নবীজিকে গালী দিলে ঈমান যায় কি?
Faith and Belief · Hanafi
Question
১. হয় তিনি দুনিয়াবি লোভের জন্য(নারী, সম্পদ, নেতৃত্ব) মিথ্যা বলেছেন- এটা সত্যি না কারণ তাঁর কাছে এ সবই অফার করা হলেও তিনি বলেন একহাতে চাঁদ আরেক হাতে সূর্য এনে দিলেও তিনি সত্য প্রচার ছাড়বেননা।
২. তিনি পাগল ছিলেন- এটা সত্যি না, কারণ তাঁর সারাজীবন খুবই কনসিসটেন্ট এবং তিনি তার জীবনের সব দায়িত্ব পারফেক্টভাবে পালন করেছেন।
৩. তিনি নবী ছিলেন- এটা সত্যি৷ এরপরে তার প্রফেসী, মুজিযা, কুরআনের অলৌকিকত্ব এগুলোও বলি।
তো এগুলো বোঝাতে গিয়ে নবীজির সম্পর্কে 'পাগল', বা 'নারীলোভী' এগুলোও বলতে হয় উদাহরণ হিসেবে। তো এগুলো বলার সময় পাশে আমার একজন ইসলামবিদ্বেষী আত্মীয় থাকায় তাকে শোনানোর জন্য আমি একটু বেশি উৎসাহ নিয়ে এই 'নবীজি পাগল বা নারীলোভী' শব্দগুলো জোরে জোরে বলি(কারণ ইসলামবিদ্বেষীরা এসব শব্দ বলে ইসলামের কটূক্তি করে), যাতে এগুলো শুনে ওই আত্মীয় আকৃষ্ট হন বা আসলে এগুলো নিয়ে আমাদের জবাব কী এগুলো শোনেন। আমার যতদূর মনে পড়ে, নবীজিকে নারীলোভী বা পাগল বলার সময় আমি এগুলোকে সত্যি বলে বিশ্বাস করিনি, আমার উদ্দেশ্য ছিল শ্রোতা আকর্ষণ। কিন্তু বলার সময় শয়তানের ধোঁকায় বা অন্যকারণে হালকা মজা লাগার অনুভূতি তৈরী হয়েছিল কীনা এটাও নিশ্চিত না।
এতে কি আমার ঈমান চলে গেছে?
২. আজ শুক্রবার হওয়ায় আমার বোনকে জিজ্ঞেস করি সূরা কাহাফ পড়ে শেষ করেছে কীনা(আমার হায়েজ থাকায় কুরআন পড়তে পারিনি)। সে বলে, পুরোটা করেনি৷ তখন আমি বলি যে, "আমি ইউটিউব থেকে সূরা কাহাফ তিলাওয়াত শুনে নেব, তোমার তোতলানো মার্কা তিলাওয়াত আমার ভালো লাগেনা(আমার বোন তিলাওয়াতে ততটা ফ্লুয়েন্ট না)৷
এক্ষেত্রে কুরআনকে খারাপ বলা আমার কখনোই উদ্দেশ্য ছিলনা৷ তবে আমার নিজের ভালো লাগাকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়ে গেছে, অন্যকে টিটকারি দেয়া হয়েছে।
এতে কি আমার ঈমান চলে গেছে?
আমি দুটোর জন্যেই খুব বেশি করে মাফ চেয়েছি আল্লাহর কাছে। কিন্তু ঈমান নিয়ে বারবার ওয়াসওয়াসা আসায় বিরক্ত হয়ে নতুন করে আর কালিমা পড়িনি এবার।
৩. কোনো বিয়ের প্রস্তাব আসলে সেটা যদি একদমই পছন্দ না হয় তাহলেও কি ইস্তেখারা করতে হবে?
যদি এই বিয়ে পজিটিভ হবার সিদ্ধান্ত ইস্তেখারায় এসে যাবার ভয়ে ইস্তেখারা না করি তাহলে কি ঈমান চলে যাবে? কারণ এখানে তো আমি আল্লাহর উপরে ভরসা করছিনা। জানি, যে ইস্তেখারা পজিটিভ হলে সেটা আমার জন্য কল্যাণকরই হবে, কিন্তু মনে হয় যদি ওই কষ্ট সহ্য করতে না পারি? যদি ওই পাত্রকে পরে ভালো না লাগে?
Answer
ওয়াসওয়াসা, কুফর নয় — বিস্তারিত ফিকহি উত্তর
উত্তর নং ১ ও ২: ঈমান কি চলে গেছে?
