নিকট আত্মীয় হারাম উপার্জন করলে করণীয়
Halal and Haram · Hanafi
Question
আমার মামা সরকারি জব করেন।উনার জবে এক্সট্রা ইনকামের সোর্স আছে,যা হারাম।উনার হারাম টাকা অনেক ইনকাম হয় বিধায় উনি বেতন ঠিকমত তুলেন না।আমি হারাম ইনকামের বিধান জানার পর থেকে উনার বাসায় যাই না।কারণ,বাসায় গেলে হারাম টাকার খাবার খাওয়া লাগতে পারে,উনি ড্রেস কিনে দিবেন,হাদিয়া দিবেন ।হারাম ইনকামের বিষয়টা নিয়ে মা ও অন্যান্য মামাদের সাথে আলোচনা করেছি।কিন্তু তারা জেনে -বুঝে কেউই মামাকে নিষেধ করছেন না।আমি তো ছোট, মামাকে সরাসরি কিছু বলতেও পারি না।তাছাড়া,মামা আমাদের বাড়িতে আসলে বাজার ( মাছ,ফলমূল), হাদিয়া এসব নিয়ে আসেন।আপুর বিয়েতেও অনেক টাকা, হাদিয়া দিয়েছেন। প্রায় ৫ বছর যাবত উনার বাসায় যাওয়া হয় না–এতে মামা অনেক মন খারাপ করেন।বারবার কল দিয়ে যেতে বলেন।
আমি তো মামাকে বলতেও পারব না যে,আমি গেলে বেতনের টাকা খরচ করে আমাকে খাওয়াবেন,হাদিয়া দিবেন
এমতাবস্থায় আমার করণীয় কি? আমি কি মামার বাসায় যেতে পারব বা উনি যদি হাদিয়া দেন তা নেয়া জায়েজ হবে কি?
Answer
উত্তর (ফতোয়া নং: 5955)
হামদ ও সালাতের পর:
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। হারাম উপার্জনের বিধান, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা এবং হাদিয়া গ্রহণের বিষয়টি কুরআন-হাদিস ও হানাফি ফিকহের আলোকে বিশ্লেষণ করা হলো।
১. হারাম উপার্জনের বিধান
আল্লাহ তা'আলা কুরআনে বলেন:
وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُم بَيْنَكُم بِالْبَاطِلِ "তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না।" (সূরা বাকারা: ১৮৮)
يَا أَيُّهَا النَّاسُ كُلُوا مِمَّا فِي الْأَرْضِ حَلَالًا طَيِّبًا "হে মানুষ! পৃথিবীতে যা হালাল ও পবিত্র, তা থেকে খাও।" (সূরা বাকারা: ১৬৮)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
كُلُّ لَحْمٍ نَبَتَ مِنْ سُحْتٍ فَالنَّارُ أَوْلَى بِهِ "যে গোশত হারাম (সুহত) থেকে উৎপন্ন হয়, তার জন্য জাহান্নামই অধিক উপযুক্ত।" (তিরমিজি: ১৩৩৫, মুসনাদে আহমাদ)
إِنَّ الْحَلَالَ بَيِّنٌ وَإِنَّ الْحَرَامَ بَيِّنٌ وَبَيْنَهُمَا مُشْتَبِهَاتٌ... "নিশ্চয়ই হালাল স্পষ্ট এবং হারামও স্পষ্ট..." (বুখারি: ৫২, মুসলিম: ১৫৯৫)
হানাফি ফিকহের মূলনীতি: ঘুষ, সুদ, প্রতারণা, চুরি, সরকারি সম্পদের আত্মসাৎ—এগুলো সবই হারাম উপার্জন। (রাদ্দুল মুহতার: ৫/২৪৭, ফাতাওয়া আলমগিরি: ৩/৩৩২)
২. হারাম মালের সাথে লেনদেনের বিধান
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:
"হারাম মালের সাথে লেনদেন করা, তা দান করা বা হাদিয়া হিসেবে গ্রহণ করা—সবই নাজায়েজ। তবে যদি কেউ হারাম মালের মালিক হয় এবং তা আমাদের কাছে হস্তান্তর করে, তবে তা গ্রহণ করা জায়েজ নয়।" (রাদ্দুল মুহতার: ৫/২৪৭)
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য:
- যদি সম্পূর্ণ উপার্জনই হারাম হয় (যেমন: শুধু ঘুষ/সুদ/চুরি) — তবে তার দেওয়া হাদিয়া, খাবার, উপহার সবই নাজায়েজ।
- যদি উপার্জনে হালাল ও হারাম মিশ্রিত হয় (যেমন: বেতন হালাল, কিন্তু এক্সট্রা ইনকাম হারাম) — তবে হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, মিশ্রিত মালে হালাল অংশের প্রাধান্য থাকলে তা গ্রহণ করা জায়েজ, তবে সতর্কতা অবলম্বন করা উত্তম।
আপনার মামার ক্ষেত্রে: বেতন হালাল, কিন্তু এক্সট্রা ইনকাম হারাম। তিনি বেতন ঠিকমত তোলেন না, বরং হারাম টাকা দিয়েই সংসার চালান। এমতাবস্থায় তার দেওয়া হাদিয়া ও খাবার সন্দেহপূর্ণ (শুভহা)।
৩. আপনার করণীয়
(ক) মামার বাসায় যাওয়া প্রসঙ্গে:
আপনি যদি নিশ্চিত হন যে, মামার বাসায় গেলে হারাম টাকার খাবার খাওয়াবেন বা হারাম টাকায় কেনা জিনিস দেবেন, তবে সরাসরি যাওয়া থেকে বিরত থাকাই উত্তম। কারণ রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
