বীর্যযুক্ত কাপড় দিয়ে ফরজ গোসল করা যাবে?
Taharah Purity · Hanafi
Question
Answer
কাপড়ে বীর্য লেগে গেলে তা দিয়ে ফরজ গোসল করা যাবে কি?
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
প্রশ্ন দুটি অংশে বিভক্ত: ১. কাপড়ে যদি বীর্য (মযী/মনি) লেগে যায়, তবে সেই কাপড় দিয়ে ফরজ গোসল করা যাবে কি? ২. যে কাপড় পরিহিত অবস্থায় শরীর নাপাক হয় (যেমন: স্বপ্নদোষ বা সহবাসের কারণে), সেই কাপড় পরে কি ফরজ গোসল হবে?
প্রথম অংশ: বীর্য লেগে যাওয়া কাপড় দিয়ে গোসল করা
ফিকহি বিধান
ফরজ গোসলের মূল বিষয় হলো সম্পূর্ণ শরীরে পানি প্রবাহিত করা। গোসলে ব্যবহৃত কাপড় (গামছা, তোয়ালে) দ্বারা শরীর ডলার/মোছার বিধান শরীয়তে নেই; বরং গোসলের সময় হাত দিয়ে শরীরে পানি পৌঁছানোই মূল কাজ। তবে যদি কাপড়টি নাপাক (বীর্য লেগে থাকা) হয়, তাহলে সেই নাপাক কাপড় দিয়ে গোসল করা জায়েজ হবে না—কারণ নাপাক বস্তু দ্বারা পবিত্রতা অর্জন করা যায় না।
হ্যাঁ নাপাক কাপড় পরিহিত অবস্থায় গোসল করলে সেক্ষেত্রে গোসলের শেষে কাপড় খুলে পুরো শরীরে আবারো পানি ঢেলে ধুয়ে পাক করতে হবে। এবং উক্ত নাপাক কাপড় পাক করতে হবে।
মূলনীতি: নাপাক বস্তু (যেমন: বীর্য লেগে থাকা কাপড়) দ্বারা পবিত্রতা অর্জন করা শরীয়তে নিষিদ্ধ। গোসলের পানি ও গোসলের সরঞ্জাম পবিত্র হওয়া আবশ্যক।
দলিল
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَيُنَزِّلُ عَلَيْكُم مِّنَ السَّمَاءِ مَاءً لِّيُطَهِّرَكُم بِهِ "আর তিনি আকাশ থেকে তোমাদের উপর পানি বর্ষণ করেন, যাতে তোমাদেরকে তা দ্বারা পবিত্র করেন।" (সূরা আনফাল: ১১)
এই আয়াত প্রমাণ করে, পবিত্রতা অর্জনের মাধ্যম হতে হবে পবিত্র পানি। নাপাক কাপড় পবিত্রতার মাধ্যম হতে পারে না।
হানাফি কিতাবের বর্ণনা
রাদ্দুল মুহতার-এ ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) উল্লেখ করেন:
"الطهارة لا تحصل بالنجس، بل لا بد من الماء الطاهر المطهر" "নাপাক বস্তু দ্বারা পবিত্রতা হাসিল হয় না; বরং পবিত্র ও পবিত্রকারী পানি আবশ্যক।" (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুত তাহারাত)
ফাতাওয়া আলমগিরি-তে আছে:
"لو كان الثوب نجساً لا يجوز الاستعمال في الغسل، لأن النجس لا يطهر" "যদি কাপড় নাপাক হয়, তবে তা গোসলে ব্যবহার করা জায়েজ নয়; কারণ নাপাক বস্তু পবিত্র করে না।" (ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুত তাহারাত)
সমাধান
১. যদি কাপড়ে বীর্য লেগে থাকে → সেই কাপড় দিয়ে গোসল করা জায়েজ নয়। কারণ নাপাক কাপড় পবিত্রতার মাধ্যম হতে পারে না।
হ্যাঁ নাপাক কাপড় পরিহিত অবস্থায় গোসল করলে সেক্ষেত্রে গোসলের শেষে কাপড় খুলে পুরো শরীরে আবারো পানি ঢেলে ধুয়ে পাক করতে হবে। এবং উক্ত নাপাক কাপড় পাক করতে হবে।
২. কাপড়টি পবিত্র করার উপায়: বীর্য যদি শুকনো হয়, তবে খুঁটে ফেলা বা ঘষে ফেলা যথেষ্ট (হানাফি মাযহাব মতে, শুকনো বীর্য খুঁটে ফেললেই পবিত্র হয়ে যায়)। আর যদি ভিজা/তাজা হয়, তবে পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে।
৩. গোসলের জন্য: পবিত্র কাপড়/গামছা ব্যবহার করুন অথবা খালি হাত দিয়েই শরীরে পানি পৌঁছান। গোসলের জন্য কাপড় ব্যবহার করা আবশ্যক নয়।
দ্বিতীয় অংশ: নাপাক কাপড় পরিহিত অবস্থায় ফরজ গোসল
ফিকহি বিধান
প্রশ্ন হলো—যে কাপড় পরিহিত অবস্থায় শরীর নাপাক হয়েছে (যেমন: স্বপ্নদোষ বা সহবাস), সেই কাপড় পরে থাকা অবস্থায় ফরজ গোসল করলে গোসল হবে কি?