প্রথমেই একটি মূলনীতি মনে রাখুন, যা ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ এবং মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) মা'আরিফুল কুরআন-এ স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন:
কুফর হলো অন্তরের বিশ্বাস ও স্বীকৃতির বিষয়। মুখে উচ্চারিত কোনো শব্দ — যদি অন্তর তা সত্য বলে বিশ্বাস না করে — কুফর হয় না; বরং তা হয় গুনাহ, বা ক্ষেত্রবিশেষে নিছক ভুল।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
"যে ব্যক্তি ঈমান আনার পর আল্লাহকে অস্বীকার করে — তবে যে বাধ্য হয়, অথচ তার অন্তর ঈমানে অবিচল — (সে মুক্তি পাবে); কিন্তু যে কুফরির জন্য বক্ষ প্রশস্ত করে, তাদের উপর আল্লাহর গজব..." (সূরা নাহল: ১০৬)
এই আয়াতের শানে নুযুল হলো আম্মার ইবনে ইয়াসির (রা.)-এর ঘটনা — তিনি মুশরিকদের নির্যাতনে বাধ্য হয়ে মুখে কুফরির কথা বলেছিলেন, অথচ অন্তর ঈমানে পূর্ণ ছিল। রাসূলুল্লাহ (সা.) তাকে ঈমানদারই বলেছেন। (তাফসিরে ইবনে কাসির, মা'আরিফুল কুরআন)
আপনার প্রথম ঘটনা:
আপনি নবীজি (সা.)-কে "পাগল" বা "নারীলোভী" বলেছেন — কিন্তু উদ্দেশ্য ছিল উল্টো: অর্থাৎ এগুলো যে মিথ্যা অভিযোগ, তা প্রমাণ করা। এটি ছিল একটি যুক্তি-পদ্ধতি (dialectic) — যেমন কেউ বলতে পারে: "কেউ যদি বলে অমুক ব্যক্তি চোর, তবে তা মিথ্যা, কারণ..." — এখানে "চোর" শব্দটি উচ্চারণ করা হয় প্রতিবাদের জন্য, বিশ্বাসের জন্য নয়।
ফিকহি সিদ্ধান্ত:
- আপনি অন্তরে এগুলো সত্য বিশ্বাস করেননি → কুফর হয়নি।
- তবে শব্দগুলো জোরে বলা, বিশেষত ইসলামবিদ্বেষীর সামনে, এবং তাতে "হালকা মজা" লাগার সম্ভাবনা — এটি শয়তানের ওয়াসওয়াসা ও গুনাহের কাছাকাছি। এ থেকে তাওবা জরুরি।
- ঈমান যায়নি। কারণ ঈমানের মূল ভিত্তি (আল্লাহ, রাসূল, আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস) আপনার অন্তরে অটুট ছিল।
ইমাম তাহাবি (রহ.) আকিদাতুত তাহাবিয়া-তে বলেন: "ঈমান হলো অন্তরের স্বীকৃতি ও মুখের স্বীকারোক্তি।" শুধু মুখের ভুল উচ্চারণে ঈমান বাতিল হয় না, যতক্ষণ অন্তর অস্বীকার না করে।
আপনার দ্বিতীয় ঘটনা:
"তোমার তোতলানো মার্কা তিলাওয়াত ভালো লাগে না" — এখানে আপনি কুরআনকে খারাপ বলেননি; বরং আপনার বোনের তিলাওয়াতের ধরণ নিয়ে মন্তব্য করেছেন। এটি কুরআনের অবমাননা নয়, বরং আপনার বোনকে টিটকারি দেওয়া — যা গুনাহ (মুসলিমের সাথে খারাপ ব্যবহার), কিন্তু কুফর নয়।
তবে সতর্কতা: কুরআন তিলাওয়াত নিয়ে হালকা মন্তব্য করাও উচিত নয়। ফাতাওয়া উসমানি-তে আছে, কুরআনের প্রতি সম্মানহানি হয় এমন কথা বলা থেকে বিরত থাকা কর্তব্য।
উপসংহার: উভয় ঘটনাতেই আপনার ঈমান যায়নি। আপনি তাওবা করেছেন — আল্লাহ তাআলা বলেন:
"নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন..." (সূরা বাকারা: ২২২)
ওয়াসওয়াসা সম্পর্কে জরুরি নির্দেশনা:
আপনি বারবার কালিমা পড়েননি — এতে কুফর হয়নি। বরং ওয়াসওয়াসা হলো শয়তানের কৌশল। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"শয়তান তোমাদের কাছে এসে বলবে: এটা কে সৃষ্টি করেছে, ওটা কে সৃষ্টি করেছে? এমনকি বলবে: তোমার রবকে কে সৃষ্টি করেছে? যখন কেউ এমন প্রশ্নে পৌঁছে যায়, সে যেন বলে: 'আমি আল্লাহর উপর ঈমান আনলাম' এবং বিষয়টি শেষ করে দেয়।" (সহিহ বুখারি: ৩২৭৬, সহিহ মুসলিম: ১৩৪)
অর্থাৎ ওয়াসওয়াসা এলে আল্লাহর যিকির ও ঈমানের ঘোষণা দিয়ে তা দমন করুন, কিন্তু বারবার সন্দেহে পড়ে কালিমা পড়া আবশ্যক মনে করবেন না — এটাই ওয়াসওয়াসার চক্র।
উত্তর নং ৩: ইস্তেখারা না করলে কি ঈমান যায়?
সংক্ষিপ্ত উত্তর: না, ইস্তেখারা না করলে ঈমান যায় না। ইস্তেখারা একটি মুস্তাহাব আমল, ফরজ বা ওয়াজিব নয়।
ফিকহি বিশ্লেষণ:
ইস্তেখারার হুকুম: ইমাম নববি (রহ.) রিয়াদুস সালিহিন-এ এবং ইবনে আবিদিন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ বলেছেন — ইস্তেখারা মুস্তাহাব। কোনো ফরজ বা ওয়াজিব কাজ ছেড়ে দিলে যেমন গুনাহ হয়, ইস্তেখারা ছাড়লে তেমন নয়।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিস:
"তোমাদের কেউ যখন কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজের ইচ্ছা করে, সে যেন দুই রাকাত নামাজ পড়ে এবং ইস্তেখারার দুআ পড়ে..." (সহিহ বুখারি: ১১৬৬)
এখানে "যেন পড়ে" — এটি নির্দেশনা, বাধ্যবাধকতা নয়।
আপনার মূল উদ্বেগ: "আল্লাহর উপর ভরসা করছি না"
এটি একটি ভুল ধারণা। তাওয়াক্কুল (ভরসা) মানে এই নয় যে সব সিদ্ধান্ত ইস্তেখারার মাধ্যমে নিতে হবে। তাওয়াক্কুল মানে — সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর আল্লাহর উপর ভরসা রাখা।
আল্লাহ বলেন:
"আর যখন তুমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলো, তখন আল্লাহর উপর ভরসা করো।" (সূরা আলে ইমরান: ১৫৯)
অর্থাৎ সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর তাওয়াক্কুল। ইস্তেখারা হলো সিদ্ধান্ত নেওয়ার একটি মাধ্যম — একমাত্র মাধ্যম নয়।
আপনার পরিস্থিতিতে করণীয়:
১. যদি প্রস্তাব একদমই পছন্দ না হয় — ইসলামে জোরপূর্বক বিয়ে নেই। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"কুমারী মেয়ের সম্মতি ছাড়া তার বিয়ে হয় না।" (সহিহ বুখারি: ৫১৩৬)
২. ইস্তেখারা করা আপনার জন্য মুস্তাহাব — কিন্তু ভয় করবেন না যে "পজিটিভ এলে কষ্ট সহ্য করতে হবে"। ইস্তেখারার অর্থ এই নয় যে আপনি বাধ্য হয়ে যাবেন। ইস্তেখারা হলো পরামর্শ চাওয়া — আল্লাহ যদি কল্যাণ দেখেন, তিনি পথ খুলে দেন; না দেখলে বন্ধ করে দেন।
৩. ইমাম শাফি (রহ.)-এর বাণী: "ইস্তেখারা করার পর যে দিকটি আপনার অন্তরে স্বাভাবিকভাবে খুলে যায়, সেদিকে অগ্রসর হোন — কারণ ইস্তেখারার ফল প্রায়ই অন্তরের প্রশান্তির মাধ্যমে আসে।"
৪. যদি পাত্র পছন্দ না হয় — আপনি না বলার অধিকার রাখেন। এটি ঈমানের সাথে সম্পর্কিত নয়; এটি আপনার ব্যক্তিগত অধিকার।
গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা:
আপনি লিখেছেন: "যদি ওই কষ্ট সহ্য করতে না পারি? যদি ওই পাত্রকে পরে ভালো না লাগে?" — এই ভয় স্বাভাবিক, কিন্তু এ থেকে ইস্তেখারা এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়। বরং:
- ইস্তেখারা করুন — আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করুন।
- ইস্তিখারা করুন (পরামর্শ) — অভিভাবক, বিশ্বস্ত আলেম, বা অভিজ্ঞ ব্যক্তির সাথে।
- সিদ্ধান্ত নিন — অন্তর প্রশান্ত হলে এগিয়ে যান; না হলে বিনয়ের সাথে না বলুন।
সারসংক্ষেপ
| প্রশ্ন | উত্তর | |--------|--------| | ১. নবীজিকে "পাগল/নারীলোভী" বলা (অবিশ্বাসসহ, যুক্তির জন্য) | ঈমান যায়নি — তবে তাওবা করুন, ভবিষ্যতে সাবধান হোন | | ২. বোনের তিলাওয়াত নিয়ে মন্তব্য | ঈমান যায়নি — এটি গুনাহ, তাওবা করুন | | ৩. ইস্তেখারা না করা | ঈমান যায় না — ইস্তেখারা মুস্তাহাব, ফরজ নয় |
আল্লাহ তাআলা আপনার ঈমানকে অটুট রাখুন এবং ওয়াসওয়াসা থেকে হেফাজত করুন। আমিন।