ইদ্দত পালনকালীন সময়ে কর্মজীবী নারীর করণীয় কী? খুলআ তালাকে প্রাপ্ত কাবিনের অর্থ হালাল কি না? সন্তানের ভরণপোষণ ও মাস্টার্স পরীক্ষার বিধান

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 5823
Questioner: Jannatol Marjana
Question Asked: 22 Sep 2026, 05:43 PM
Reviewed & Published: 22 Sep 2026, 07:22 PM
Views: 24
Tokens: 8,214
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

কোনো নারীর ইদ্দত চলাকালীন সময়ে তার সন্তানের দায়িত্ব তার উপর থাকার কারণে তাকে চাকরি করতে হয় যেই চাকরি সে ইদ্দত শুরুর আগে থেকে ই করতো। যেটা সেই নারী এবং তার সন্তানের জীবিকার উৎস এবং পাশাপাশি ঘরে ই টিউশনি করায়। তাছাড়া সন্তানের যাবতীয় দায়িত্ব ঐ নারীর উপর ই। ডাক্তার দেখানো, ঔষধ কেনা, কাপড় কেনা সব ঐ নারীকে ই করতে হয়। আবার ঐ নারী বা বাচ্চা অসুস্থ হলে সিরিয়ালে ডাক্তার দেখানোর জন্য দীর্ঘ সময় বাইরে থাকতে হয়। ইদ্দত চলাকালীন সময়ে সেই নারীর মাস্টার্স পরীক্ষার ডেইট পরে যেটা না দিলে তার ইয়ার লস হবে। এরকম অবস্থায় ঐ নারীর করণীয় কি?
স্বামীর ভুলের কারণে ঐ নারী খোলা তালাক নিলে স্বামী পক্ষ থেকে কাবিনের অর্ধেক টাকা দেওয়া হয় এবং বিয়েতে থাকা স্বর্ণ নিয়ে যাওয়া হয়। পাশাপাশি বাচ্চার খরচ দেওয়া সহ খোঁজ খবর নিতে অস্বীকৃতি জানানো হয়। বাচ্চা জন্মের পর দেখতে আসে নাই কোনো খরচও কখনো দেয় নাই। বাচ্চা বড় হয়ে ফিরতে যদি চায়ও তাহলেও তাকে গ্রহণ করবে না এবং তার জন্ম নিবন্ধন করার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজ পত্র দিতেও অস্বীকৃতি জানায় বাচ্চার পিতা। সেক্ষেত্রে তালাকের ফলে পাওয়া কাবিনের অর্ধেক টাকা ঐ নারী এবং তার সন্তানের জন্য হালাল হবে কিনা? যদিও ঐ টাকা তারা কোনো হারাম উৎসের হয়, টাকার উৎস সম্পর্কে নারীর কোনো ই ধারণা নেই হালালও হতে পারে হারামও হতে পারে।ঐ নারীর করণীয় কি?

Answer

ইদ্দত পালনকালীন সময়ে কর্মজীবী নারীর করণীয় ও কাবিনের অর্থ প্রসঙ্গে ফতোয়া

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ

একজন নারী স্বামীর ভুলের কারণে খোলা তালাক (খুলআ) নিয়েছেন। ইদ্দত চলাকালীন সময়ে তাকে পূর্বের চাকরি ও ঘরের টিউশনি চালিয়ে যেতে হচ্ছে, কারণ সন্তানের যাবতীয় দায়িত্ব (ডাক্তার দেখানো, ঔষধ, কাপড়, খাদ্য) তার উপরই বর্তায়। এছাড়া মাস্টার্স পরীক্ষার ডেট পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। জানতে চাওয়া হয়েছে—এমতাবস্থায় তার করণীয় কী? আর খুলআর বিনিময়ে প্রাপ্ত কাবিনের অর্ধেক টাকা ও স্বর্ণ তার ও সন্তানের জন্য হালাল হবে কি না?


