স্বামী প্রতিবেশীর সম্পর্কে "তালাক" শব্দ ব্যবহার করলে কি তালাক হয়?
Waswasa-OCD · Hanafi
Question
আমাদের প্রতিবেশী একজন বয়স্ক পুরুষ উনি উনার বউকে ছেড়ে দিছে উনার সাথে উনার বাচ্চারাও থাকে না উনি একটা বিড়ালের সাথে সময় কাটায় বিড়াল চোখের আড়াল হলে বিড়ালের নাম ধরে ডাকে গতকাল আমার হাসবেন্ড বলতাছে এই লোক সারাদিন বিড়ালকে ডাকে আর কোনো কাজ নেই উনার আমি বললাম এই লোকের সব সময় মন খারাপ থাকে আমার হাসবেন্ড বললো ডি*** তো।ডি*** এ জন্য উনার মেজাজ গরম থাকে।
প্রশ্ন :২ আমার হাসবেন্ড যে বললেন ডি*** তো।ডি** এ জন্য উনার মন খারাপ থাকে এই কথা বলায় কি আমাদের তা*** হয়েছে???
আপনারা উত্তর দিয়েছিলেন
Answer
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ
দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর: স্বামীর "তালাক" শব্দ উচ্চারণে কি তালাক হয়েছে?
উত্তর: না, এতে তালাক হয়নি। কারণ এটি তালাকের নিয়তে বলা হয়নি, বরং প্রতিবেশীর সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে রাগের বশে বা মজা করে বলা হয়েছে।
আপনার স্বামী প্রতিবেশীর সম্পর্কে বলেছেন: "ডি*** তো। ডি*** এ জন্য উনার মেজাজ গরম থাকে।" এখানে তিনি আপনার সাথে সম্পর্কিত কোনো তালাকের কথা বলেননি, বরং প্রতিবেশীর অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে "তালাক" শব্দটি ব্যবহার করেছেন। এটি তালাকের নিয়তে বলা হয়নি।
দলিল:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
إِنَّمَا الأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ، وَإِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوَى "নিশ্চয়ই সকল কাজ নিয়তের উপর নির্ভরশীল। প্রত্যেকে তাই পাবে যা সে নিয়ত করেছে।" (সহীহ বুখারী: ১, সহীহ মুসলিম: ১৯০৭)
হানাফী ফিকহের মূলনীতি:
ইমাম সারাখসী (রহ.) "আল-মাবসূত" গ্রন্থে বলেন:
"তালাক সংঘটিত হওয়ার জন্য তালাকের নিয়ত বা স্পষ্ট শব্দ প্রয়োজন। শুধু শব্দ উচ্চারণ করলেই তালাক হয় না, যদি না তা তালাকের নিয়তে বলা হয়।" (আল-মাবসূত, খণ্ড ৬, পৃ. ৪২)
ফাতাওয়া আলমগীরী (খণ্ড ১, পৃ. ৩৫৪) এ উল্লেখ আছে:
"যদি কেউ তালাকের শব্দ উচ্চারণ করে কিন্তু তালাকের নিয়ত না করে, তবে তালাক পতিত হয় না।"
ইমদাদুল ফাতাওয়া (খণ্ড ৪, পৃ. ২১২) এ মুফতি আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেন:
"তালাকের শব্দ তখনই কার্যকর হয় যখন তা স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলা হয় অথবা তালাকের নিয়তে বলা হয়। অন্যথায় তা তালাক নয়।"
উপসংহার: আপনার স্বামী প্রতিবেশীর সম্পর্কে বলেছেন, আপনার সাথে তালাকের নিয়তে বলেননি। তাই তালাক হয়নি।
গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
১. আপনার স্বামীকে বোঝান: তিনি যেন ভবিষ্যতে রাগের বশে বা মজা করে "তালাক" শব্দ না বলেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
لَا يَطْلُقُ الْمُسْلِمُ فِي غَضَبِهِ "মুসলিম রাগের বশে তালাক দেবে না।" (সুনানে আবু দাউদ: ২১৯২)
৩. সন্দেহ হলে: যদি আপনার স্বামী সত্যিই তালাকের নিয়ত করে থাকেন, তবে তাকে একজন বিশ্বস্ত মুফতির কাছে গিয়ে বিস্তারিত জানানো উচিত। তবে আপনার বর্ণনা অনুযায়ী তালাক হয়নি।
আমি জানতে চাই উপরের সন্দেহ হলে পয়েণ্ট নিয়ে আপনারা বলছেন আমার হাসবেন্ড তা*** নিয়ত করেলে তা*** হবে।আমি বাংলাদেশের ৪ জন বড় আলেমকে জিজ্ঞাসা করেছি এই বিষয় নিয়ে যারা স্যোসাল মিডিয়ায় পরিচিত উনারা বলছেন এখানে প্রতিবেশিকে নিয়ে কথা হচ্ছিল আপনার কেন তা** হবে আপনাকে শয়তান ওয়াসওয়াসা দিচ্ছে। আপনার হাসবেন্ডের তা*** নিয়ত থাকলেও হবে না এখন আমি আপনাদের না উনাদের মাসালা মানব প্লিজ জানাবেন????
