সন্তান হারানো মায়ের প্রশ্নের কুরআন-হাদীস ভিত্তিক উত্তর।
Family Life · Ahle Hadith / Salafi
Question
আমি এক সন্তানহারা মা। আমার বাচ্চার পজিশন, পানি সব ঠিক ছিলো। আমারও কোনো জটিলতা ছিলো না। নরমাল ডেলিভারির জন্য সব ঠিক ছিলো। আমাদের এদিকে বেশিরভাগ মানুষ অভিজ্ঞ নার্স দিয়ে নরমাল ডেলিভারি করায়। আমারও যেহেতু সব ঠিক ছিলো তাই আমারও বাড়িতে নার্স এনে ডেলিভারি করানো হয়। তারা আমাদের এদিকে এতো ডেলিভারি করাইছে কারো কোনো সমস্যা হয়নি কিন্তু আমার বেলায় তাদের কিছু ভুলের কারনে আমার পানি ভেঙে বাচ্চার মাথা আটকে যায়। পরে হসপিটাল গিয়ে অনেক কস্টে ডেলিভারি হয়। বাচ্চা হওয়ার পর তার হার্টবিট ঠিক ছিলো তবে কান্না করে নাই। তখন মাত্র রাত ৯টা বাজে তাও কয়েক হাসপাতাল খুজেও কোনো শিশু ডাক্তার পাওয়া যায়নি তাই বাচ্চাকে NICU তে রাখা হয়।পরের দিন শিশু ডাক্তার দেখানোর আগেই বাচ্চা মারা যায় Nicu এর লোকেরা জানায়ও নাই বাচ্চাকে ঠিক মতো treatment ও করে নাই। এখন নিজের মধ্যে অপরাধবোধ আছেই তার ওপর সবার এক কথা যে বাড়িতে থাকায় এমন হইছে,নাইলে হতো না।
আমার প্রশ্ন হলো যে এটা কি তাকদিরের ফয়সালা নয়? আমরা সাধ্যমতো চেষ্টার পরেও আল্লাহর বান্দিরে আল্লাহ নিয়ে গেছেন এটা আল্লাহর ফয়সালা ভাবা কি ভুল? আমরা তো আল্লাহর ফয়সালায় সবর করার চেষ্টা করছি কিন্তু খালি মনে হচ্ছে আমাদের মেয়ে হয়তো আমাদের আখিরাতে দোষ দিবে,, আমরা কি আখিরাতে মেয়ের সাথে সাক্ষাৎ এর আশা করতে পারবো না? এরকম সন্তান হারিয়ে সবর করলে আখিরাতে যে প্রতিদান থাকবে আমরা কি তা পাবো ? কুরআন হাদিস অনুযায়ী আমাদের মেয়ে এখন কি অবস্থায় আছে?
Answer
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ
প্রিয় বোন, আপনার এই কষ্ট ও বেদনার কথা পড়ে হৃদয় ভারাক্রান্ত হলো। আল্লাহ তা'আলা আপনার সবরকে উত্তমভাবে কবুল করুন এবং আপনার সন্তানকে জান্নাতে আপনার জন্য সুপারিশকারী বানিয়ে দিন। আমিন।
আপনার প্রশ্নগুলোর উত্তর কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ধাপে ধাপে দিচ্ছি:
১. এটা কি তাকদিরের ফয়সালা? আল্লাহর ফয়সালা ভাবা কি ভুল?
না, এটি তাকদিরের ফয়সালা এবং আল্লাহর ফয়সালা ভাবা কখনোই ভুল নয়। বরং এটাই ঈমানের অংশ।
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
مَا أَصَابَ مِن مُّصِيبَةٍ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ ۗ وَمَن يُؤْمِن بِاللَّهِ يَهْدِ قَلْبَهُ ۚ وَاللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ
"আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোনো বিপদ আসে না। যে আল্লাহর উপর ঈমান আনে, তিনি তার অন্তরকে হেদায়েত দান করেন। আল্লাহ সবকিছু সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত।" (সূরা আত-তাগাবুন: ১১)
আল্লাহ আরও বলেন:
مَا أَصَابَكَ مِنْ حَسَنَةٍ فَمِنَ اللَّهِ ۖ وَمَا أَصَابَكَ مِن سَيِّئَةٍ فَمِن نَّفْسِكَ
"তোমার কাছে যে কল্যাণ আসে তা আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর যে অকল্যাণ আসে তা তোমার নিজের (কৃতকর্মের) কারণে।" (সূরা আন-নিসা: ৭৯)
শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: "তাকদিরের প্রতি ঈমান হলো উম্মতের সর্বসম্মত আকীদা।" (মাজমুউল ফাতাওয়া: ৮/৪৪৯)
শাইখ ইবন উসাইমীন (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: "মুসিবত যা আসে তা আল্লাহর কাদা ও কাদারের অন্তর্ভুক্ত, যা তিনি লাওহে মাহফুজে লিখে রেখেছেন।" (শারহুল আরবাঈন আন-নাওয়াবিয়্যাহ)
তাই আপনার সন্তানের মৃত্যু আল্লাহর ফয়সালা — এটা ভাবা সম্পূর্ণ সঠিক এবং ঈমানের অংশ।
২. আপনার সন্তান কি আখিরাতে আপনাকে দোষ দেবে?
না, ইনশাআল্লাহ কখনোই না। কারণ:
১. আপনি আপনার সাধ্যমতো চেষ্টা করেছেন — আপনি নার্স এনেছিলেন, হাসপাতালে নিয়েছিলেন, চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিলেন। এটাই আপনার উপর ওয়াজিব ছিল।
২. আল্লাহ তা'আলা কারো উপর তার সামর্থ্যের বাইরে বোঝা চাপান না:
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا
"আল্লাহ কারো উপর তার সামর্থ্যের বাইরে বোঝা চাপান না।" (সূরা আল-বাকারা: ২৮৬)
৩. নাবালেগ শিশুরা জান্নাতে থাকবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
كُلُّ مَوْلُودٍ يُولَدُ عَلَى الْفِطْرَةِ
"প্রতিটি সন্তান ফিতরাতের (ইসলামের স্বভাব) উপর জন্মগ্রহণ করে।" (সহীহ বুখারী: ১৩৮৫, সহীহ মুসলিম: ২৬৫৮)
শাইখ ইবন উসাইমীন (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: "মুসলিমদের নাবালেগ সন্তানরা জান্নাতে থাকবে, তারা জান্নাতে ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর তত্ত্বাবধানে থাকবে।" (ফাতাওয়া নূরুন আলাদ-দারব)
শাইখ ইবন বায (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: "মুসলিমদের ছোট শিশুরা যারা মারা যায়, তারা জান্নাতে থাকবে।" (মাজমুউ ফাতাওয়া ইবন বায: ৪/৩৪৭)
আপনার মেয়ে আপনাকে দোষ দেবে না, বরং ইনশাআল্লাহ সে আপনার জন্য জান্নাতে সুপারিশকারী হবে।
৩. আমরা কি আখিরাতে মেয়ের সাথে সাক্ষাতের আশা করতে পারবো?
হ্যাঁ, ইনশাআল্লাহ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
مَا مِنْ مُسْلِمَيْنِ يَمُوتُ لَهُمَا ثَلَاثَةٌ مِنَ الْوَلَدِ لَمْ يَبْلُغُوا الْحِنْثَ إِلَّا أَدْخَلَهُمَا اللَّهُ الْجَنَّةَ بِفَضْلِ رَحْمَتِهِ إِيَّاهُمْ
"যে কোনো মুসলিম দম্পতির তিনটি সন্তান মারা যায় যারা বালেগ হয়নি, আল্লাহ তাদের প্রতি তাঁর রহমতের কারণে তাদের (পিতামাতাকে) জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।" (সহীহ বুখারী: ১২৪৮)
আরও একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
يَقُولُ اللَّهُ تَعَالَى: مَا لِعَبْدِي الْمُؤْمِنِ عِنْدِي جَزَاءٌ إِذَا قَبَضْتُ صَفِيَّهُ مِنْ أَهْلِ الدُّنْيَا ثُمَّ احْتَسَبَهُ إِلَّا الْجَنَّةَ
"আল্লাহ তা'আলা বলেন: আমার মুমিন বান্দার কাছে যদি আমি তার প্রিয়জনকে (সন্তানকে) দুনিয়া থেকে নিয়ে যাই, আর সে সবর করে ও প্রতিদান আল্লাহর কাছে চায়, তবে তার প্রতিদান আমার কাছে জান্নাত ছাড়া আর কিছু নয়।" (সহীহ বুখারী: ৬৪২৪)
শাইখ ইবন আল-কাইয়্যিম (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: "যে ব্যক্তি তার সন্তান হারিয়ে সবর করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে তার সন্তানের সাথে মিলনের ব্যবস্থা করবেন।" (তুহফাতুল মাওদুদ)
৪. সবর করলে আখিরাতে কী প্রতিদান পাবো?