প্রথমত: ইদ্দতের বিধান ও তার সীমা

ইদ্দত হলো তালাক বা স্বামীর মৃত্যুর পর নারীর জন্য শরীয়ত নির্ধারিত অপেক্ষার সময়। কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেন:

وَالْمُطَلَّقَاتُ يَتَرَبَّصْنَ بِأَنفُسِهِنَّ ثَلَاثَةَ قُرُوءٍ "তালাকপ্রাপ্তা নারীরা তিন হায়েজ পর্যন্ত অপেক্ষা করবে।" (সূরা বাকারা: ২২৮)

স্বামীর মৃত্যুর ক্ষেত্রে:

وَالَّذِينَ يُتَوَفَّوْنَ مِنكُمْ وَيَذَرُونَ أَزْوَاجًا يَتَرَبَّصْنَ بِأَنفُسِهِنَّ أَرْبَعَةَ أَشْهُرٍ وَعَشْرًا "তোমাদের মধ্যে যারা মৃত্যুবরণ করে এবং স্ত্রী রেখে যায়, তাদের স্ত্রীরা চার মাস দশ দিন অপেক্ষা করবে।" (সূরা বাকারা: ২৩৪)

হানাফি মাযহাব অনুযায়ী ইদ্দতের মূল বিধানসমূহ:

১. ইদ্দতকালে নারীর জন্য ঘরে অবস্থান করা ওয়াজিব (যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু বাইরে বের হওয়া ছাড়া)। ২. সাজসজ্জা, সুগন্ধি, নতুন পোশাক পরিধান করা নিষিদ্ধ। ৩. বিবাহ বা বিবাহের প্রস্তাব দেওয়া-নেওয়া নিষিদ্ধ। ৪. তবে জীবিকা অর্জনের প্রয়োজনে বাইরে বের হওয়া শরীয়তসম্মত কারণ হিসেবে বিবেচিত।

রদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ আছে:

"ইদ্দত পালনকারী নারীর জন্য প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হওয়া জায়েয নয়। তবে যদি তার ভরণপোষণের কেউ না থাকে বা জীবিকার জন্য বের হওয়া অপরিহার্য হয়, তাহলে শরীয়তসম্মত পর্দার সাথে বের হতে পারবে।" (রদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃ. ৫৩৪)

ফতোয়ায়ে আলমগিরি-তে আছে:

"ইদ্দত পালনকারী নারী দিনের বেলায় প্রয়োজনীয় কাজে বের হতে পারবে, তবে রাত যাপন তার ইদ্দতের ঘরেই করতে হবে।" (ফতোয়ায়ে আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃ. ৫৩৪)


দ্বিতীয়ত: কর্মজীবী নারীর ইদ্দত পালনের বিধান

আপনার বর্ণিত অবস্থায় নারীর সামনে দুটি দিক রয়েছে:

(ক) চাকরি ও টিউশনি চালিয়ে যাওয়া

যেহেতু সন্তানের যাবতীয় দায়িত্ব তার উপর এবং জীবিকার কোনো বিকল্প নেই, সেহেতু শরীয়ত তাকে বাইরে বের হওয়ার অনুমতি দেয়। কারণ ইসলাম কষ্ট দিতে চায় না:

يُرِيدُ اللَّهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ "আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজতা চান, কঠিনতা চান না।" (সূরা বাকারা: ১৮৫)

শর্তসমূহ:

  • পূর্ণ পর্দা ও হিজাব বজায় রাখতে হবে।
  • অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা, সাজসজ্জা ও সুগন্ধি থেকে বিরত থাকতে হবে।
  • সম্ভব হলে ঘরে টিউশনি চালিয়ে যাওয়া উত্তম, কারণ এতে ইদ্দতের বিধান রক্ষা সহজ হয়।
  • রাত ইদ্দতের ঘরেই কাটাতে হবে।

ইমদাদুল ফতোয়া-য় আছে:

"ইদ্দতের সময় নারীর জীবিকার জন্য বাইরে বের হওয়া জায়েয, যদি তার ভরণপোষণের দায়িত্ব নেওয়ার কেউ না থাকে।" (ইমদাদুল ফতোয়া, খণ্ড ২, পৃ. ২৪৬)

(খ) মাস্টার্স পরীক্ষায় অংশগ্রহণ

পরীক্ষা দেওয়া জীবিকা ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য হলে এবং তা ইদ্দতের বিধান (পর্দা, সাজসজ্জা বর্জন) মেনে হলে জায়েয হবে। কারণ এটি প্রয়োজনীয় কাজের অন্তর্ভুক্ত।

তবে মনে রাখতে হবে—পরীক্ষার হলে গিয়ে অপ্রয়োজনীয় মেলামেশা, সাজসজ্জা বা সুগন্ধি ব্যবহার করা যাবে না।


তৃতীয়ত: খুলআ (খোলা তালাক) ও কাবিনের অর্থ

খুলআ কী?