উত্তর: হ্যাঁ, গোসল হয়ে যাবে, তবে শর্ত হলো—
১. শরীরের প্রতিটি অঙ্গে পানি পৌঁছাতে হবে। কাপড় যদি এমনভাবে থাকে যে, পানি শরীরের কোনো অংশে পৌঁছাতে বাধা দেয়, তবে সেই অংশে পানি পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
২. কাপড়টি যদি নাপাক হয়, তবে কাপড়টি খুলে ফেলা বা পবিত্র কাপড় পরিধান করা উত্তম। তবে কাপড় পরিহিত অবস্থায় গোসল করলে গোসল বাতিল হবে না, যদি শরীরের সব অঙ্গে পানি পৌঁছে যায়।
৩. নাপাক কাপড় পরিহিত অবস্থায় গোসল করলে শরীর পবিত্র হবে, কিন্তু কাপড় নাপাক থাকলে কাপড় আলাদাভাবে পবিত্র করতে হবে।
দলিল
হাদিসে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত:
كَانَ النَّبِيُّ ﷺ إِذَا اغْتَسَلَ مِنَ الْجَنَابَةِ يَبْدَأُ فَيَغْسِلُ يَدَيْهِ، ثُمَّ يُفْرِغُ بِيَمِينِهِ عَلَى شِمَالِهِ فَيَغْسِلُ فَرْجَهُ... "নবী ﷺ যখন জানাবাতের গোসল করতেন, তখন প্রথমে দুই হাত ধুতেন, এরপর ডান হাত দিয়ে বাম হাতে পানি ঢেলে লজ্জাস্থান ধুতেন..." (সহিহ বুখারি: ২৪৮, সহিহ মুসলিম: ৩১৬)
এই হাদিসে দেখা যায়, নবী ﷺ গোসলের সময় কাপড় খুলে গোসল করতেন। তবে কাপড় পরিহিত অবস্থায় গোসল করলে যদি শরীরের সব অঙ্গে পানি পৌঁছে যায়, তবে গোসল সহিহ হবে।
হানাফি কিতাবের বর্ণনা
আল-হিদায়া-তে আছে:
"والغسل هو إفاضة الماء على البدن كله، فإذا وصل الماء إلى جميع البدن حصل الغسل" "গোসল হলো সমস্ত শরীরে পানি প্রবাহিত করা; যখন পানিটি সমস্ত শরীরে পৌঁছে যায়, তখন গোসল হয়ে যায়।" (আল-হিদায়া, কিতাবুত তাহারাত)
বাদায়েউস সানায়ে-তে উল্লেখ আছে:
"لا يشترط في الغسل خلع الثوب، بل إذا وصل الماء إلى البدن كله أجزأه" "গোসলে কাপড় খোলা শর্ত নয়; বরং যদি পানি সমস্ত শরীরে পৌঁছে যায়, তবে তা যথেষ্ট।" (বাদায়েউস সানায়ে, কিতাবুত তাহারাত)
সমাধান
১. নাপাক কাপড় পরিহিত অবস্থায় ফরজ গোসল: যদি কাপড় এত পাতলা হয় যে পানি শরীরে পৌঁছে যায়, তবে গোসল সহিহ হবে। তবে কাপড়টি নাপাক থাকলে গোসলের পর কাপড় পবিত্র করতে হবে।
২. যদি কাপড় মোটা হয় এবং পানি শরীরে পৌঁছাতে বাধা দেয়: তবে সেই কাপড় খুলে ফেলতে হবে বা এমনভাবে গোসল করতে হবে যাতে পানি সব অঙ্গে পৌঁছে যায়।
৩. উত্তম পদ্ধতি: নাপাক কাপড় খুলে ফেলে পবিত্র কাপড় পরিধান করে বা কাপড় ছাড়াই গোসল করা। এতে সন্দেহ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।
৪. সতর্কতা: গোসলের সময় কাপড় পরিহিত থাকলে শরীরের ভাঁজ, নাভি, বগল ইত্যাদি স্থানে পানি পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে।
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | বিধান | |------|-------| | বীর্য লেগে যাওয়া কাপড় দিয়ে গোসল | জায়েজ নয় (নাপাক বস্তু পবিত্রতার মাধ্যম নয়) | | শুকনো বীর্য লেগে থাকলে | খুঁটে ফেললেই কাপড় পবিত্র | | ভিজা বীর্য লেগে থাকলে | পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে | | নাপাক কাপড় পরিহিত অবস্থায় গোসল | গোসল সহিহ হবে, যদি সব অঙ্গে পানি পৌঁছে | | কাপড় মোটা হলে | খুলে ফেলা আবশ্যক | | উত্তম পদ্ধতি | পবিত্র কাপড় বা কাপড় ছাড়াই গোসল করা |
উপদেশ
গোসলের সময় সর্বদা পবিত্র কাপড়/গামছা ব্যবহার করুন। নাপাক কাপড় দিয়ে গোসল করা থেকে বিরত থাকুন। যদি কাপড়ে বীর্য লেগে যায়, তবে তা পবিত্র করে নিন।
হ্যাঁ নাপাক কাপড় পরিহিত অবস্থায় গোসল করলে সেক্ষেত্রে গোসলের শেষে কাপড় খুলে পুরো শরীরে আবারো পানি ঢেলে ধুয়ে পাক করতে হবে। এবং উক্ত নাপাক কাপড় পাক করতে হবে।
তথ্যসূত্র:
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন শামী)
- ফাতাওয়া আলমগিরি
- আল-হিদায়া (বুরহানুদ্দীন মারগিনানি)
- বাদায়েউস সানায়ে (কাসানি)
- ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী)
- সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম