তাকদির দুর্ভাগা হলে কী আমল করতে হবে? এবং তাকদির ভালো হওয়ার জন্য কীভাবে আল্লাহর কাছে দুআ করতে হবে?
Faith and Belief · Hanafi
Question
Answer
তাকদির দুর্ভাগা হলে কী আমল করব এবং তাকদির ভালো হওয়ার জন্য দুআ
ভূমিকা
প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাকদির (ভাগ্য) সম্পর্কে ইসলামের আকিদা হলো—আল্লাহ তা'আলা সবকিছু আগেই জানেন এবং লিখে রেখেছেন, তবে বান্দার দুআ, আমল ও তাওবার মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা তাকদির পরিবর্তন করতে পারেন। এটি কুরআন ও হাদিসে সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে।
১. তাকদির সম্পর্কে সঠিক আকিদা
আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
"আল্লাহ যা চান তা মুছে দেন এবং যা চান তা প্রতিষ্ঠিত রাখেন; আর তাঁর কাছেই রয়েছে মূল কিতাব (লাওহে মাহফুজ)।" — (সূরা আর-রাদ: ৩৯)
হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"দুআ ছাড়া অন্য কিছু তাকদির পরিবর্তন করতে পারে না, এবং নেক আমল ছাড়া অন্য কিছু আয়ু বাড়াতে পারে না।" — (তিরমিজি: ২১৩৯, ইবনে মাজাহ: ৯০)
ব্যাখ্যা: এখানে দুআ ও নেক আমল দ্বারা তাকদির পরিবর্তন বলতে বোঝানো হয়েছে—আল্লাহর কাছে আগেই লিখিত "শর্তসাপেক্ষ তাকদির" (তাকদিরে মুআল্লাক)। অর্থাৎ আল্লাহ জানেন যে, অমুক ব্যক্তি দুআ করলে তার অবস্থা ভালো হবে, না করলে খারাপ হবে। সুতরাং দুআ করা আমাদের দায়িত্ব।
২. তাকদির ভালো হওয়ার জন্য করণীয় আমল
(ক) পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ যথাযথভাবে আদায় করা
"নিশ্চয়ই সালাত অশ্লীলতা ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।" — (সূরা আল-আনকাবুত: ৪৫)
(খ) বেশি বেশি তাওবা ও ইস্তিগফার করা
"আমি বললাম, তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো; নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের জন্য আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দ্বারা তোমাদের সাহায্য করবেন..." — (সূরা নূহ: ১০-১২)
(গ) তাহাজ্জুদের নামাজ ও দুআ
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"রাতের শেষ প্রহরে আল্লাহ তা'আলা দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন এবং বলেন: কে আছে যে আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব? কে আছে যে আমার কাছে চাইবে, আমি তাকে দান করব? কে আছে যে ক্ষমা চাইবে, আমি তাকে ক্ষমা করব?" — (বুখারি: ১১৪৫, মুসলিম: ৭৫৮)
(ঘ) সূরা ইয়াসিন, সূরা ওয়াকিয়া, সূরা মুলক তিলাওয়াত
বিশেষ করে সূরা ইয়াসিনকে "হৃদয়ের হৃদয়" বলা হয় এবং বিপদ-আপদ দূর করার জন্য পড়ার নির্দেশ হাদিসে এসেছে।
(ঙ) দরুদ শরিফ বেশি পড়া
"যে ব্যক্তি আমার উপর একবার দরুদ পাঠ করে, আল্লাহ তার উপর দশবার রহমত পাঠান।" — (মুসলিম: ৪০৮)
(চ) সদকা করা
"সদকা বালা-মুসিবত দূর করে এবং আয়ু বাড়ায়।" — (বায়হাকি, শুআবুল ঈমান)
(ছ) আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা
"যে ব্যক্তি চায় তার রিজিক প্রশস্ত হোক এবং আয়ু দীর্ঘ হোক, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে।" — (বুখারি: ৫৯৮৬)
৩. তাকদির ভালো হওয়ার জন্য বিশেষ দুআ
দুআ-১: হাসানুল খাতিমার দুআ
اللَّهُمَّ أَصْلِحْ لِي دِينِي الَّذِي هُوَ عِصْمَةُ أَمْرِي، وَأَصْلِحْ لِي دُنْيَايَ الَّتِي فِيهَا مَعَاشِي، وَأَصْلِحْ لِي آخِرَتِي الَّتِي فِيهَا مَعَادِي
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা আসলিহ লি দ্বীনিয়া আল্লাযী হুয়া ইসমাতু আমরি, ওয়া আসলিহ লি দুনইয়ায়া আল্লাযী ফীহা মাআশি, ওয়া আসলিহ লি আখিরাতিয়া আল্লাযী ফীহা মাআদি।
অর্থ: হে আল্লাহ! আমার দ্বীনকে সংশোধন করে দাও, যা আমার সব কাজের রক্ষাকবচ। আমার দুনিয়াকে সংশোধন করে দাও, যাতে আমার জীবন-জীবিকা রয়েছে। আমার আখিরাতকে সংশোধন করে দাও, যেখানে আমার প্রত্যাবর্তন।
— (মুসলিম: ২৭২০)
