ছাগল কিনে বিক্রেতার কাছে রেখে বাচ্চা ভাগাভাগির শর্তে ব্যবসা করা কি জায়েজ?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 5879
Questioner: Bushra 0153
Question Asked: 23 Sep 2026, 09:50 PM
Reviewed & Published: 23 Sep 2026, 10:16 PM
Views: 5
Tokens: 4,539
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমি যদি বাচ্চা ন্যায্য মূল্য দিয়ে একটি ছাগল কিনি তারপর, যার কাছ থেকে কিনেছি উনার কাছে রেখে দেই, পরে বাচ্চা যেগুলো হবে দুইজনের মধ্যে ভাগ করে নেয়া হয়। এবং সব শেষে আমার ভাগের বাচ্চা গুলো আমি বিক্রি করে দিতে পারবো। এটা কি জায়েজ?

Answer

প্রশ্ন: বাচ্চাসহ ছাগল ক্রয় ও মুনাফা ভাগাভাগির শর্তে রাখা—জায়েজ কি?

সংক্ষিপ্ত উত্তর

না, প্রশ্নে বর্ণিত পদ্ধতিটি জায়েজ নয়। এটি মূলত একটি মুদারাবা (মুনাফা ভাগাভাগির ব্যবসা)-এর মতো গঠন, কিন্তু এতে মুদারাবার শর্ত পূর্ণ হয়নি; বরং এটি ফাসিদ (বৈধতাবিরোধী) শর্তযুক্ত চুক্তি। কারণ:

  1. আপনি ছাগলটি কিনে নেওয়ার পর তা বিক্রেতার কাছে রেখে দিলে এবং বাচ্চা দুইজনের মধ্যে ভাগ করার শর্ত করলে—এটি প্রকৃতপক্ষে শিরকত বা মুদারাবা হিসেবে গণ্য হবে, কিন্তু মুদারাবায় মূলধন (রাসুল মাল) এক পক্ষের হতে হবে এবং শ্রম অপর পক্ষের হতে হবে। এখানে উভয়েই মূলধন ও শ্রমের মিশ্রণ ঘটাচ্ছেন, যা মুদারাবার শর্ত পরিপন্থী।

  2. ছাগলটি আপনার মালিকানায় থাকা অবস্থায় অন্যের কাছে রেখে দিলে এবং তার থেকে প্রাপ্ত বাচ্চার ভাগ নির্ধারণ করলে—এটি আজির (ভাড়া) বা মুদারাবা কোনোটিই সঠিকভাবে আদায় করে না; বরং এটি ফাসিদ মুদারাবা

  3. মুদারাবায় ক্ষতি হলে মূলধনদাতা বহন করবেন—এখানে ছাগল মরে গেলে বা বাচ্চা না হলে ক্ষতির দায় কার? এই অনিশ্চয়তা (গারার) চুক্তিকে আরও দুর্বল করে।

  4. সবশেষে আপনি আপনার ভাগের বাচ্চা বিক্রি করতে পারবেন—এটি ঠিক আছে, তবে শর্তটি নিজেই ফাসিদ হওয়ার কারণে পুরো চুক্তিটি জায়েজ হবে না


বিস্তারিত বিশ্লেষণ

১. চুক্তির প্রকৃতি নির্ণয়

আপনি যা বর্ণনা করেছেন, তা নিম্নরূপ:

| ধাপ | কার্যক্রম | |------|-----------| | ১ | আপনি ন্যায্য মূল্যে একটি ছাগল কিনলেন → ছাগলের মালিক আপনি | | ২ | ছাগলটি বিক্রেতার কাছে রেখে দিলেন → আমানত (ওদিয়া) বা ভাড়া | | ৩ | বাচ্চা হলে দুইজনের মধ্যে ভাগ → মুনাফা ভাগাভাগি | | ৪ | আপনার ভাগের বাচ্চা আপনি বিক্রি করবেন → আপনার মালিকানা |

এখানে দুটি সম্ভাব্য চুক্তির রূপ হতে পারে:

(ক) মুদারাবা: আপনি মূলধন (ছাগল) দিলেন, সে শ্রম দিল—মুনাফা ভাগ হবে। (খ) শিরকত: উভয়ে মালিকানায় শরিক হয়ে লালন-পালন করবেন—মুনাফা ভাগ হবে।

কিন্তু আপনার বর্ণনায় ছাগলটি সম্পূর্ণ আপনার মালিকানায়, অথচ বাচ্চার ভাগে সে শরিক হবে—এটি মুদারাবার শর্তের পরিপন্থী, কারণ মুদারাবায় মূলধনদাতা ছাড়া অপর পক্ষের মূলধনে কোনো অংশ থাকে না।

২. ফিকহি বিশ্লেষণ

(ক) মুদারাবার শর্ত

মুদারাবার বৈধতার জন্য শর্ত হলো:

  • মূলধন (রাসুল মাল) এক পক্ষের হতে হবে (মুদারিব বা মূলধনদাতা)।
  • শ্রম অপর পক্ষের হতে হবে।
  • মুনাফার অনুপাত স্পষ্টভাবে নির্ধারিত হতে হবে (যেমন ৫০%-৫০%, ৬০%-৪০%)।
  • ক্ষতির দায় মূলধনদাতার উপর বর্তাবে, মুদারিবের উপর নয় (যদি না মুদারিবের অবহেলা প্রমাণিত হয়)।

রেফারেন্স:

  • আল-হিদায়া (কিতাবুল মুদারাবা): "المضاربة أن يدفع رجل مالاً إلى آخر ليتجر فيه والربح بينهما على ما شرطا" — মুদারাবা হলো এক ব্যক্তি অপরকে মাল দেয় ব্যবসার জন্য, মুনাফা উভয়ের মধ্যে শর্ত অনুযায়ী।
  • রাদ্দুল মুহতার (৫/৬৪৮): "وشرط صحتها أن يكون رأس المال من أحد المتراضيين والعمل من الآخر" — বৈধতার শর্ত হলো মূলধন এক পক্ষের এবং শ্রম অপর পক্ষের হওয়া।

আপনার ক্ষেত্রে: ছাগল আপনার মালিকানায়, কিন্তু আপনি নিজেই শ্রম দিচ্ছেন না—বরং বিক্রেতা লালন-পালন করছে। আবার সে মূলধনে শরিক হচ্ছে না, শুধু বাচ্চার ভাগ পাবে। এটি মুদারাবার সঠিক গঠন নয়।

(খ) শিরকত (অংশীদারি) হিসেবে

যদি এটিকে শিরকত ধরা হয়, তবে শর্ত হলো:

  • উভয়েই মূলধনে শরিক হতে হবে (যেমন দুজনেই ছাগল কিনবে)।
  • অথবা একজন ছাগল দিলে অপরজন শ্রম ও খরচ দেবে—এটি শিরকতুল আবদান বা মুদারাবা-এর অনুরূপ।

কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে ছাগল সম্পূর্ণ আপনার, আর সে শুধু রেখে দিচ্ছে—এটি শিরকত নয়, বরং ইজারা (ভাড়া) বা আমানত-এর মতো। আর ইজারায় মুনাফা ভাগাভাগির শর্ত জায়েজ নয়।

রেফারেন্স:

  • ফাতাওয়া আলমগিরি (৩/৩০৫): "لو دفع دابة إلى رجل ليستخدمها والربح بينهما لم يجز" — যদি কেউ পশু দেয় ব্যবহারের জন্য এবং মুনাফা ভাগাভাগির শর্ত করে, তবে জায়েজ নয়।
  • বাদায়েউস সানায়ে (৫/১৪৫): "الشركة الفاسدة ما كانت بشرط فاسد" — ফাসিদ শর্তযুক্ত শিরকত ফাসিদ।

(গ) গারার (অনিশ্চয়তা)

বাচ্চা হবে কি হবে না, কত হবে—এটি সম্পূর্ণ অনিশ্চিত। এই অনিশ্চয়তার উপর ভিত্তি করে মুনাফা ভাগ করা গারার-এর অন্তর্ভুক্ত, যা নিষিদ্ধ।

হাদিস:

"نَهَى رَسُولُ اللَّهِ ﷺ عَنْ بَيْعِ الْغَرَرِ" — রাসূলুল্লাহ ﷺ অনিশ্চিত (গারার) বিক্রয় থেকে নিষেধ করেছেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৫১৩)

৩. বিকল্প জায়েজ পদ্ধতি

যদি আপনি এই ব্যবসা করতে চান, তবে নিম্নলিখিত পদ্ধতিগুলোর একটি অবলম্বন করুন:

পদ্ধতি ১: মুদারাবা (সঠিক গঠনে)

  • আপনি নগদ অর্থ বা ছাগল মূলধন হিসেবে দেবেন।
  • সে শ্রম ও লালন-পালনের খরচ বহন করবে।
  • মুনাফা (বাচ্চার বিক্রয়লব্ধ আয়) পূর্বনির্ধারিত অনুপাতে ভাগ হবে—যেমন ৫০%-৫০% বা ৬০%-৪০%।
  • ক্ষতি (ছাগল মরে গেলে) আপনার উপর বর্তাবে, যদি না তার অবহেলা থাকে।
  • শর্ত: মুনাফার অনুপাত স্পষ্ট হতে হবে, কোনো নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা নয়।

রেফারেন্স:

  • ফাতাওয়া উসমানি (২/৩৯৫): "مضاربة میں نفع کی شرح فیصدی طور پر طے ہونی چاہیے، مطلق رقم نہیں۔"
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (৩/২৩৪): "مضاربة میں رأس المال ایک کی طرف سے اور عمل دوسرے کی طرف سے ہونا ضروری ہے۔"

পদ্ধতি ২: শিরকত (অংশীদারি)

  • উভয়ে মিলে ছাগল কিনবেন (যেমন আপনি ৫০% দিলেন, সে ৫০% দিল)।
  • উভয়ে লালন-পালনের খরচ ভাগ করবেন।
  • বাচ্চা ও মুনাফা মালিকানার অনুপাতে ভাগ হবে।
  • এতে কোনো গারার নেই, কারণ উভয়েই প্রকৃত মালিক।

রেফারেন্স:

  • রাদ্দুল মুহতার (৫/৬৪০): "الشركة في المال تكون على قدر رأس المال" — মালে শিরকত মূলধনের অনুপাতে হবে।
  • আল-হিদায়া (কিতাবুশ শিরকত): "إذا اشتركا في المال على أن الربح بينهما على قدر رأس المال جاز" — যদি মালে শরিক হয় এবং মুনাফা মূলধনের অনুপাতে হয়, তবে জায়েজ।

পদ্ধতি ৩: ইজারা (ভাড়া) + আলাদা ক্রয়

  • আপনি ছাগলটি তার কাছে ভাড়া দিলেন নির্দিষ্ট মাসিক/বার্ষিক টাকার বিনিময়ে।
  • সে ছাগল লালন-পালন করবে, দুধ দোহন করবে—এটি তার ভাড়ার বিনিময়।
  • বাচ্চা হলে সম্পূর্ণ বাচ্চা আপনার (কারণ মূল ছাগল আপনার)।
  • আপনি চাইলে তাকে বাচ্চার একটি অংশ হিবা (দান) বা বেতন হিসেবে দিতে পারেন—কিন্তু এটি চুক্তির শর্ত হবে না।

রেফারেন্স:

  • ফাতাওয়া আলমগিরি (৩/৩০৫): "الإجارة على المنافع بعوض معلوم جائزة" — নির্দিষ্ট বিনিময়ে ব্যবহারের ভাড়া জায়েজ।
  • বাদায়েউস সানায়ে (৪/১৭৫): "الإجارة عقد على المنافع بعوض" — ইজারা হলো নির্দিষ্ট বিনিময়ে ব্যবহারের চুক্তি।

সারসংক্ষেপ

| বিষয় | প্রশ্নে বর্ণিত পদ্ধতি | সঠিক পদ্ধতি | |------|----------------------|-------------| | ছাগলের মালিকানা | আপনার | মুদারাবায় আপনার, শিরকতে উভয়ের | | শ্রম | তার | মুদারাবায় তার, শিরকতে উভয়ের | | মুনাফার ভাগ | বাচ্চার ৫০%-৫০% (অনিশ্চিত) | পূর্বনির্ধারিত অনুপাত (৫০%-৫০% ইত্যাদি) | | ক্ষতির দায় | অস্পষ্ট | মুদারাবায় আপনার, শিরকতে অনুপাতে | | হুকুম | ফাসিদ/নাজায়েজ | জায়েজ |

উপরোক্ত বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট যে, প্রশ্নে বর্ণিত পদ্ধতিটি জায়েজ নয়। জায়েজ পদ্ধতির জন্য উপরে বর্ণিত তিনটি বিকল্পের যেকোনো একটি অবলম্বন করুন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.