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُم بِغَيْرِ حِسَابٍ
"নিশ্চয়ই সবরকারীদের প্রতিদান বেহিসাব (অপরিমিত) দেওয়া হবে।" (সূরা আয-যুমার: ১০)
আল্লাহ আরও বলেন:
وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُم مُّصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ أُولَٰئِكَ عَلَيْهِمْ صَلَوَاتٌ مِّن رَّبِّهِمْ وَرَحْمَةٌ ۖ وَأُولَٰئِكَ هُمُ الْمُهْتَدُونَ
"আর সুসংবাদ দাও সবরকারীদের। যারা বিপদে পড়লে বলে: নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং নিশ্চয়ই আমরা তাঁর কাছে ফিরে যাবো। তাদের উপরই তাদের রবের পক্ষ থেকে সালাত (প্রশংসা) ও রহমত বর্ষিত হয়, আর তারাই হেদায়েতপ্রাপ্ত।" (সূরা আল-বাকারা: ১৫৫-১৫৭)
শাইখ ইবন বায (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: "সন্তান হারিয়ে সবর করা এবং 'ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন' বলা — এটা মুমিনের জন্য মহান প্রতিদানের কাজ।" (মাজমুউ ফাতাওয়া: ৪/৩৪৭)
৫. কুরআন-হাদীস অনুযায়ী আপনার মেয়ে এখন কী অবস্থায় আছে?
আপনার মেয়ে ইনশাআল্লাহ জান্নাতে আছে। কারণ:
১. সে নাবালেগ ছিল — নাবালেগ শিশুরা জান্নাতে থাকবে।
২. রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
كُلُّ مَوْلُودٍ يُولَدُ عَلَى الْفِطْرَةِ
"প্রতিটি সন্তান ফিতরাতের উপর জন্মগ্রহণ করে।" (সহীহ মুসলিম: ২৬৫৮)
৩. শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: "মুসলিমদের নাবালেগ সন্তানরা জান্নাতে থাকবে, এটা আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের সর্বসম্মত মত।" (মাজমুউল ফাতাওয়া: ৪/২৭৯)
৬. অপরাধবোধ ও সমাজের কথা
প্রিয় বোন, আপনার অপরাধবোধ থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু আপনি আপনার সামর্থ্যের বাইরে কিছু করেননি। আপনি চেষ্টা করেছেন, হাসপাতালে নিয়েছেন, চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন। আল্লাহ তা'আলা আপনার এই চেষ্টাকে দেখেছেন এবং ইনশাআল্লাহ আপনি দায়মুক্ত।
সমাজের কথা — তারা যা বলবে তা আল্লাহর ফয়সালা পরিবর্তন করতে পারবে না। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَلَا تَحْسَبَنَّ اللَّهَ غَافِلًا عَمَّا يَعْمَلُ الظَّالِمُونَ
"আর আপনি আল্লাহকে কখনোই গাফেল মনে করবেন না যা জালিমরা করে।" (সূরা ইবরাহীম: ৪২)
শাইখ সালিহ আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন: "মুসিবতের সময় সবর করা এবং আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকা — এটাই মুমিনের বৈশিষ্ট্য।" (শারহু কিতাবিত তাওহীদ)
উপসংহার
| প্রশ্ন | উত্তর | |--------|--------| | তাকদিরের ফয়সালা? | হ্যাঁ, আল্লাহর ফয়সালা — এটা ভাবা সঠিক | | মেয়ে দোষ দেবে? | না, ইনশাআল্লাহ কখনোই না | | আখিরাতে সাক্ষাৎ? | হ্যাঁ, ইনশাআল্লাহ জান্নাতে | | সবরের প্রতিদান? | জান্নাত ও বেহিসাব প্রতিদান | | মেয়ের অবস্থা? | ইনশাআল্লাহ জান্নাতে |
দুআ: আল্লাহ তা'আলা আপনার সবরকে উত্তমভাবে কবুল করুন, আপনার মেয়েকে জান্নাতুল ফিরদাউসে উচ্চ মর্যাদা দান করুন, এবং আপনাকে ও আপনার পরিবারকে জান্নাতে তার সাথে মিলিত হওয়ার তাওফিক দিন। আমিন।
إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ
"নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং নিশ্চয়ই আমরা তাঁর কাছে ফিরে যাবো।"
ওয়াল্লাহু আ'লাম বিস-সাওয়াব