দুআ-২: কল্যাণের তাকদির প্রার্থনা
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ مِنَ الْخَيْرِ كُلِّهِ، عَاجِلِهِ وَآجِلِهِ، مَا عَلِمْتُ مِنْهُ وَمَا لَمْ أَعْلَمْ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নী আসআলুকা মিনাল খাইরি কুল্লিহি, আজিলিহি ওয়া আজিলিহি, মা আলিমতু মিনহু ওয়া মা লাম আ'লাম।
অর্থ: হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে সব কল্যাণ প্রার্থনা করি—যা তাৎক্ষণিক ও যা বিলম্বিত, যা আমি জানি ও যা আমি জানি না।
— (ইবনে মাজাহ: ৩৮৪৬)
দুআ-৩: তাকদিরের অনিষ্ট থেকে আশ্রয়
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ سُوءِ الْقَضَاءِ، وَمِنْ دَرَكِ الشَّقَاءِ، وَمِنْ شَمَاتَةِ الْأَعْدَاءِ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নী আউযু বিকা মিন সূইল কাদা, ওয়া মিন দারাকিশ শাকাই, ওয়া মিন শামাতাতিল আ'দা।
অর্থ: হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে মন্দ তাকদির থেকে, দুর্ভাগ্য থেকে এবং শত্রুর উপহাস থেকে আশ্রয় চাই।
— (মুসলিম: ২৭০৭)
দুআ-৪: ইস্তিখারা ও হিদায়াতের দুআ
اللَّهُمَّ اهْدِنِي فِيمَنْ هَدَيْتَ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাহদিনী ফীমান হাদাইত।
অর্থ: হে আল্লাহ! যাদের আপনি হিদায়াত দিয়েছেন, তাদের মধ্যে আমাকেও হিদায়াত দিন।
— (তিরমিজি: ৪৬৪)
৪. তাকদির দুর্ভাগা হলে করণীয় (ধাপে ধাপে)
| ধাপ | আমল | ফজিলত | |-----|------|--------| | ১ | পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতে আদায় | তাকদিরের কল্যাণ | | ২ | প্রতিদিন ১০০ বার ইস্তিগফার | গুনাহ মাফ, রিজিক বৃদ্ধি | | ৩ | প্রতিদিন ১০০ বার দরুদ | দুশ্চিন্তা দূর | | ৪ | প্রতিদিন সদকা (অল্প হলেও) | বালা দূর, আয়ু বৃদ্ধি | | ৫ | তাহাজ্জুদে দুআ | দুআ কবুলের শ্রেষ্ঠ সময় | | ৬ | সূরা ইয়াসিন, ওয়াকিয়া, মুলক তিলাওয়াত | বিপদ দূর | | ৭ | আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা | রিজিক ও আয়ু বৃদ্ধি | | ৮ | হালাল উপার্জন ও হারাম বর্জন | দুআ কবুলের শর্ত | | ৯ | অভাবীদের সাহায্য | আল্লাহর সাহায্য লাভ | | ১০ | সবসময় আল্লাহর উপর ভরসা (তাওয়াক্কুল) | অন্তরের শান্তি |
৫. হানাফি ফিকহের আলোকে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার" গ্রন্থে উল্লেখ করেন:
দুআ ও সদকা তাকদিরে মুআল্লাক (শর্তসাপেক্ষ তাকদির) পরিবর্তন করে। আর তাকদিরে মুবারাম (চূড়ান্ত) কেবল আল্লাহর ইলমে পরিবর্তন হয় না, তবে বান্দার দুআ তার জন্য কল্যাণের কারণ হয়।
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) "ফাতাওয়া উসমানি"তে বলেন:
তাকদিরে বিশ্বাস রাখা ঈমানের অংশ, কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে দুআ ও আমল ছেড়ে দিতে হবে। বরং দুআ ও আমল করা আমাদের দায়িত্ব, আর ফলাফল আল্লাহর হাতে।
আশরাফ আলী থানভি (রহ.) "বাহিশতী জেওর"-এ লিখেন:
প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা এই দুআ পড়া উচিত: بِسْمِ اللهِ الَّذِي لَا يَضُرُّ مَعَ اسْمِهِ شَيْءٌ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ (যা পড়লে সকাল-সন্ধ্যা কোনো ক্ষতি হয় না)
৬. উপসংহার
তাকদির দুর্ভাগা হলে হতাশ হওয়া যাবে না। বরং:
- তাওবা ও ইস্তিগফার বাড়িয়ে দিতে হবে
- নামাজ ও দুআ যথাযথভাবে আদায় করতে হবে
- সদকা ও নেক আমল বাড়াতে হবে
- আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল রাখতে হবে
- হালাল উপার্জন ও হারাম বর্জন করতে হবে
মনে রাখবেন, আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"আর যখন আমার বান্দারা আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, (বলো) আমি তো নিকটেই; আমি দুআকারীর ডাকে সাড়া দিই যখন সে আমাকে ডাকে।" — (সূরা আল-বাকারা: ১৮৬)
আল্লাহ তা'আলা আমাদের সবাইকে সঠিক আকিদা ও নেক আমলের তাওফিক দান করুন। আমিন।