স্বামী রাগের অবস্থায় "তুমি চলে যাও", "সকালে চলে যেও" বললে কি তালাক পতিত হয়?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 5837
Questioner: Saimoon Nesa Shathy
Question Asked: 22 Sep 2026, 10:08 PM
Reviewed & Published: 22 Sep 2026, 10:25 PM
Views: 30
Tokens: 5,338
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম,
স্বামী মন মেজাজ খারাপ অবস্থায় বলেছিলো বাধ্য হয়ে সংসার করছে। তখন স্ত্রী বলেছিলো, বাধ্য হয়ে সংসার করার কি দরকার। উত্তরে স্বামী বলেছে বাচ্চাকে রেখে সকালে চলে যেতে। এর পর স্ত্রী তখনই চলে যেতে চাইলে স্বামী বেশ কয়েকবার বলেছে সকালে চলে যেতে, রাতে বের হয়ে যেতে দেয়নি। এরপর স্ত্রী বারান্দা থেকে আর রুমে আসছিলোনা। তখন স্বামী বলেছেন, আমি তো আর তোমাকে তালাক দিয়ে দেই নি, এখন রুমে আসো। সকালে চলে যেও। এই যে বার বার চলে যাবার কথা বলেছে। এতে কী তাকাক উপনীত হয়েছে।
তুমি চলে যাও, সকালে চলে যেও। এইগুলা কি তালাকের সাথে সমার্থক ইসলামী পরিভাষায়? একটু দ্রুত জানালে ভালো হয়।
ওই রাতে স্বামী পরবর্তী এমন ব্যবহার এর জন্য অনেকবার ক্ষমাও চেয়েছে।

Answer

তালাক সংক্রান্ত প্রশ্নের বিস্তারিত উত্তর

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ

সংক্ষিপ্ত উত্তর

আপনার বর্ণিত ঘটনায় তালাক সংঘটিত হয়নি। স্বামী "তুমি চলে যাও", "সকালে চলে যেও" — এসব কথা বলেছে, যা তালাকের সুস্পষ্ট (সরীহ) শব্দ নয়। এগুলো কিনায়া (ইঙ্গিতমূলক) শব্দের অন্তর্ভুক্ত, আর কিনায়া শব্দ দ্বারা তালাক পতনের জন্য নিয়ত বা পরিস্থিতির দালালত শর্ত। যেহেতু স্বামী স্পষ্টভাবে বলেছে "আমি তো আর তোমাকে তালাক দেই নি", তাই তার নিয়ত তালাকের ছিল না — বরং এগুলো ছিল মন খারাপের অবস্থায় রাগের মাথায় বলা কথা। তাই কোনো তালাক পতিত হয়নি, এবং তাকাক (তালাকের জন্য অপেক্ষা) উপনীত হয়নি


বিস্তারিত দলিলসহ আলোচনা

১. তালাকের প্রকারভেদ: সরীহ ও কিনায়া

হানাফি ফিকহে তালাকের শব্দ দুই প্রকার:

(ক) সরীহ (স্পষ্ট) শব্দ: যেমন — "তালাক", "তালাক দিলাম", "তুমি তালাকপ্রাপ্তা" ইত্যাদি। এসব শব্দে নিয়ত ছাড়াই তালাক পতিত হয়।

(খ) কিনায়া (ইঙ্গিতমূলক) শব্দ: যেমন — "তুমি চলে যাও", "তোমার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই", "তুমি মুক্ত" ইত্যাদি। এসব শব্দে নিয়ত বা পরিস্থিতির দালালত ছাড়া তালাক পতিত হয় না।

আল-হিদায়া গ্রন্থে ইমাম মারগীনানী (রহ.) বলেন: "কিনায়া শব্দ দ্বারা তালাক পতিত হয় না, যতক্ষণ না নিয়ত বা দালালত (পরিস্থিতির প্রমাণ) থাকে।" (আল-হিদায়া, কিতাবুত তালাক, খণ্ড ২, পৃ. ৩৭০)

রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন শামী রহ.)-এ উল্লেখ আছে: "কিনায়া শব্দে তালাকের নিয়ত না থাকলে এবং দালালত না থাকলে তালাক পতিত হয় না।" (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃ. ২৯৮)

২. "তুমি চলে যাও" — এ শব্দের হুকুম

"তুমি চলে যাও", "সকালে চলে যেও" — এসব শব্দ তালাকের সরীহ শব্দ নয়। এগুলো সাধারণত ঘর ছেড়ে যাওয়া, বাপের বাড়ি যাওয়া বা আলাদা থাকার অর্থে ব্যবহৃত হয়। হানাফি ফিকহে এসব শব্দকে কিনায়া বলা হয়েছে।

ফাতাওয়া আলমগিরি-তে আছে: "যদি স্বামী বলে 'তুমি চলে যাও' বা 'তুমি যেখান থেকে এসেছ সেখানে চলে যাও' — তবে তা কিনায়া। নিয়ত ছাড়া তালাক পতিত হয় না।" (ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃ. ৩৭৫)

ফাতাওয়া উসমানি-তে মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) বলেন: "কিনায়া শব্দ দ্বারা তালাক পতনের জন্য নিয়ত বা দালালত জরুরি। শুধু 'চলে যাও' বললে তালাক হয় না।" (ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ২, পৃ. ৩১২)

৩. আপনার ঘটনার বিশ্লেষণ

আপনার বর্ণনায়:

  1. স্বামী রাগের অবস্থায় বলেছে "বাধ্য হয়ে সংসার করছে" — এটি তালাকের শব্দ নয়।
  2. স্ত্রী বলেছে "বাধ্য হয়ে সংসার করার কি দরকার" — এটিও তালাকের শব্দ নয়।
  3. স্বামী বলেছে "বাচ্চাকে রেখে সকালে চলে যেতে" — এটি কিনায়া শব্দ, তালাকের নিয়ত ছিল না।
  4. স্বামী বারবার বলেছে "সকালে চলে যেতে", "রাতে বের হতে দেয়নি" — এটি তালাকের ইচ্ছা নয়, বরং রাতের নিরাপত্তার কথা।
  5. স্বামী স্পষ্ট বলেছে: "আমি তো আর তোমাকে তালাক দেই নি, এখন রুমে আসো।" — এতে স্পষ্ট প্রমাণ হয় যে তার তালাকের নিয়ত ছিল না।
  6. স্বামী পরে অনেকবার ক্ষমা চেয়েছে — এটি আরও প্রমাণ করে যে তার উদ্দেশ্য তালাক ছিল না।

সুতরাং, এতে কোনো তালাক পতিত হয়নি। এবং যেহেতু তালাক হয়নি, তাই তাকাক (ইদ্দত/অপেক্ষা) উপনীত হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না

৪. রাগের অবস্থায় তালাকের হুকুম

রাগের অবস্থায় তালাক দিলেও তা পতিত হয়, যদি সরীহ শব্দ হয়। কিন্তু এখানে সরীহ শব্দই নেই, তাই রাগের বিষয়টি এখানে অপ্রাসঙ্গিক। তবে ইসলামে রাগের অবস্থায় তালাক দেওয়া নিন্দনীয়।

সুনানে আবু দাউদ-এ হাদিস আছে: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "রাগের অবস্থায় তালাক দেওয়া এবং রাগের অবস্থায় দাস মুক্ত করা — এগুলো নিন্দনীয়।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ২১৯২)

৫. করণীয়

  1. তালাক হয়নি — এ বিষয়ে নিশ্চিত থাকুন।
  2. স্বামী-স্ত্রী উভয়ের উচিত পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়ানো এবং রাগের মুহূর্তে ধৈর্য ধারণ করা।
  3. ভবিষ্যতে তালাকের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরীহ শব্দ ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকা, বিশেষ করে রাগের অবস্থায়।
  4. স্বামী ক্ষমা চেয়েছে — স্ত্রীর উচিত ক্ষমা করে দেওয়া এবং সংসারকে সুন্দরভাবে পরিচালনা করা।
  5. যদি কোনো সন্দেহ থাকে, তবে স্থানীয় মুফতি সাহেবের কাছে সরাসরি গিয়ে বিস্তারিত জানানো উত্তম।

সারসংক্ষেপ

| বিষয় | হুকুম | |------|-------| | "তুমি চলে যাও" | কিনায়া শব্দ — নিয়ত ছাড়া তালাক হয় না | | "সকালে চলে যেও" | কিনায়া শব্দ — তালাক হয় না | | তালাক পতিত হয়েছে? | না | | তাকাক/ইদ্দত? | প্রযোজ্য নয় | | করণীয় | ক্ষমা, বোঝাপড়া, ভবিষ্যতে সতর্কতা |


والله أعلم بالصواب

উত্তরটি হানাফি ফিকহের প্রামাণ্য গ্রন্থের ভিত্তিতে প্রস্তুত। সন্দেহ থাকলে স্থানীয় মুফতি সাহেবের সাথে সরাসরি পরামর্শ করুন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.