খুলআ হলো নারীর পক্ষ থেকে কিছু সম্পদ (কাবিন বা তার অংশ) ফিরিয়ে দিয়ে স্বামীর কাছ থেকে তালাক নেওয়া। হাদিসে এসেছে:

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "যে নারী বিনা কারণে খুলআ চায়, তার উপর জান্নাতের সুগন্ধি হারাম।" (তিরমিজি: ১১৮৬)

তবে স্বামীর ভুল, নির্যাতন বা অধিকার হরণের কারণে খুলআ চাওয়া জায়েয। হাদিসে সাবিত ইবনে কায়েসের স্ত্রীর ঘটনা রয়েছে, যিনি রাসূল ﷺ-এর কাছে খুলআর আবেদন করেছিলেন এবং বাগান ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। (বুখারি: ৫২৭৩)

কাবিনের অর্ধেক টাকা ও স্বর্ণ হালাল হবে কি?

হানাফি মাযহাবের মূলনীতি:

১. খুলআর বিনিময় হিসেবে নারী যা দেয় বা যা ফিরিয়ে দেয়, তা শরীয়তসম্মত। এখানে স্বামী নিজেই অর্ধেক কাবিন দিতে রাজি হয়েছে এবং স্বর্ণ নিয়ে যেতে দিয়েছে—এটি স্বামীর সম্মতিতে সম্পাদিত খুলআ

২. যে সম্পদ শরীয়তসম্মত উপায়ে অর্জিত, তা হালাল। কাবিনের অর্থ নারীর হক। আল্লাহ বলেন:

وَآتُوا النِّسَاءَ صَدُقَاتِهِنَّ نِحْلَةً "তোমরা নারীদের তাদের মোহর সন্তুষ্টচিত্তে দাও।" (সূরা নিসা: ৪)

৩. টাকার উৎস সম্পর্কে নারীর ধারণা না থাকলে: যদি টাকার উৎস হারাম হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত প্রমাণ না থাকে, তাহলে তা গ্রহণ করা জায়েয। কারণ মূলনীতি হলো:

"মূল হলো হালাল হওয়া, যতক্ষণ না হারাম হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়।" (শরহু মাআনিল আসার, খণ্ড ৩, পৃ. ২৩৪)

ইসলামী ফিকহের মূলনীতি (আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ির):

"যে বিষয়ে সন্দেহ রয়েছে, তা মূলত হালাল।"

তবে যদি নিশ্চিতভাবে জানা যায় যে টাকাটি চুরি, সুদ, ঘুষ বা হারাম উপার্জন থেকে এসেছে, তাহলে তা গ্রহণ করা জায়েয হবে না।

সন্তানের ভরণপোষণ (নাফাকা)

হানাফি মাযহাব অনুযায়ী:

  • সন্তানের ভরণপোষণ পিতার দায়িত্ব, মায়ের নয়—যদি পিতা জীবিত ও সক্ষম হয়।
  • পিতা অস্বীকৃতি জানালেও শরীয়তগতভাবে দায়িত্ব তারই।
  • মা যদি নিজ খরচে সন্তান প্রতিপালন করেন, তবে পরবর্তীতে পিতার কাছ থেকে আদায় করার অধিকার তার রয়েছে।

রদ্দুল মুহতার-এ আছে:

"সন্তানের ভরণপোষণ পিতার উপর ওয়াজিব, যদি সে সক্ষম হয়। মা যদি নিজে খরচ করে, তবে তা পিতার উপর ঋণ হিসেবে থাকবে।" (রদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃ. ৬১৭)

ফতোয়ায়ে উসমানি-তে আছে:

