তাকদির দুর্ভাগা হলে কী করতে হবে? তাকদির কি পরিবর্তন হয়? কুরআন-হাদিস ও হানাফি ফিকহের আলোকে তাকদির ভালো করার আমল সম্পর্কে জানতে চাই?
Faith and Belief · Hanafi
Question
Answer
তাকদির দুর্ভাগা হলে কী করব? — তাকদির কি পরিবর্তন করা যায়?
প্রশ্ন: আমার তাকদির দুর্ভাগা। তাকদির যদি খারাপ হয়, সেই তাকদির ভালো করার জন্য কী আমল করতে পারি? কীভাবে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে পারি তাকদির ভালোর জন্য?
উত্তর:
প্রথমে একটি গুরুত্বপূর্ণ আকিদা (বিশ্বাস) জেনে নিন
তাকদির আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে নির্ধারিত। তিনি লাওহে মাহফুজে সবকিছু লিখে রেখেছেন। কিন্তু এটা মনে করা ভুল যে, তাকদির খারাপ হলে তা কখনোই পরিবর্তন হবে না এবং আমলের কোনো প্রভাব নেই। বরং আমল, দোয়া, তওবা ও দান-সদকা তাকদিরকে পরিবর্তন করতে পারে — এটি কুরআন ও হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَمْحُو اللَّهُ مَا يَشَاءُ وَيُثْبِتُ ۖ وَعِندَهُ أُمُّ الْكِتَابِ
"আল্লাহ যা চান মুছে দেন এবং যা চান বহাল রাখেন; আর তাঁর কাছেই আছে উম্মুল কিতাব (মূল কিতাব)।" — (সূরা আর-রাদ: ৩৯)
আর রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَا يَرُدُّ الْقَضَاءَ إِلَّا الدُّعَاءُ، وَلَا يَزِيدُ فِي الْعُمْرِ إِلَّا الْبِرُّ
"দোয়া ছাড়া কোনো কিছু তাকদিরকে ফিরাতে পারে না, এবং নেকি ছাড়া আয়ু বাড়ে না।" — (তিরমিজি: ২১৩৯, ইবনে মাজাহ: ৯০; হাসান)
অর্থাৎ তাকদির দু'ভাগে বিভক্ত:
- তাকদিরে মুবরাম (অপরিবর্তনীয়) — যা আল্লাহ চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করেছেন, তা হবে-ই।
- তাকদিরে মুআল্লাক (শর্তসাপেক্ষ) — যা আমল, দোয়া ও সদকার মাধ্যমে পরিবর্তিত হতে পারে।
তাই হতাশ হওয়ার কিছু নেই; বরং আমল বাড়িয়ে দিন।
তাকদির ভালো করার জন্য করণীয় আমলসমূহ
১. তওবা ও ইস্তেগফার বেশি বেশি করা
গুনাহই দুর্ভাগ্য ও বিপদ ডেকে আনে। আল্লাহ বলেন:
وَمَا أَصَابَكُم مِّن مُّصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ
"তোমাদের উপর যে বিপদ আসে, তা তোমাদের নিজেদের কৃতকর্মের কারণেই।" — (সূরা শূরা: ৩০)
রাসূল ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি ইস্তেগফারকে অভ্যাস বানায়, আল্লাহ তার সব সংকট দূর করে দেন এবং দুশ্চিন্তাকে আনন্দে পরিবর্তন করে দেন। (আবু দাউদ: ১৫১৮)
২. পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ যথাযথভাবে আদায় করা
নামাজ তাকদির বদলানোর সবচেয়ে বড় মাধ্যম। আল্লাহ বলেন:
وَاسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ
"ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো।" — (সূরা বাকারা: ৪৫)
৩. বেশি বেশি দোয়া করা (বিশেষত তাহাজ্জুদের সময়)
