৯৮)-তেও ইসলামি ব্যাংকে চাকরি ও ইন্টার্নশিপের বৈধতার কথা উল্লেখ আছে, শর্তসাপেক্ষে।
উপসংহার:
আপনি ইসলামি ব্যাংকে ইন্টার্নশিপ করতে পারবেন এবং মাসিক পেমেন্ট নিতে পারবেন, যদি উক্ত ব্যাংক প্রকৃত ইসলামি ব্যাংক হয় এবং আপনার কাজ শরীয়তসম্মত হয়। অন্য ব্যাংকে নিকাব না পড়ার অনুমতি না থাকলে সেটি আপনার ব্যক্তিগত অসুবিধা; তবে ইসলামি ব্যাংকে নিকাব পরে কাজ করা এবং ইন্টার্নশিপ করা জায়েয।
والله أعلم بالصواب