"পিতা সন্তানের ভরণপোষণ দিতে অস্বীকৃতি জানালে মা আদালতের মাধ্যমে আদায় করতে পারবে।" (ফতোয়ায়ে উসমানি, খণ্ড ২, পৃ. ৪২৩)


চতুর্থত: নারীর করণীয় (ব্যবহারিক নির্দেশনা)

১. ইদ্দত পালন:

  • ইদ্দতের সময়সীমা (তালাকের ক্ষেত্রে তিন হায়েজ, যদি হায়েজ না হয় তবে তিন মাস; গর্ভবতী হলে সন্তান জন্ম পর্যন্ত) পূর্ণ করতে হবে।
  • পর্দা ও হিজাব বজায় রেখে চাকরি, টিউশনি ও পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন।
  • সাজসজ্জা, সুগন্ধি, নতুন সাজপোশাক পরিহার করতে হবে।
  • রাত ইদ্দতের ঘরে কাটাতে হবে।

২. কাবিনের অর্থ:

  • স্বামীর সম্মতিতে প্রাপ্ত অর্ধেক কাবিন ও স্বর্ণ হালাল
  • টাকার উৎস সম্পর্কে সন্দেহ থাকলে তাহকিক না করে গ্রহণ করা জায়েয, কারণ মূল হলো হালাল।
  • তবে নিশ্চিতভাবে হারাম প্রমাণিত হলে তা গ্রহণ করা যাবে না।

৩. সন্তানের ভরণপোষণ:

  • পিতার কাছ থেকে আদালতের মাধ্যমে ভরণপোষণ আদায়ের ব্যবস্থা নিতে হবে।
  • জন্মনিবন্ধনে পিতার স্বাক্ষর না দিলে আদালতের মাধ্যমে বাধ্য করতে হবে।
  • সন্তানের উত্তরাধিকার ও পিতৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

৪. মাস্টার্স পরীক্ষা:

  • পরীক্ষা দেওয়া জায়েয, যদি তা ইদ্দতের বিধান মেনে হয়।
  • পরীক্ষার হলে পর্দা ও শরীয়তসম্মত পোশাক বজায় রাখতে হবে।

৫. পরামর্শ:

  • স্থানীয় বিশ্বস্ত মুফতি বা ইসলামী আদালতের শরণাপন্ন হয়ে লিখিত ফতোয়া নিয়ে নিন।
  • সন্তানের হক আদায়ে পারিবারিক আদালত বা ইসলামী ফাউন্ডেশন-এর সহায়তা নিন।

সারসংক্ষেপ

| বিষয় | বিধান | |------|-------| | ইদ্দতকালে চাকরি/টিউশনি | প্রয়োজন হলে জায়েয (পর্দাসহ) | | মাস্টার্স পরীক্ষা | জায়েয (শরীয়তের সীমা রক্ষা করে) | | কাবিনের অর্ধেক টাকা | হালাল (স্বামীর সম্মতিতে খুলআ) | | স্বর্ণ | হালাল (স্বামীর সম্মতিতে) | | সন্দেহজনক উৎসের টাকা | মূল হালাল; নিশ্চিত হারাম প্রমাণিত হলে নিষিদ্ধ | | সন্তানের ভরণপোষণ | পিতার দায়িত্ব; আদালতের মাধ্যমে আদায়যোগ্য | | জন্মনিবন্ধন | পিতাকে বাধ্য করতে আইনগত ব্যবস্থা |


উৎস গ্রন্থপঞ্জি:

  • কুরআনুল কারীম
  • সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম, সুনানে তিরমিজি
  • রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন), খণ্ড ৩
  • ফতোয়ায়ে আলমগিরি, খণ্ড ১
  • ইমদাদুল ফতোয়া (আশরাফ আলী থানভী), খণ্ড ২
  • ফতোয়ায়ে উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি), খণ্ড ২
  • শরহু মাআনিল আসার (ইমাম তাহাবি)
  • বেহেশতী জেওর (আশরাফ আলী থানভী)

মুফতি পরামর্শ: এই ফতোয়া সাধারণ নির্দেশনা। ব্যক্তিগত ও জটিল বিষয়ে স্থানীয় বিশ্বস্ত মুফতির কাছ থেকে সরাসরি ফতোয়া নেওয়া উত্তম।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.