دَعْ مَا يَرِيبُكَ إِلَى مَا لَا يَرِيبُكَ "যা তোমাকে সন্দেহে ফেলে, তা ছেড়ে দাও এবং যা সন্দেহমুক্ত, তা গ্রহণ কর।" (তিরমিজি: ২৫১৮)
তবে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা যাবে না। ইসলামে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা ফরজ। আল্লাহ বলেন:
وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ "আল্লাহকে ভয় কর, যার নামে তোমরা একে অপরের কাছে চাও, এবং আত্মীয়তার সম্পর্কের ব্যাপারে সতর্ক থাক।" (সূরা নিসা: ১)
সমাধান: আপনি মামার বাসায় যেতে পারেন, কিন্তু খাবার খাওয়া বা হাদিয়া গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকতে পারেন। যেমন: বলতে পারেন—"মামা, আমি এইমাত্র খেয়ে এসেছি" বা "আমার পেট খারাপ, কিছু খেতে পারব না।" হাদিয়ার ক্ষেত্রে বলতে পারেন—"মামা, আমার কাছে এটা রাখার জায়গা নেই" বা "আমার এটা দরকার নেই।"
(খ) হাদিয়া গ্রহণ প্রসঙ্গে:
যদি মামা হাদিয়া দেন এবং আপনি জানেন যে তা হারাম টাকায় কেনা, তবে সেটি গ্রহণ না করাই উত্তম। কিন্তু যদি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করলে সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তবে নরমভাবে বলতে পারেন।
বিকল্প: যদি হাদিয়া গ্রহণ করেন, তবে তা গরিব-মিসকিনকে দান করে দিতে পারেন। তবে নিজে ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন।
(গ) মামাকে নসিহত প্রসঙ্গে:
আপনি ছোট, সরাসরি বলতে পারবেন না—এটা ঠিক। তবে পরোক্ষভাবে বলতে পারেন। যেমন: কোনো আলেমের বয়ান শুনিয়ে দেওয়া, বা কোনো ফতোয়ার কিতাব/লেখা পাঠিয়ে দেওয়া। অথবা আপনার মা বা বড় কাউকে দিয়ে বলানোর চেষ্টা করুন।
আল্লাহ বলেন:
وَذَكِّرْ فَإِنَّ الذِّكْرَىٰ تَنفَعُ الْمُؤْمِنِينَ "উপদেশ দাও, নিশ্চয়ই উপদেশ মুমিনদের উপকার করে।" (সূরা যারিয়াত: ৫৫)
(ঘ) মায়ের সাথে আলোচনা:
আপনার মা ও অন্য মামারা জানেন কিন্তু নিষেধ করছেন না—এটি দুঃখজনক। আপনি আপনার মাকে শান্তভাবে বুঝানোর চেষ্টা করুন যে, হারাম উপার্জন কিয়ামতের দিন কঠিন হিসাবের কারণ হবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَا تَزُولُ قَدَمَا عَبْدٍ يَوْمَ الْقِيَامَةِ حَتَّى يُسْأَلَ عَنْ أَرْبَعٍ... وَعَنْ مَالِهِ مِنْ أَيْنَ اكْتَسَبَهُ وَفِيمَ أَنْفَقَهُ "কিয়ামতের দিন বান্দার পা এক ইঞ্চিও সরবে না, যতক্ষণ না তাকে চারটি বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হয়... এবং তার সম্পদ কোথা থেকে উপার্জন করেছে এবং কোথায় ব্যয় করেছে।" (তিরমিজি: ২৪১৭)
৪. সারসংক্ষেপ ও চূড়ান্ত পরামর্শ
| বিষয় | বিধান | |------|--------| | মামার বাসায় যাওয়া | আত্মীয়তা রক্ষার জন্য যাওয়া যাবে, তবে খাবার/হাদিয়া গ্রহণে সতর্কতা | | হারাম টাকার খাবার খাওয়া | নাজায়েজ, সম্ভব হলে বিরত থাকুন | | হারাম টাকার হাদিয়া গ্রহণ | উত্তম হলো না নেওয়া; নিলে গরিবকে দান করুন | | মামাকে নসিহত | পরোক্ষভাবে, নরমভাবে, ভালোবাসার সাথে | | সম্পর্ক ছিন্ন করা | জায়েজ নয়, আত্মীয়তা রক্ষা করুন |
মূল কথা: আপনি মামার বাসায় যেতে পারেন, কিন্তু হারাম টাকার খাবার খাওয়া ও হাদিয়া গ্রহণ থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করুন। সরাসরি না পারলে নরমভাবে বলুন। সম্পর্ক ছিন্ন করবেন না, কারণ আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা ইসলামের নির্দেশ। আর মামাকে পরোক্ষভাবে নসিহত করার চেষ্টা করুন, হয়তো আল্লাহ তাকে হেদায়েত দান করবেন।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে হালাল উপার্জন ও হালাল ভক্ষণের তাওফিক দান করুন। আমিন।
والله أعلم بالصواب