স্ত্রী দ্বীন পালনে অবহেলা করলে, নামাজ কাজা করলে এবং পারিবারিক সম্পর্ক নিয়ে দ্বিধায় থাকলে ইসলামী শরীয়তের দিকনির্দেশনা।
Family Life · Hanafi
Question
কখনো কখনো তিনি অসুস্থ থাকেন এবং সালাত মিস করেন। তিনি ঘুমিয়ে থাকলে আমি যখন বলি যে ওয়াক্ত শেষ হতে আর ১৫ মিনিট বাকি আছে, তখন কখনো তিনি জেগে উঠে সালাত আদায় করেন, আবার কখনো করেন না। অনেক সময় বিরক্ত হয়ে বলেন, “আমি জানি”, “পড়ব না” ইত্যাদি। তিনি কখনো কখনো রূঢ় আচরণ করেন এবং আমার কথাও শুনতে চান না। বিয়ের পর নামাজ পরত নিজে নিজেই। ইদানিং প্রায়ই নামাজ কাজা করে/পরে না ১ বা ২ ওয়য়াক্ত কোনো সময় তার চেয়ে বেশি। তাকে নিয়ে আমি প্রচন্ড মানসিক চাপে আছি, আর আমি চাই না আমার বাচ্চারা এমন দীনদারিতা দেখক আমার পরিবারে। আলহামদু্লিল্লাহ, আমার আগে নামাজ কাযা হইত না, ফজর। এখন আমার ও হয়। গাফলতি আমার মদ্ধে ও আসছে।
আমাদের একটি কন্যাসন্তান আছে, যার বয়স ১ বছর ৪ মাস। এছাড়া আমার স্ত্রী বর্তমানে ৩ মাসের গর্ভবতী। তিনি বর্তমানে মেডিকেলে অধ্যয়নরত, এবং আগামী ডিসেম্বর মাসে তার ফাইনাল পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে।
একবার কোনো তর্কের পর তিনি বলেছিলেন, “আপনি আমাকে কী দিয়ে রেখেছেন?” এবং “আমি নিজে এর চেয়ে ভালো থাকতে পারি।”
আমি আমার সামর্থ্যের সর্বোচ্চ চেষ্টা করি সংসারের জন্য ব্যয় করতে। তবুও তিনি একদিক থেকে ঠিকই বলেছেন। তার কিছু চাহিদা পূরণ হয়তো অপূর্ণ থেকে যায়।
তবে আমি বুঝতে পারছি না, এই বিবাহিত সম্পর্ক নিয়ে আমার কী করা উচিত। সম্পর্কটি চালিয়ে যাওয়া উচিত, নাকি আলাদা হয়ে যাওয়া উচিত? প্রায়ই আমরা দুজনই বলি যে আমরা এই সম্পর্কটি ভেঙে দিতে চাই। একমাত্র যে বিষয়টি আমাদের তা করা থেকে বিরত রাখে, তা হলো আমাদের মেয়ে।
আমাদের মেয়ের বয়স মাত্র ১ বছর ৪ মাস। বিচ্ছেদ হলে সে খুব কষ্টের মধ্যে পড়বে। সে হয়তো তার বাবা বা মায়ের একজনকে ছাড়া বড় হতে বাধ্য হবে।
Answer
প্রশ্নের বিশ্লেষণ ও সমাধান
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল।
প্রথমেই পরামর্শ থাকবে, স্ত্রীকে নিয়ে মাস্তুরাত জামাতে যেতে। ১০ দিন পর্যায়ক্রমে ৪০ দিন স্ত্রীকে নিয়ে মাস্তুরাত জামাতে গেলে আশা করা যায় তার ঈমান আমলে উন্নতি ঘটবে,ইনশাআল্লাহ।
ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে এ বিষয়ে বিস্তারিত দিকনির্দেশনা নিম্নে প্রদান করা হচ্ছে।
১. স্ত্রীর দ্বীনি অবহেলা ও সালাত ত্যাগের বিধান
ক. সালাত পরিত্যাগের হুকুম
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«بَيْنَ الرَّجُلِ وَبَيْنَ الْكُفْرِ وَالْإِيمَانِ تَرْكُ الصَّلَاةِ»
"বান্দা ও কুফর-ঈমানের মধ্যে পার্থক্য হলো সালাত পরিত্যাগ করা।"
— সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৮২; সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২৬১৮
ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, ইচ্ছাকৃতভাবে সালাত পরিত্যাগকারী ফাসিক ও গুনাহগার, তবে কাফির নয়। কিন্তু তাকে তাওবা করানো এবং সালাত আদায়ে বাধ্য করা স্বামীর দায়িত্ব।
রেফারেন্স: রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ৩৫২; আল-হিদায়া, কিতাবুস সালাত
খ. স্বামীর দায়িত্ব
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا
"হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো।"
— সূরা আত-তাহরীম, আয়াত ৬
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন:
"স্বামীর উপর ওয়াজিব হলো স্ত্রীকে সালাত, সিয়াম ও অন্যান্য ফরজ ইবাদতের আদেশ দেওয়া এবং নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত রাখা।"
— রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃ. ৫৭
২. স্ত্রীর সাথে আচরণের নীতি
ক. ধৈর্য ও হিকমতের সাথে দাওয়াত
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَجَادِلْهُم بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ
"তাদের সাথে উত্তম পন্থায় বিতর্ক করো।"
— সূরা আন-নাহল, আয়াত ১২৫
মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) মা'আরিফুল কুরআনে বলেন:
"স্ত্রীকে দ্বীনের দিকে আহ্বান করার সময় কঠোরতা নয়, বরং ভালোবাসা ও নرمতার সাথে আহ্বান করতে হবে।"
— মা'আরিফুল কুরআন, খণ্ড ৫, পৃ. ৩৪৫
খ. রাসূল ﷺ-এর আদর্শ
রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর স্ত্রীদের সাথে সর্বদা কোমল আচরণ করতেন। আয়েশা (রা.) বলেন:
«مَا ضَرَبَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ شَيْئًا قَطُّ بِيَدِهِ، وَلَا امْرَأَةً، وَلَا خَادِمًا»
"রাসূলুল্লাহ ﷺ কখনো নিজ হাতে কোনো কিছুকে, কোনো নারীকে বা কোনো খাদেমকে প্রহার করেননি।"
— সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৩২৮
৩. তালাকের বিধান ও সতর্কতা
ক. তালাক সর্বশেষ উপায়
ইসলামে তালাক হালাল হলেও আল্লাহর কাছে সর্বাধিক অপছন্দনীয়। রাসূল ﷺ বলেছেন:
«أَبْغَضُ الْحَلَالِ إِلَى اللَّهِ الطَّلَاقُ»
"আল্লাহর কাছে হালাল বিষয়গুলোর মধ্যে সর্বাধিক অপছন্দনীয় হলো তালাক।"
— সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ২১৭৮
খ. তালাকের আগে করণীয়
ইমাম আত-তাহাবী (রহ.) ও ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.)-এর মতানুসারে, তালাক দেওয়ার আগে অবশ্যই নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে:
- ধৈর্য ও দু'আ: আল্লাহর কাছে স্ত্রীর হেদায়েতের জন্য দু'আ করা।
- হিকমতের সাথে বোঝানো: দ্বীনি জ্ঞানসম্পন্ন কোনো মহিলা বা আলেমার মাধ্যমে বোঝানো।
- পারিবারিক মধ্যস্থতা: উভয় পরিবারের সম্মানিত লোকদের মাধ্যমে সমঝোতার চেষ্টা।
- সালাত ও ইবাদতের গুরুত্ব বোঝানো: জাহান্নামের ভয় ও জান্নাতের আশা দিয়ে বোঝানো।
- সন্তানের কথা স্মরণ করানো: সন্তানের ভবিষ্যৎ ও তার দ্বীনি শিক্ষার কথা স্মরণ করানো।
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَإِنْ خِفْتُمْ شِقَاقَ بَيْنِهِمَا فَابْعَثُوا حَكَمًا مِّنْ أَهْلِهِ وَحَكَمًا مِّنْ أَهْلِهَا
"যদি তোমরা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরোধের আশঙ্কা করো, তবে এক বিচারক স্বামীর পরিবার থেকে এবং এক বিচারক স্ত্রীর পরিবার থেকে পাঠাও।"
— সূরা আন-নিসা, আয়াত ৩৫
৪. আপনার করণীয় (ধাপে ধাপে)
ধাপ ১: নিজের ইবাদত ঠিক করা
আপনি উল্লেখ করেছেন যে আপনারও ফজরের নামাজ কাযা হতে শুরু করেছে। সর্বপ্রথম নিজের ইবাদত ঠিক করুন। কারণ আপনি পরিবারের ইমাম ও দায়িত্বশীল।
«كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ»
"তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকেই নিজ দায়িত্বের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে।"
— সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৭১৩৮
ধাপ ২: স্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ ও আলোচনা
রাগ না করে, ভালোবাসার সাথে বসে কথা বলুন। তাকে বলুন:
- আপনি তাকে ভালোবাসেন
- সন্তানের ভবিষ্যৎ আপনার দুশ্চিন্তার বিষয়
- দ্বীনি বিষয়ে আপনি তাকে সাহায্য করতে চান
ধাপ ৩: দ্বীনি পরিবেশ তৈরি করা
- বাড়িতে ইসলামী পরিবেশ তৈরি করুন
- নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াতের ব্যবস্থা করুন
- দ্বীনি বই পড়ার অভ্যাস গড়ুন
- সম্ভব হলে কোনো দ্বীনি মহিলা শিক্ষিকার সাথে তার যোগাযোগ করান
ধাপ ৪: পারিবারিক মধ্যস্থতা
উভয় পরিবারের সম্মানিত ও দ্বীনদার লোকদের মাধ্যমে সমঝোতার চেষ্টা করুন। বিশেষ করে তার পরিবারের এমন কেউ যিনি দ্বীনদার, তাকে দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করুন।
ধাপ ৫: ধৈর্য ধারণ করা
وَاصْبِرُوا إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ
"তোমরা ধৈর্য ধারণ করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।"
— সূরা আল-আনফাল, আয়াত ৪৬
৫. তালাক দেওয়া কি উচিত?