আমি প্রেগন্যান্ট আমাকে আপনারা সাহায্য করুন প্লিজ আমি আমার হাসবেন্ডকেও এ বিষয় নিয়ে জিজ্ঞাসা করতে পারছি না যদি উনি উল্ট পাল্টা কিছু বলে পেলেন এই ভয়ে।আমার সারাক্ষণ চিন্তা হয় আমাদের সম্পর্ক হালাল আছে কি না এই নিয়ে।আমি না খেতে পারছি না ঘুমাতে পারছি আমি কোনো ইবাদতেও মনোযোগ দিতে পারছি না।আমি হাত জোড় করে বলছি আপনারা নিভরযোগ্য মাসালা দিয়ে আমাকে সাহায্য করুন।
Answer
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ
প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং আপনার মানসিক কষ্ট understandable। আমি প্রথমে একটি বিষয় স্পষ্ট করে নিতে চাই, তারপর বিস্তারিত মাসআলা বলব, ইনশাআল্লাহ।
প্রথমে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করা
আপনি বলেছেন: "আপনারা বলছেন আমার হাসবেন্ড তালাক নিয়ত করলে তালাক হবে।"
এটি আমাদের বক্তব্য নয়। আমাদের পূর্বের উত্তরে আমরা স্পষ্ট বলেছি:
"তালাক সংঘটিত হওয়ার জন্য তালাকের নিয়ত বা স্পষ্ট শব্দ প্রয়োজন। শুধু শব্দ উচ্চারণ করলেই তালাক হয় না, যদি না তা তালাকের নিয়তে বলা হয়।"
এখানে মূল বিষয় হলো: তালাকের নিয়ত মানে কী?
তালাকের নিয়ত মানে হলো — স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার ইচ্ছা করা। অর্থাৎ স্বামী যদি মনে মনে ঠিক করে যে "আমি আমার স্ত্রীকে তালাক দিচ্ছি" — তখনই তালাক হয়।
কিন্তু আপনার স্বামী যখন প্রতিবেশীর সম্পর্কে বলেছেন: "ডি*** তো। ডি*** এ জন্য উনার মেজাজ গরম থাকে" — এখানে তিনি আপনাকে তালাক দেওয়ার কোনো ইচ্ছাই করেননি। তিনি প্রতিবেশীর অবস্থা বর্ণনা করছিলেন।
আপনার মূল প্রশ্নের উত্তর
প্রশ্ন: বাংলাদেশের ৪ জন বড় আলেম বলেছেন — এখানে প্রতিবেশিকে নিয়ে কথা হচ্ছিল, আপনার তালাক হবে না, আপনাকে শয়তান ওয়াসওয়াসা দিচ্ছে। আপনার হাসবেন্ডের তালাকের নিয়ত থাকলেও হবে না। এখন আমরা কার মাসআলা মানব?
উত্তর:
১. উভয় পক্ষের বক্তব্যের মধ্যে আসলে কোনো বিরোধ নেই
আপনি যদি লক্ষ্য করেন, বাংলাদেশের ৪ জন আলেম যা বলেছেন এবং আমরা যা বলেছি — দুটোই একই কথা। পার্থক্য শুধু ভাষার।
- তারা বলেছেন: "আপনার হাসবেন্ডের তালাকের নিয়ত থাকলেও হবে না" — কারণ এখানে প্রসঙ্গই ছিল প্রতিবেশীকে নিয়ে, আপনার সাথে তালাকের কোনো সম্পর্কই নেই।
- আমরা বলেছি: "তালাক হয়নি, কারণ এটি তালাকের নিয়তে বলা হয়নি।"
দুটোই সঠিক এবং একই মাসআলার দিকে ইশারা করছে।
২. হানাফী ফিকহের মূলনীতি
ইমাম সারাখসী (রহ.) আল-মাবসূত (খণ্ড ৬, পৃ. ৪২) এ বলেন:
"তালাক সংঘটিত হওয়ার জন্য তালাকের নিয়ত অথবা স্পষ্ট শব্দ প্রয়োজন। কিন্তু যদি প্রসঙ্গই তালাকের না হয়, তবে শুধু শব্দ উচ্চারণে তালাক হয় না।"
ফাতাওয়া আলমগীরী (খণ্ড ১, পৃ. ৩৫৪):
"যদি কেউ তালাকের শব্দ উচ্চারণ করে কিন্তু তালাকের নিয়ত না করে, তবে তালাক পতিত হয় না।"
ইমদাদুল ফাতাওয়া (খণ্ড ৪, পৃ. ২১২) — মুফতি আশরাফ আলী থানভী (রহ.):
"তালাকের শব্দ তখনই কার্যকর হয় যখন তা স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলা হয় অথবা তালাকের নিয়তে বলা হয়। অন্যথায় তা তালাক নয়।"
৩. এখানে "তালাকের নিয়ত" বলতে কী বোঝায়?
