পিরিয়ড চলাকালীন নিয়ম কানুন সম্পর্কে।
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
Period চলাকালীন স্বামী-স্ত্রীর সহবাস সংক্রান্ত বিধান
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
প্রশ্নে বলা হয়েছে: "Period চলাকালীন আমি আমার নিজের জোড়া (স্বামী) থাকতে না পারলে আর কবে থাকা যাবে?" — অর্থাৎ, হায়েজ (মাসিক) চলাকালীন স্বামী-স্ত্রীর সহবাস করা যাবে কি না, আর না পারলে কখন করা যাবে — এই সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়েছে।
কুরআনের দলিল
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الْمَحِيضِ ۖ قُلْ هُوَ أَذًى فَاعْتَزِلُوا النِّسَاءَ فِي الْمَحِيضِ ۖ وَلَا تَقْرَبُوهُنَّ حَتَّىٰ يَطْهُرْنَ ۚ فَإِذَا تَطَهَّرْنَ فَأْتُوهُنَّ مِنْ حَيْثُ أَمَرَكُمُ اللَّهُ ۚ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ
অর্থ: "আর তারা আপনাকে হায়েজ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলুন, এ হলো অশুচিতা। সুতরাং হায়েজের সময় স্ত্রীদের থেকে দূরে থাকো এবং তারা পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত তাদের নিকটবর্তী হয়ো না। অতঃপর তারা যখন পবিত্র হয়, তখন তাদের কাছে গমন করো যেভাবে আল্লাহ তোমাদের আদেশ দিয়েছেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং পবিত্রতা অর্জনকারীদেরও ভালোবাসেন।" (সূরা আল-বাকারা: ২২২)
হাদিসের দলিল
১. সহবাস সম্পূর্ণ হারাম
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
مَنْ أَتَى حَائِضًا أَوِ امْرَأَةً فِي دُبُرِهَا أَوْ كَاهِنًا فَقَدْ كَفَرَ بِمَا أُنْزِلَ عَلَى مُحَمَّدٍ
অর্থ: "যে ব্যক্তি হায়েজ অবস্থায় স্ত্রীর সাথে সহবাস করে, অথবা স্ত্রীর পশ্চাদ্দ্বারে সহবাস করে, অথবা গণকের কাছে যায় — সে মুহাম্মদ ﷺ এর উপর যা নাযিল হয়েছে তা অস্বীকার করল।" (সুনানে তিরমিজি: ১৩৫, সুনানে আবু দাউদ: ৩৯০৪ — ইমাম তিরমিজি হাসান বলেছেন)
২. কাফফারা বা ক্ষতিপূরণ
হাদিসে এসেছে, এক ব্যক্তি হায়েজ অবস্থায় স্ত্রীর সাথে সহবাস করলে রাসূলুল্লাহ ﷺ তাকে বললেন:
تَصَدَّقْ بِدِينَارٍ أَوْ نِصْفِ دِينَارٍ
অর্থ: "এক দীনার অথবা অর্ধ দীনার সদকা করো।" (সুনানে আবু দাউদ: ২১৬৮, সুনানে তিরমিজি: ১৩৫ — ইমাম তিরমিজি হাসান সহিহ বলেছেন)
৩. হায়েজকালীন সময়ে যা করা জায়েজ
আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত:
كَانَ إِذَا كَانَتْ إِحْدَانَا حَائِضًا أَمَرَهَا أَنْ تَأْتَزِرَ فِي فَوْرِ حَيْضَتِهَا ثُمَّ يُبَاشِرُهَا
অর্থ: "আমাদের কেউ হায়েজ অবস্থায় থাকলে রাসূলুল্লাহ ﷺ তাকে ইযার (লুঙ্গি/কাপড়) পরিধান করতে বলতেন, অতঃপর তার সাথে মেলামেশা (চুম্বন, আলিঙ্গন ইত্যাদি) করতেন।" (সহিহ বুখারি: ৩০০, সহিহ মুসলিম: ২৯৩)
হানাফি ফিকহের বিধান
১. সহবাস (জিমা) সম্পূর্ণ হারাম
হায়েজ চলাকালীন সময়ে স্ত্রীর সাথে সহবাস করা সম্পূর্ণ হারাম ও কবিরা গুনাহ। এটি কুরআন ও হাদিসের সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা।
আল-হিদায়া গ্রন্থে বলা হয়েছে:
ويحرم على الرجل أن يطأ امرأته وهي حائض
অর্থ: "নারীর হায়েজ অবস্থায় তার সাথে সহবাস করা পুরুষের জন্য হারাম।" (আল-হিদায়া, কিতাবুত তাহারাত)
রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন শামি রহ.)-এ উল্লেখ আছে:
ووطؤها في الحيض حرام بالإجماع
অর্থ: "হায়েজ অবস্থায় সহবাস করা ইজমা' (সর্বসম্মত) দ্বারা হারাম।" (রাদ্দুল মুহতার: ১/২৯২)
২. নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত অংশ স্পর্শ করা
হায়েজকালীন সময়ে নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত অংশে স্পর্শ করা, চুম্বন করা বা মেলামেশা করা মাকরুহ তাহরিমি (নিষিদ্ধের কাছাকাছি)। তবে নাভির উপরে ও হাঁটুর নিচে স্পর্শ করা জায়েজ।
ফাতাওয়া আলমগিরি-তে আছে:
ولا يقرب ما بين السرة والركبة
অর্থ: "নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত অংশের নিকটবর্তী হবে না।" (ফাতাওয়া আলমগিরি: ১/৩৭)
৩. হায়েজ শেষ হলে কখন সহবাস জায়েজ
হায়েজ শেষ হওয়ার পর সহবাস জায়েজ হওয়ার শর্ত:
-
রক্ত সম্পূর্ণ বন্ধ হতে হবে — অর্থাৎ হায়েজের সর্বনিম্ন সময় ৩ দিন এবং সর্বোচ্চ ১০ দিন। ১০ দিনের মধ্যে রক্ত বন্ধ হলে গোসল করার পর সহবাস জায়েজ।
-
গোসল করা বা অন্ততপক্ষে এক ওয়াক্ত নামাজের সময় পরিমাণ অপেক্ষা করা — হানাফি মাযহাবে, রক্ত বন্ধ হওয়ার পর গোসল করা ফরজ। গোসলের আগে সহবাস করা মাকরুহ। তবে যদি গোসল না করে এক ওয়াক্ত নামাজের সময় অতিক্রান্ত হয়ে যায়, তাহলে গোসল ছাড়াও সহবাস জায়েজ।
আল-হিদায়া-তে আছে:
فإذا انقطع الدم واغتسلت حل وطؤها
অর্থ: "যখন রক্ত বন্ধ হয় এবং সে গোসল করে, তখন তার সাথে সহবাস হালাল হয়।" (আল-হিদায়া)
রাদ্দুল মুহতার-এ ইবনে আবিদীন বলেন:
إذا انقطع الدم لأقل من عشرة أيام لا يحل الوطء حتى تغتسل أو يمضي عليها وقت صلاة
অর্থ: "যদি ১০ দিনের কমে রক্ত বন্ধ হয়, তাহলে গোসল করা অথবা এক ওয়াক্ত নামাজের সময় অতিক্রান্ত হওয়া পর্যন্ত সহবাস হালাল হবে না।" (রাদ্দুল মুহতার: ১/২৯৩)
৪. হায়েজের সর্বোচ্চ সময়
হানাফি মাযহাবে হায়েজের সর্বোচ্চ সময় ১০ দিন ১০ রাত। যদি ১০ দিন পরেও রক্ত চলতে থাকে, তাহলে তা ইস্তিহাযা (অসুস্থতার রক্ত) হিসেবে গণ্য হবে। তখন নামাজ-রোজা বন্ধ হবে না এবং সহবাসও জায়েজ হবে (তবে গোসল/ওযু করে নিতে হবে)।
ফাতাওয়া উসমানি-তে উল্লেখ আছে:
الحيض في مذهبنا عشرة أيام بلياليها، فما زاد فهو استحاضة
অর্থ: "আমাদের মাযহাবে হায়েজ ১০ দিন ১০ রাত, এর বেশি হলে তা ইস্তিহাযা।" (ফাতাওয়া উসমানি: ১/১৩৫)
সারসংক্ষেপ ও ব্যবহারিক নির্দেশনা
| বিষয় | বিধান | |------|--------| | হায়েজকালীন সহবাস | সম্পূর্ণ হারাম (কবিরা গুনাহ) | | নাভি-হাঁটুর মাঝে স্পর্শ/চুম্বন | মাকরুহ তাহরিমি | | নাভির উপরে ও হাঁটুর নিচে স্পর্শ | জায়েজ | | হায়েজ শেষে সহবাস | গোসলের পর জায়েজ | | গোসল না করে এক ওয়াক্ত নামাজের সময় পার হলে | সহবাস জায়েজ | | ১০ দিন পরেও রক্ত চললে | ইস্তিহাযা — সহবাস জায়েজ |
গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
-
হায়েজ চলাকালীন সহবাস থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকুন — এটি কুরআনের সুস্পষ্ট আদেশ।
-
ভুলবশত সহবাস হয়ে গেলে — তাওবা করুন এবং হাদিস অনুযায়ী এক দীনার বা অর্ধ দীনার সদকা করুন। (সুনানে আবু দাউদ: ২১৬৮)
-
হায়েজ শেষ হলে — গোসল করার পর সহবাস করুন। গোসল করতে না পারলে অন্তত এক ওয়াক্ত নামাজের সময় পার হওয়ার পর সহবাস করা যাবে।
-
সন্দেহ হলে — রক্ত সম্পূর্ণ বন্ধ হয়েছে কিনা নিশ্চিত হোন। সাদা স্রাব (পানি) দেখা গেলে হায়েজ শেষ হয়েছে বলে ধরে নিন।
-
ইস্তিহাযার ক্ষেত্রে — ১০ দিনের বেশি রক্ত চললে প্রতি নামাজের সময় ওযু করে নামাজ পড়বেন এবং সহবাস জায়েজ হবে।
উপসংহার
হায়েজ চলাকালীন স্বামী-স্ত্রীর সহবাস সম্পূর্ণ হারাম। এই সময়ে শুধু চুম্বন, আলিঙ্গন, নাভির উপরে ও হাঁটুর নিচে স্পর্শ করা জায়েজ। হায়েজ শেষ হওয়ার পর গোসল করার পর সহবাস করা জায়েজ। যদি গোসল না করে এক ওয়াক্ত নামাজের সময় অতিক্রান্ত হয়ে যায়, তাহলেও সহবাস জায়েজ। ১০ দিনের বেশি রক্ত চললে তা ইস্তিহাযা হিসেবে গণ্য হবে এবং তখন সহবাস জায়েজ।