বর্তমান অবস্থায় তালাক দেওয়া উচিত নয়। কারণ:
-
সন্তানের ক্ষতি: ১ বছর ৪ মাসের সন্তান বাবা-মায়ের উভয়ের স্নেহ থেকে বঞ্চিত হবে। ইসলামে সন্তানের হক আদায় করা পিতামাতার দায়িত্ব।
-
গর্ভবতী স্ত্রী: স্ত্রী ৩ মাসের গর্ভবতী। এই অবস্থায় তালাক দেওয়া ইসলামী শরীয়তে নিষিদ্ধ (তালাকুল বিদআত)। আল্লাহ বলেন:
وَأُولَاتُ الْأَحْمَالِ أَجَلُهُنَّ أَن يَضَعْنَ حَمْلَهُنَّ
"গর্ভবতী নারীদের ইদ্দত হলো সন্তান প্রসব করা পর্যন্ত।"
— সূরা আত-তালাক, আয়াত ৪
-
দ্বীনি দায়িত্ব: আপনার দায়িত্ব শুধু তালাক দেওয়া নয়, বরং তাকে দ্বীনের পথে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা।
-
আল্লাহর হুকুম: আল্লাহ বলেন:
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ
"তাদের সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।"
— সূরা আন-নিসা, আয়াত ১৯
৬. বিশেষ পরামর্শ
ক. মেডিকেল পড়াশোনার বিষয়
স্ত্রী মেডিকেলে পড়াশোনা করছেন এবং ডিসেম্বরে ফাইনাল পরীক্ষা। এই সময়ে তার উপর মানসিক চাপ বেশি। পরীক্ষা শেষ হওয়া পর্যন্ত ধৈর্য ধারণ করুন। পরীক্ষার পর তার সাথে শান্তভাবে আলোচনা করুন।
খ. তার অভিযোগের বিষয়ে
তিনি বলেছেন, "আপনি আমাকে কী দিয়ে রেখেছেন?" — এটি সম্ভবত তার মানসিক চাপ ও অসন্তোষের প্রকাশ। আপনার সামর্থ্য অনুযায়ী তার চাহিদা পূরণের চেষ্টা করুন। তবে ইসলামী শরীয়তে স্বামীর সামর্থ্য অনুযায়ী খরচ করাই যথেষ্ট।
لِيُنفِقْ ذُو سَعَةٍ مِّن سَعَتِهِ
"সামর্থ্যবান ব্যক্তি তার সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় করবে।"
— সূরা আত-তালাক, আয়াত ৭
গ. দু'আ
নিম্নলিখিত দু'আ বেশি বেশি পড়ুন:
رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا
"হে আমাদের রব! আমাদের স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততিদের থেকে আমাদের চোখের শীতলতা দান করুন এবং আমাদের মুত্তাকীদের ইমাম বানান।"
— সূরা আল-ফুরকান, আয়াত ৭৪
৭. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
বর্তমানে সম্পর্ক চালিয়ে যাওয়াই ইসলামী শরীয়তের নির্দেশ। তালাক দেওয়া সর্বশেষ উপায়, যখন সমস্ত সমঝোতার চেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং দ্বীনি স্বার্থ রক্ষার জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়ে।
করণীয়:
- নিজের ইবাদত ঠিক করুন
- ধৈর্য ও ভালোবাসার সাথে স্ত্রীকে বোঝান
- পারিবারিক মধ্যস্থতা করুন
- তার পরীক্ষা শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন
- নিয়মিত দু'আ করুন
- প্রয়োজনে দ্বীনি আলেমের পরামর্শ নিন
যদি সমস্ত চেষ্টার পরও অবস্থার পরিবর্তন না হয় এবং দ্বীনি স্বার্থ seriously ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন ইসলামী শরীয়তের বিধান অনুযায়ী তালাকের বিষয়ে চিন্তা করা যেতে পারে। তবে তা অবশ্যই দ্বীনি আলেমের পরামর্শক্রমে।