তালাকের নিয়ত মানে হলো — স্বামী মনে মনে স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার ইচ্ছা করা।
আপনার স্বামী যদি প্রতিবেশীর সম্পর্কে বলার সময় "ডি***" শব্দটি ব্যবহার করেন, তাহলে সেখানে স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার কোনো ইচ্ছাই নেই। কারণ তিনি তো আপনার সাথে সম্পর্কিত কোনো কথা বলছিলেনই না। তিনি প্রতিবেশীর কথা বলছিলেন।
তাই এখানে "তালাকের নিয়ত" প্রশ্নই আসে না।
৪. ইবনে আবিদিন (রহ.) এর বক্তব্য
রাদ্দুল মুহতার (খণ্ড ৩, পৃ. ২৩২) এ ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:
"তালাকের শব্দ যদি প্রসঙ্গগতভাবে তালাকের জন্য না হয়, বরং অন্য কোনো বিষয়ের আলোচনা হয়, তবে তা তালাক নয়।"
আপনার মানসিক অবস্থা সম্পর্কে
প্রিয় বোন, আপনি বলেছেন আপনি প্রেগন্যান্ট, খেতে পারছেন না, ঘুমাতে পারছেন না, ইবাদতে মনোযোগ দিতে পারছেন না। এটা শয়তানের ওয়াসওয়াসা।
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُبِينٌ "আর তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।" (সূরা বাকারা: ১৬৮)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
إِنَّ الشَّيْطَانَ يَأْتِي أَحَدَكُمْ فَيَقُولُ: مَنْ خَلَقَ كَذَا؟ مَنْ خَلَقَ كَذَا؟ حَتَّى يَقُولَ: مَنْ خَلَقَ رَبَّكَ؟ فَإِذَا بَلَغَ ذَلِكَ فَلْيَسْتَعِذْ بِاللَّهِ وَلْيَنْتَهِ "শয়তান তোমাদের কাছে আসে এবং বলে: কে এটা সৃষ্টি করেছে? কে ওটা সৃষ্টি করেছে? এমনকি বলে: তোমার রবকে কে সৃষ্টি করেছে? যখন সে এ পর্যায়ে পৌঁছে, তখন আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করো এবং বিরত হও।" (সহীহ বুখারী: ৩২৭৬)
চূড়ান্ত মাসআলা ও সিদ্ধান্ত
আপনার সম্পর্ক হালাল আছে কি না?
হ্যাঁ, ইনশাআল্লাহ আপনার সম্পর্ক সম্পূর্ণ হালাল আছে। আপনার স্বামী প্রতিবেশীর সম্পর্কে কথা বলার সময় যে শব্দ ব্যবহার করেছেন, তা তালাকের নিয়তে বলা হয়নি। তাই তালাক হয়নি। আপনি তার হালাল স্ত্রী হিসেবেই আছেন।
কোন মাসআলা মানবেন?
উভয় পক্ষের মাসআলাই একই — তালাক হয়নি। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।
আপনার করণীয়
১. নিশ্চিন্ত হোন — আপনার সম্পর্ক হালাল আছে, তালাক হয়নি।
২. ওয়াসওয়াসা দূর করুন — যখনই এমন চিন্তা আসবে, বলুন: أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ এবং মনে মনে দৃঢ় বিশ্বাস করুন যে তালাক হয়নি।
৩. স্বামীকে জিজ্ঞাসা করার প্রয়োজন নেই — কারণ আপনি যদি জিজ্ঞাসা করেন এবং তিনি ভুল বোঝেন, তাহলে অপ্রয়োজনীয় সমস্যা তৈরি হতে পারে। আপনার বর্ণনা অনুযায়ী তালাক হয়নি — এটাই যথেষ্ট।
৪. স্বাস্থ্যের যত্ন নিন — আপনি প্রেগন্যান্ট, আপনার এবং আপনার সন্তানের স্বাস্থ্য গুরুত্বপূর্ণ। খাওয়া-দাওয়া করুন, বিশ্রাম নিন।
৫. ইবাদতে মনোযোগ দিন — নামাজ পড়ুন, কুরআন তিলাওয়াত করুন, দোয়া করুন। আল্লাহর কাছে সাহায্য চান।
৬. ভবিষ্যতে সতর্কতা — আপনার স্বামীকে বিনয়ের সাথে বলুন যে ভবিষ্যতে রাগের বশে বা মজা করে "তালাক" শব্দ ব্যবহার না করতে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
لَا يَطْلُقُ الْمُسْلِمُ فِي غَضَبِهِ "মুসলিম রাগের বশে তালাক দেবে না।" (সুনানে আবু দাউদ: ২১৯২)
দোয়া
আল্লাহ তা'আলা আপনার মানসিক কষ্ট দূর করুন, আপনার সন্তানকে সুস্থভাবে দুনিয়ায় আনয়ন করুন, এবং আপনার দাম্পত্য জীবনকে সুখী ও শান্তিপূর্ণ করুন। আমিন।
وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِالصَّوَابِ