একটা ছেলের সাথে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। সে আমাকে বলছিল- আল্লাহ কসম দিয়ে আমাকেই বিয়ে করবে। তাকে বিশ

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 5857
Questioner: Tanjim tabassum
Question Asked: 23 Sep 2026, 01:08 PM
Reviewed & Published: 23 Sep 2026, 02:12 PM
Views: 37
Tokens: 4,937
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

একটা ছেলের সাথে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। সে আমাকে বলছিল- আল্লাহ কসম দিয়ে আমাকেই বিয়ে করবে। তাকে বিশ্বাস করে আমি ভুল পাপ কাজ করেছি- শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়েছি। সে এখন আমাকে বিয়ে করতে চায় না৷ এখন আমি কি করবো?

Answer

প্রশ্নের বিশ্লেষণ ও ফিকহি বিধান

প্রশ্ন: এক ছেলের সাথে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। সে আল্লাহর কসম দিয়ে বলত—তোমাকেই বিয়ে করবে। তাকে বিশ্বাস করে আমি ভুল পাপ কাজ করেছি—শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়েছি। এখন সে বিয়ে করতে চায় না। এখন আমি কী করব?


১. প্রথমেই যে বিষয়টি স্পষ্ট করা জরুরি

(ক) অবৈধ প্রেম ও শারীরিক সম্পর্ক—মহাপাপ

ইসলামে বিবাহ-বহির্ভূত প্রেম, প্রণয়, নির্জনে মিলন এবং যিনা সম্পূর্ণ হারাম ও কবিরা গুনাহ। আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَىٰ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا "আর তোমরা যিনার নিকটেও যেয়ো না; নিশ্চয়ই তা অশ্লীল কাজ এবং মন্দ পথ।" — (সূরা আল-ইসরা: ৩২)

وَلَا تَقْرَبُوا الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ "আর তোমরা প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য অশ্লীল কাজের নিকটেও যেয়ো না।" — (সূরা আল-আনআম: ১৫১)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا كَانَ ثَالِثَهُمَا الشَّيْطَانُ "কোনো পুরুষ কোনো নারীর সাথে নির্জনে মিলিত হবে না; তাদের তৃতীয়জন হবে শয়তান।" — (সুনানে তিরমিজি: ২১৬৫, হাসান সহিহ)

ফিকহি বিধান: প্রেম-ভালোবাসার নামে যা কিছু হয়েছে—তা সম্পূর্ণ নাজায়েজ ছিল। এতে উভয়েই গুনাহগার। তবে তাওবা করলে আল্লাহ ক্ষমা করেন। আল্লাহ বলেন:

وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ "হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তাওবা করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।" — (সূরা আন-নূর: ৩১)


২. "আল্লাহর কসম দিয়ে বিয়ের প্রতিশ্রুতি"—এর হুকুম

(ক) কসম ভঙ্গ করা বা মিথ্যা কসম খাওয়া

কেউ যদি আল্লাহর নামে কসম খেয়ে মিথ্যা বলে বা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে, তবে তা কসমে গামুস (মিথ্যা কসম)—যা কবিরা গুনাহ। রাসূল ﷺ বলেছেন:

مَنْ حَلَفَ عَلَى يَمِينٍ يَقْتَطِعُ بِهَا مَالَ امْرِئٍ مُسْلِمٍ هُوَ عَلَيْهَا فَاجِرٌ لَقِيَ اللَّهَ وَهُوَ عَلَيْهِ غَضْبَانُ "যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের সম্পদ আত্মসাতের জন্য মিথ্যা কসম খায়, সে আল্লাহর সাথে সাক্ষাতে আল্লাহর ক্রোধ নিয়ে সাক্ষাৎ করবে।" — (সহিহ বুখারি: ২৩৫৭)

(খ) কসম দিয়ে বিয়ের ওয়াদা—ফিকহি দৃষ্টিতে

গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা: কসম খেয়ে বিয়ের ওয়াদা করা বা "আল্লাহর কসম, তোমাকেই বিয়ে করব" বলা—এটি শুধু ওয়াদা, কোনো আকদ (বিবাহ চুক্তি) নয়। ইসলামে বিবাহ সম্পন্ন হয় ইজাব-কবুল, দুজন সাক্ষী এবং মোহর দ্বারা। মুখে কসম খেয়ে "বিয়ে করব" বললেই বিবাহ হয় না।

ফাতাওয়া উসমানিরাদ্দুল মুহতার-এ স্পষ্ট আছে:

বিবাহের জন্য ইজাব-কবুল, সাক্ষী ও মোহর শর্ত। শুধু ওয়াদা বা কসম দ্বারা বিবাহ সংঘটিত হয় না। — (রাদ্দুল মুহতার: ৩/৯, কিতাবুন নিকাহ)

সুতরাং: ছেলেটি কসম খেয়েছিল—এটি তার উপর আখলাকি ও দ্বীনি দায়িত্ব সৃষ্টি করে, কিন্তু আইনগতভাবে বিয়ের বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করে না। সে যদি এখন বিয়ে করতে অস্বীকার করে, তবে শরিয়তের দৃষ্টিতে তাকে জোর করা যাবে না। তবে সে মিথ্যা কসম ও ওয়াদা ভঙ্গের গুনাহ থেকে তাওবা না করলে কিয়ামতের দিন জবাবদিহি করতে হবে।


৩. এখন আপনার করণীয়

(ক) প্রথম কাজ: খাঁটি তাওবা

আপনি যা করেছেন—তা গুনাহ। এখন তাওবাতুন নাসুহা করুন:

  1. গুনাহ থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা
  2. অনুতপ্ত হওয়া
  3. ভবিষ্যতে না করার দৃঢ় সংকল্প
  4. যদি কারো হক নষ্ট হয়, তা ফিরিয়ে দেওয়া

আল্লাহ বলেন:

إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ "নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং পবিত্রতা অর্জনকারীদেরও ভালোবাসেন।" — (সূরা আল-বাকারা: ২২২)

(খ) ছেলেটির সাথে সম্পর্ক সম্পূর্ণ ছিন্ন করুন

যেহেতু সে বিয়ে করতে চায় না এবং সম্পর্কটি হারাম ছিল—এখনই সব যোগাযোগ বন্ধ করুন। ফোন, মেসেজ, সাক্ষাৎ—সব বন্ধ। কারণ:

  • এ সম্পর্ক অবৈধ
  • তার সাথে থাকলে আরও গুনাহ হবে
  • তাওবা কবুল হবে না যদি গুনাহ চালিয়ে যান

(গ) বিয়ের জন্য চাপ দেওয়া বা জোর করা যাবে না

শরিয়তে বিয়ে হয় উভয় পক্ষের সম্মতিতে। ছেলেটি যদি রাজি না হয়, তবে তাকে জোর করা যাবে না। জোর করে বিয়ে করালে তা সুখী হবে না এবং দ্বীনি দৃষ্টিতেও সঠিক নয়।

তবে হ্যাঁ, আপনি পরিবারের মাধ্যমে বা সমাজের সম্মানিত লোকদের মাধ্যমে তাকে নসিহত করাতে পারেন যে, সে যেন মিথ্যা কসম ও ওয়াদা ভঙ্গের গুনাহ থেকে বাঁচে এবং দায়িত্ব নেয়। কিন্তু জোর নয়

(ঘ) গোপনীয়তা রক্ষা করুন

আপনার এই গুনাহের কথা কাউকে বলবেন না। রাসূল ﷺ বলেছেন:

مَنْ سَتَرَ مُسْلِمًا سَتَرَهُ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ "যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের দোষ গোপন করবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার দোষ গোপন করবেন।" — (সহিহ মুসলিম: ২৫৯০)

তবে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বা বিশ্বস্ত ফকিহ-এর কাছে প্রয়োজনে পরামর্শ নিতে পারেন, তবে পরিচয় গোপন রেখে।

(ঙ) ভবিষ্যতের জন্য সতর্কতা

  1. অভিভাবকের মাধ্যমে বিয়ে: ইসলামে বিয়ের সঠিক পদ্ধতি হলো অভিভাবকের মাধ্যমে প্রস্তাব, সম্মতি, সাক্ষী ও আকদ।
  2. প্রেম-প্রণয়ে জড়াবেন না: এটি শয়তানের ধোঁকা।
  3. নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, দ্বীনি ইলম অর্জন: এতে মন পরিষ্কার হবে।
  4. বিয়ের জন্য দুআ:

    رَبِّ إِنِّي لِمَا أَنزَلْتَ إِلَيَّ مِنْ خَيْرٍ فَقِيرٌ "হে আমার রব! আপনি আমার প্রতি যে কল্যাণ নাজিল করবেন, আমি তার মুখাপেক্ষী।" — (সূরা আল-কাসাস: ২৪)

(চ) যদি সে পরে বিয়ে করতে রাজি হয়

যদি সে পরে অনুতপ্ত হয়ে বিয়ে করতে চায়, তবে:

  • অভিভাবকের মাধ্যমে বিয়ে করতে হবে
  • দুজন সাক্ষীমোহর নির্ধারণ করতে হবে
  • আকদ করতে হবে
  • বিয়ের আগে আলাদা থাকতে হবে, কোনো হারাম সম্পর্ক নয়

৪. বিশেষ সতর্কতা: গর্ভধারণের সম্ভাবনা থাকলে

যদি শারীরিক সম্পর্কের কারণে গর্ভধারণ হয়ে থাকে, তবে:

  • গর্ভপাত করা যাবে না (ইসলামে গর্ভপাত নিষিদ্ধ, বিশেষত ১২০ দিন পর তো সম্পূর্ণ হারাম)
  • সন্তানের ভরণপোষণ ও পরিচয় নিয়ে ফকিহদের পরামর্শ নিন
  • সন্তানের হক আদায় করুন

৫. সংক্ষিপ্ত উত্তর

| বিষয় | বিধান | |------|-------| | প্রেম ও শারীরিক সম্পর্ক | হারাম, কবিরা গুনাহ—তাওবা করতে হবে | | আল্লাহর কসম দিয়ে বিয়ের ওয়াদা | ওয়াদা, আকদ নয়—আইনগত বাধ্যবাধকতা নেই | | মিথ্যা কসম ও ওয়াদা ভঙ্গ | ছেলেটির উপর গুনাহ, তাওবা করা তার দায়িত্ব | | ছেলে বিয়ে করতে না চাইলে | জোর করা যাবে না; সম্পর্ক ছিন্ন করুন | | এখন করণীয় | তাওবা, সম্পর্ক ছিন্ন, গোপনীয়তা রক্ষা, ভবিষ্যতে অভিভাবকের মাধ্যমে বিয়ে | | গর্ভধারণ হলে | গর্ভপাত নিষিদ্ধ; ফকিহের পরামর্শ নিন |


৬. উপদেশ

প্রিয় বোন! আপনি প্রতারিত হয়েছেন, কিন্তু আল্লাহর দরবারে ফিরে আসার দরজা সবসময় খোলা। হতাশ হবেন না। আল্লাহ বলেন:

قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا ۚ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ "বলুন, হে আমার বান্দারা! যারা নিজেদের উপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করেন। তিনিই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" — (সূরা আয-যুমার: ৫৩)

আল্লাহ আপনার তাওবা কবুল করুন এবং উত্তম জীবনসঙ্গী দান করুন। আমিন।


রেফারেন্স:

  • সূরা আল-ইসরা: ৩২, সূরা আন-নূর: ৩১, সূরা আয-যুমার: ৫৩
  • সহিহ বুখারি: ২৩৫৭, সহিহ মুসলিম: ২৫৯০, সুনানে তিরমিজি: ২১৬৫
  • রাদ্দুল মুহতার: ৩/৯ (কিতাবুন নিকাহ)
  • ফাতাওয়া উসমানি: ২/২৭১-২৭৫
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া: ৪/২৫৬
  • বাহিশতী জেওর: বিবাহ অধ্যায়
  • মাআরিফুল কুরআন: সূরা আল-ইসরার তাফসির

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.