বাচ্চা মারা গেলে সবর করলে আখিরাতে কি প্রতিদান পাবে? মৃত নাবালেগ সন্তান জান্নাতে কোন অবস্থায় থাকবে? পিতা-মাতা গুনাহগার হলে সন্তানের জন্য জান্নাত পাবে কি?
Family Life · Ahle Hadith / Salafi
Question
কারো বাচ্চা মারা গেলে তারা সবর করলে আখিরাতে কি প্রতিদান পাবে? বাচ্চা কি অবস্থায় থাকবে? বাবা মা যদি গুনাহগার হয় তাও কি বাচ্চার জন্য জান্নাত পাবে?
Answer
ওয়া আলাইকুমুস-সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ
সংক্ষিপ্ত উত্তর
হ্যাঁ, সন্তান মারা গেলে ধৈর্য (সবর) ও ইহতিসাবের সাথে (অর্থাৎ আল্লাহর কাছে প্রতিদান আশা করে) সহ্য করলে পিতা-মাতা আখিরাতে মহা প্রতিদান পাবেন — জান্নাত। আর মৃত নাবালেগ (বালেগ না হওয়া) সন্তান জান্নাতে থাকবে এবং কিয়ামতের দিন তার পিতা-মাতার জন্য সুপারিশকারী হবে। তবে পিতা-মাতা যদি কুফরি বা শিরকের মতো মহাপাপে লিপ্ত থাকে, তাহলে সন্তানের জান্নাতে যাওয়া তাদের নিজেদের জাহান্নাম থেকে রক্ষা করবে না — প্রত্যেককে নিজ নিজ আমলের হিসাব দিতে হবে।
১. সবর করলে আখিরাতে প্রতিদান
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"নিশ্চয়ই ধৈর্যশীলদের তাদের প্রতিদান বেহিসাব (অগণিত) দেওয়া হবে।" — (সূরা আয-যুমার: ১০)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"আল্লাহ তা'আলা বলেন: আমি যখন আমার মুমিন বান্দার প্রিয়জনকে (সন্তানকে) নিয়ে নিই, আর সে ধৈর্য ধারণ করে, তখন তার প্রতিদান হিসেবে আমি জান্নাত ছাড়া অন্য কিছুতে সন্তুষ্ট হব না।" — (সহীহ বুখারী: ৬৪২৪)
আরও ইরশাদ হয়েছে:
"যে ব্যক্তি তার সন্তানকে হারিয়ে ধৈর্য ধারণ করবে এবং ইহতিসাব করবে (আল্লাহর কাছে প্রতিদান আশা করবে), আল্লাহ তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব করে দেবেন।" — (মুসনাদ আহমাদ, সহীহ)
শর্ত দুটি:
- সবর — অভিযোগ না করা, আল্লাহর উপর অসন্তুষ্ট না হওয়া।
- ইহতিসাব — শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ধৈর্য ধারণ করা, তাঁর কাছে প্রতিদান আশা করা।
শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন: "মুসিবতের সময় সবর করা ওয়াজিব, আর ইহতিসাব করা মুস্তাহাব — যা প্রতিদানের কারণ।"
২. মৃত বাচ্চা আখিরাতে কোন অবস্থায় থাকবে?
ক) নাবালেগ সন্তান জান্নাতে থাকবে
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"প্রত্যেক নবজাতক ইসলামের ফিতরাতের উপর জন্মগ্রহণ করে..." — (সহীহ বুখারী: ১৩৮৫)
শাইখ ইবন উসাইমীন (রহ.) বলেন: "মুসলিমদের নাবালেগ সন্তানরা জান্নাতে থাকবে, তারা জান্নাতে ইবরাহীম (আ.)-এর তত্ত্বাবধানে থাকবে।"
খ) কিয়ামতের দিন পিতা-মাতার জন্য সুপারিশকারী হবে
হাদীসে এসেছে, কিয়ামতের দিন শিশুরা তাদের পিতা-মাতার জন্য সুপারিশ করবে এবং তাদের জান্নাতে প্রবেশ করাবে। (বর্ণনা: ইবন মাজাহ, সহীহ সনদ)
গ) জান্নাতে তাদের অবস্থা
- তারা জান্নাতে খেলাধুলা ও আনন্দে থাকবে।
- তারা চিরকাল শিশু অবস্থায় থাকবে না; বরং জান্নাতের উপযুক্ত বয়সে (৩৩ বছর) পৌঁছাবে — যেমন জান্নাতিরা সবাই একই বয়সের হবে।
- ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেন: "জান্নাতের শিশুরা জান্নাতে খেলাধুলা করবে, আর তাদের পিতা-মাতা তাদের সাথে মিলিত হবে।"
৩. পিতা-মাতা গুনাহগার হলে কি বাচ্চার জন্য জান্নাত পাবে?
এখানে দুটি বিষয় আলাদা করতে হবে:
ক) সাধারণ গুনাহ (সগীরা/কবীরা, তবে তাওবা সহ)
যদি পিতা-মাতা মুসলিম হন এবং সাধারণ গুনাহে লিপ্ত থাকেন, তবে:
- সন্তানের জান্নাতে যাওয়া আলাদা বিষয় — সে তার ফিতরাতের উপর মারা গেছে।
- পিতা-মাতা যদি তাওবা না করেন, তবে তাদের নিজেদের হিসাব দিতে হবে; কিন্তু সন্তানের সুপারিশ তাদের উপকার করতে পারে।
- আল্লাহ চাইলে তাদের ক্ষমা করতে পারেন, অথবা শাস্তির পর জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।
খ) কুফরি/শিরক (তাওবা ছাড়া)
আল্লাহ বলেন:
"নিশ্চয়ই আল্লাহ শিরক ক্ষমা করেন না, তবে তা ছাড়া অন্য সব গুনাহ যাকে চান ক্ষমা করেন।" — (সূরা আন-নিসা: ৪৮)
"নিশ্চয়ই যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শিরক করল, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন এবং তার ঠিকানা জাহান্নাম।" — (সূরা আল-মায়িদা: ৭২)
শাইখ ইবন বায (রহ.) বলেন: "সন্তানের জান্নাতে যাওয়া পিতা-মাতার কুফরি দূর করবে না; প্রত্যেককে নিজ আমলের হিসাব দিতে হবে।"
তবে শাইখ আল-আলবানী (রহ.) ও ইবন তাইমিয়্যাহ (রহ.)-এর মত হলো: মুসলিম পিতা-মাতার নাবালেগ সন্তান জান্নাতে যাবে, আর কিয়ামতের দিন সে তার পিতা-মাতার জন্য সুপারিশ করবে — যদি তারা মুসলিম হয়।
৪. গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা
- সন্তান হারানো কখনো আল্লাহর শাস্তি নয় — বরং এটি পরীক্ষা ও প্রতিদানের সুযোগ।
- সবর ও ইহতিসাব — "ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন" বলা এবং আল্লাহর কাছে প্রতিদান আশা করা।
- সন্তানের জন্য দুআ করা — সে জান্নাতে থাকবে, তাই তার জন্য দুআ করা যায়।
- নিজের আমল সংশোধন করা — পিতা-মাতার জান্নাত নিশ্চিত করতে তাওবা ও নেক আমল জরুরি।
- শোক প্রকাশে সীমা রক্ষা — চিৎকার, বিলাপ, মুখ চাপড়ানো নিষিদ্ধ; চোখের পানি ও হৃদয়ের ব্যথা দোষণীয় নয়।
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | বিধান | |------|-------| | সবর ও ইহতিসাব করলে প্রতিদান | জান্নাত (বুখারী: ৬৪২৪) | | মৃত নাবালেগ সন্তানের অবস্থা | জান্নাতে, ইবরাহীম (আ.)-এর তত্ত্বাবধানে | | কিয়ামতের দিন ভূমিকা | পিতা-মাতার জন্য সুপারিশকারী | | পিতা-মাতা গুনাহগার হলে | সন্তান জান্নাতে যাবে; পিতা-মাতাকে নিজ আমলের হিসাব দিতে হবে | | কুফরি/শিরক করলে | সন্তানের জান্নাত পিতা-মাতাকে জাহান্নাম থেকে বাঁচাবে না |
আল্লাহ আমাদের সবাইকে সবর ও ইহতিসাবের তাওফিক দান করুন এবং আমাদের সন্তানদের জান্নাতের সুপারিশকারী বানান। আমীন।