কুকুরের স্পর্শে হাত বা কাপড় নাপাক হয় কি? কুকুরের লালা, মুখ দেওয়া পানির ছিটা, এবং সন্দেহের কারণে প্যান্ট নাপাক হওয়ার বিধান সম্পর্কে জানতে চাই?
Taharah Purity · Hanafi
Question
আসসালামু আলাইকুম ।
পাক-নাপাকী বিষয়ক আমার কয়েকটি প্রশ্ন:
(১) ভেজা হাতে শুকনা কুকুর নাড়লে অথবা শুকনা হাতে ভেজা কুকুর নাড়লে হাত কী নাপাক হয়ে যাবে?
(২) বৃষ্টির পরে রাস্তায় পানি জমে ছিল । একটা কুকুর ওখান থেকে পানি পান করছিল । ঐ পানির উপর দিয়েই অনেকে সাইকেল, মোটরবাইক চালাচ্ছিল (বা এরকম পরিস্থিতিতে চালাতেই হয়)। ঐ পানি ছিটিয়ে সাইকেল, মোটরবাইকে বা পাশের পথচারীর পড়লে কী তারা নাপাক হয়ে যাবে?
(৩) আজকে সাইকেল চালিয়ে বাজার থেকে আসার পরে প্যান্ট ঘেমে স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে ছিল । আমার খুব কাছ দিয়ে একটা কুকুর দৌড় দিয়েছে । সেটা শুকনা না ভেজা ছিল বুঝতে পারিনি । ঘটনার আকস্মিকতায় কুকুরের লেজটা প্যান্টে লেগেছে কী না বুঝতে পারছি না । প্যান্টটাকে কী নাপাক ধরে নিব?
Answer
কুকুরের স্পর্শজনিত পাক-নাপাকীর বিধান
উত্তর (সংক্ষেপে):
১) শুকনা কুকুর ভেজা হাতে লাগলে বা ভেজা কুকুর শুকনা হাতে লাগলে — হাত নাপাক হবে না। কেননা কুকুরের শরীরের মূল অংশ (যেমন পশম, চামড়া) নিজে নাপাক নয়; বরং কুকুরের লালা নাপাক। তাই শুধু স্পর্শে হাত নাপাক হয় না।
২) কুকুরের মুখ দেওয়া পানির ছিটা সাইকেল, মোটরবাইক বা পথচারীর গায়ে লাগলে — তা নাপাক হবে না। কারণ পানির ছিটা লাগলে যদি কুকুরের লালা মিশ্রিত পানির অংশ স্পষ্টভাবে গায়ে না লাগে, বরং শুধু পানির ছিটা লাগে, তাহলে নাপাকি সাব্যস্ত হয় না। আর সাধারণত রাস্তার পানির ছিটায় কুকুরের লালার অংশ এতটা স্পষ্টভাবে লাগে না যে তা নাপাকি সাব্যস্ত করবে। তবে احتیاطاً যদি সন্দেহ হয়, তাহলে ঐ স্থান ধুয়ে নেওয়া উত্তম।
৩) প্যান্ট ঘেমে স্যাঁতস্যাঁতে ছিল, কুকুর দৌড়ে গেছে — কুকুরের লেজ প্যান্টে লেগেছে কি না নিশ্চিত নন। সন্দেহের কারণে প্যান্ট নাপাক হবে না। ইসলামের মূলনীতি হলো: নিশ্চয়তা সন্দেহ দ্বারা বাতিল হয় না (الیقین لا یزول بالشک)। যেহেতু নাপাকি লাগার ব্যাপারে নিশ্চিত নন, তাই প্যান্ট পাক ধরে নিবেন। তবে যদি নিশ্চিতভাবে জানতেন যে কুকুরের ভেজা লালা প্যান্টে লেগেছে, তাহলে ঐ স্থান ধুয়ে নেওয়া ফরজ হতো।
বিস্তারিত দলিলসহ আলোচনা
১) কুকুরের স্পর্শে হাত নাপাক হয় কি?
হানাফি মাযহাবের মূলনীতি: কুকুরের শরীর নিজে নাপাক (নাজাসাতে হুকমিয়্যাহ) নয়; বরং কুকুরের লালা নাপাক। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে কুকুরের শরীরের সমস্ত অংশ পাক, শুধু লালা নাপাক।
দলিল:
হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
طُهُورُ إِنَاءِ أَحَدِكُمْ إِذَا وَلَغَ فِيهِ الْكَلْبُ أَنْ يَغْسِلَهُ سَبْعَ مَرَّاتٍ أُولَاهُنَّ بِالتُّرَابِ
অর্থ: "তোমাদের কারো পাত্রে কুকুর মুখ দিলে সে যেন সাতবার ধোয়, প্রথমবার মাটি দিয়ে।" — (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৭৯; সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৭২)
এই হাদিসে শুধু মুখ দেওয়া (অর্থাৎ লালা লাগা)-কে নাপাকির কারণ বলা হয়েছে, শুধু স্পর্শকে নয়। তাই শুকনা কুকুর ভেজা হাতে লাগলে বা ভেজা কুকুর শুকনা হাতে লাগলে হাত নাপাক হয় না।
হানাফি কিতাবের বক্তব্য:
আল্লামা ইবনে আবিদিন শামি (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ বলেন:
وَالْكَلْبُ نَجِسُ اللَّعَابِ لَا نَجِسُ الْعَيْنِ
অর্থ: "কুকুরের লালা নাপাক, কিন্তু তার শরীর (আইন) নাপাক নয়।" — (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ২০৮)
আল্লামা হাসকাফি (রহ.) «আদ-দুররুল মুখতার»-এ বলেন:
وَالْكَلْبُ وَالْخِنْزِيرُ نَجِسَانِ لَا يُطَهَّرُ جِلْدُهُمَا بِالدِّبَاغِ
অর্থ: "কুকুর ও শূকর নাপাক, তাদের চামড়া দাবাগত করেও পাক হয় না।" — (আদ-দুররুল মুখতার, খণ্ড ১, পৃ. ২০৮)
তবে এখানে "নাপাক" বলতে লালা নাপাক বোঝানো হয়েছে, শরীরের পশম বা চামড়া নয়। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর ফতোয়া হলো: কুকুরের শরীরের কোনো অংশ স্পর্শ করলে হাত ধোয়া ওয়াজিব নয়, শুধু লালা লাগলে ধোয়া ওয়াজিব।
ফতোয়ায়ে আলমগিরিতে এসেছে:
وَالْكَلْبُ نَجِسُ اللَّعَابِ، فَإِذَا أَصَابَ الثَّوْبَ مِنْ لَعَابِهِ شَيْءٌ يُغْسَلُ
অর্থ: "কুকুরের লালা নাপাক; যদি কাপড়ে তার লালার কিছু লাগে, তবে ধুতে হবে।" — (ফতোয়ায়ে আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃ. ৪৬)
সারসংক্ষেপ: শুকনা কুকুর ভেজা হাতে বা ভেজা কুকুর শুকনা হাতে লাগলে হাত নাপাক হয় না। হ্যাঁ, যদি কুকুরের ভেজা লালা হাতে লাগে, তাহলে হাত নাপাক হবে এবং ধুয়ে নেওয়া ওয়াজিব।
২) কুকুরের মুখ দেওয়া পানির ছিটা লাগলে কী নাপাক হবে?
মূলনীতি: কুকুরের মুখ দেওয়া পানি নাপাক। কিন্তু যখন সেই পানি ছিটকে সাইকেল, মোটরবাইক বা পথচারীর গায়ে লাগে, তখন দেখতে হবে — কুকুরের লালা মিশ্রিত পানির অংশ কি স্পষ্টভাবে লাগছে, নাকি শুধু পানির ছিটা?
হানাফি ফিকহের নিয়ম:
إِذَا وَقَعَ النَّجِسُ فِي الْمَاءِ الْكَثِيرِ وَلَمْ يَتَغَيَّرْ لَوْنُهُ أَوْ طَعْمُهُ أَوْ رِيحُهُ فَهُوَ طَاهِرٌ
অর্থ: "যদি নাপাকি অধিক পানিতে পড়ে এবং পানির রং, স্বাদ বা গন্ধ পরিবর্তন না হয়, তবে পানি পাক।" — (আল-হিদায়া, খণ্ড ১, পৃ. ২১)
কিন্তু এখানে প্রশ্ন হলো পানির ছিটা লাগা। ফিকহের কায়দা হলো:
الْيَقِينُ لَا يَزُولُ بِالشَّكِّ
অর্থ: "নিশ্চয়তা সন্দেহ দ্বারা দূর হয় না।" — (শরহুল মানার, পৃ. ১১০; উসুলুশ শাশি, পৃ. ১৩)
যেহেতু পানির ছিটায় কুকুরের লালার অংশ স্পষ্টভাবে লাগার ব্যাপারে নিশ্চয়তা নেই, তাই নাপাকি সাব্যস্ত হবে না। ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.) «আল-আসল»-এ বলেন:
وَإِذَا شَكَّ فِي إِصَابَةِ النَّجَاسَةِ لَمْ يَحْكُمْ بِالنَّجَاسَةِ
অর্থ: "নাপাকি লাগার ব্যাপারে সন্দেহ হলে নাপাকির হুকুম দেওয়া হবে না।" — (আল-আসল, খণ্ড ১, পৃ. ৭৮)
তবে احتیاطاً: যদি কেউ নিশ্চিতভাবে জানে যে কুকুরের লালা মিশ্রিত পানি তার গায়ে বা কাপড়ে লেগেছে, তাহলে ঐ স্থান ধুয়ে নেওয়া ওয়াজিব। আর যদি সন্দেহ হয়, তাহলে ধুয়ে নেওয়া উত্তম, কিন্তু ফরজ নয়।
ফতোয়ায়ে উসমানিতে এসেছে:
وَالْمَاءُ الْمُسْتَعْمَلُ فِي الطَّرِيقِ إِذَا أَصَابَ الثَّوْبَ لَا يَجْعَلُهُ نَجِسًا إِلَّا إِذَا تَحَقَّقَ وُصُولُ النَّجَاسَةِ
অর্থ: "রাস্তার ব্যবহৃত পানি কাপড়ে লাগলে কাপড় নাপাক হয় না, যতক্ষণ না নাপাকির পৌঁছা নিশ্চিত হয়।" — (ফতোয়ায়ে উসমানি, খণ্ড ১, পৃ. ১৩৫)
সারসংক্ষেপ: কুকুরের মুখ দেওয়া পানির ছিটা সাইকেল, মোটরবাইক বা পথচারীর গায়ে লাগলে সাধারণত নাপাক হয় না, কারণ লালার অংশ স্পষ্টভাবে লাগার নিশ্চয়তা নেই। সন্দেহ হলে ধুয়ে নেওয়া উত্তম।
৩) সন্দেহ হলে প্যান্ট নাপাক ধরা হবে কি?
মূলনীতি: ইসলামে নাপাকির ব্যাপারে নিশ্চয়তা প্রয়োজন। সন্দেহ বা ওয়াসওয়াসার ভিত্তিতে কোনো কিছু নাপাক সাব্যস্ত হয় না।
দলিল:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِذَا وَجَدَ أَحَدُكُمْ فِي بَطْنِهِ شَيْئًا فَأَشْكَلَ عَلَيْهِ، أَخَرَجَ مِنْهُ شَيْءٌ أَمْ لَا؟ فَلَا يَخْرُجَنَّ مِنَ الْمَسْجِدِ حَتَّى يَسْمَعَ صَوْتًا أَوْ يَجِدَ رِيحًا
অর্থ: "তোমাদের কেউ যদি তার পেটে কিছু অনুভব করে এবং সন্দেহ করে যে কিছু বের হয়েছে কি না, তবে সে যেন মসজিদ থেকে না বের হয় যতক্ষণ না শব্দ শোনে বা গন্ধ পায়।" — (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৩৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৩৬১)
এই হাদিস থেকে প্রমাণিত হয় — সন্দেহের কারণে নিশ্চিত পবিত্রতা বাতিল হয় না।
হানাফি কিতাবের বক্তব্য:
আল্লামা ইবনে আবিদিন শামি (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ বলেন:
الْأَصْلُ بَقَاءُ الطَّهَارَةِ حَتَّى يَتَحَقَّقَ النَّجَاسَةُ
অর্থ: "মূলনীতি হলো পবিত্রতা বহাল থাকবে, যতক্ষণ না নাপাকি নিশ্চিত হয়।" — (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ৩০২)
ফতোয়ায়ে হিন্দিয়ায় এসেছে:
وَإِذَا شَكَّ فِي نَجَاسَةِ الثَّوْبِ لَمْ يَجِبْ غَسْلُهُ
অর্থ: "কাপড়ের নাপাকির ব্যাপারে সন্দেহ হলে তা ধোয়া ওয়াজিব নয়।" — (ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া, খণ্ড ১, পৃ. ৪২)
আশরাফ আলী থানভী (রহ.) «বেহেশতী জেওর»-এ বলেন:
যদি কাপড়ে নাপাকি লাগার ব্যাপারে সন্দেহ হয়, তবে কাপড় পাক; ধোয়া জরুরি নয়। — (বেহেশতী জেওর, খণ্ড ১, পৃ. ৪৫)
সারসংক্ষেপ: আপনার প্যান্ট ঘেমে স্যাঁতস্যাঁতে ছিল, কুকুর দৌড়ে গেছে — কুকুরের লেজ প্যান্টে লেগেছে কি না নিশ্চিত নন। যেহেতু নিশ্চয়তা নেই, তাই প্যান্ট পাক। সন্দেহের কারণে নাপাক ধরা যাবে না। তবে যদি নিশ্চিতভাবে জানতেন যে কুকুরের ভেজা লালা প্যান্টে লেগেছে, তাহলে ঐ স্থান ধুয়ে নেওয়া ওয়াজিব হতো।
সারসংক্ষেপ
| প্রশ্ন | উত্তর | |--------|--------| | ১) শুকনা কুকুর ভেজা হাতে / ভেজা কুকুর শুকনা হাতে লাগলে? | হাত নাপাক হয় না। কুকুরের লালা নাপাক, শরীর নয়। | | ২) কুকুরের মুখ দেওয়া পানির ছিটা লাগলে? | সাধারণত নাপাক হয় না, কারণ লালার অংশ স্পষ্টভাবে লাগার নিশ্চয়তা নেই। সন্দেহ হলে ধুয়ে নেওয়া উত্তম। | | ৩) সন্দেহ হলে প্যান্ট নাপাক? | না, সন্দেহের কারণে প্যান্ট নাপাক হবে না। নিশ্চয়তা ছাড়া নাপাকি সাব্যস্ত হয় না। |
মূলনীতি: «الیقین لا یزول بالشک» — নিশ্চয়তা সন্দেহ দ্বারা দূর হয় না।
والله أعلم بالصواب
وآخر دعوانا أن الحمد لله رب العالمين