রাতের শেষ প্রহরে আল্লাহ বান্দার ডাকে সাড়া দেন। রাসূল ﷺ বলেছেন, আল্লাহ প্রতি রাতে নিকট আসমানে নেমে আসেন এবং বলেন: "কে আছে যে আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব?" (বুখারি: ১১৪৫)
৪. দান-সদকা করা
সদকা বিপদ দূর করে এবং তাকদির পরিবর্তন করে। রাসূল ﷺ বলেছেন:
الصَّدَقَةُ تُطْفِئُ الْخَطِيئَةَ كَمَا يُطْفِئُ الْمَاءُ النَّارَ
"সদকা গুনাহকে এমনভাবে নিভিয়ে দেয় যেমন পানি আগুন নিভিয়ে দেয়।" — (তিরমিজি: ২৬১৬)
৫. আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা (সিলাতুর রাহিম)
রাসূল ﷺ বলেছেন, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা আয়ু বাড়ায় এবং রিযিক প্রশস্ত করে। (বুখারি: ৫৯৮৬)
৬. সবরের সাথে বিপদ মোকাবিলা করা
মনে রাখবেন, মুমিনের জন্য প্রতিটি কষ্টই হয় গুনাহের কাফফারা, নয়তো মর্যাদা বৃদ্ধির কারণ। রাসূল ﷺ বলেছেন:
عَجَبًا لِأَمْرِ الْمُؤْمِنِ، إِنَّ أَمْرَهُ كُلَّهُ خَيْرٌ
"মুমিনের ব্যাপার আশ্চর্যজনক! তার সব অবস্থাই কল্যাণকর।" — (মুসলিম: ২৯৯৯)
৭. কুরআন তিলাওয়াত ও যিকির বাড়ানো
বিশেষত সূরা ইয়াসিন, সূরা ওয়াকিয়া, আয়াতুল কুরসি এবং সকাল-সন্ধ্যার মাসনুন যিকিরগুলো নিয়মিত পড়া।
৮. হালাল রুজির চেষ্টা ও হারাম বর্জন
হারাম উপার্জন দুর্ভাগ্য ডেকে আনে। হালাল রুজির চেষ্টা করুন এবং আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন।
দোয়া যা তাকদির পরিবর্তনে সহায়ক
রাসূল ﷺ শিখিয়েছেন এই দোয়া:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ مُنْكَرَاتِ الْأَخْلَاقِ وَالْأَعْمَالِ وَالْأَهْوَاءِ وَالْأَدْوَاءِ
"হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে মন্দ চরিত্র, মন্দ আমল, মন্দ প্রবৃত্তি ও মন্দ রোগ থেকে আশ্রয় চাই।" — (তিরমিজি: ৩৫৯১)
আরও পড়ুন:
اللَّهُمَّ أَصْلِحْ لِي دِينِي الَّذِي هُوَ عِصْمَةُ أَمْرِي، وَأَصْلِحْ لِي دُنْيَايَ الَّتِي فِيهَا مَعَاشِي، وَأَصْلِحْ لِي آخِرَتِي الَّتِي فِيهَا مَعَادِي
"হে আল্লাহ! আমার দ্বীনকে সংশোধন করে দিন যা আমার সব কাজের রক্ষক; আমার দুনিয়াকে সংশোধন করুন যাতে আমার জীবন-জীবিকা; এবং আমার আখিরাতকে সংশোধন করুন যেখানে আমার প্রত্যাবর্তন।" — (মুসলিম: ২৭২০)
হানাফি ফিকহের আলোকে গুরুত্বপূর্ণ নোট
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) তাঁর বিখ্যাত কিতাব রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেছেন যে, দোয়া ও সদকা তাকদিরে মুআল্লাককে পরিবর্তন করে — এটি আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের সর্বসম্মত আকিদা। (রাদ্দুল মুহতার: ১/৫৬)
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) তাঁর ফাতাওয়া উসমানি-তে বলেন: "তাকদিরে বিশ্বাস রাখা ফরজ, কিন্তু এর মানে এই নয় যে চেষ্টা-প্রচেষ্টা ছেড়ে দেওয়া। বরং আল্লাহর নির্দেশিত উপায়ে আমল করা এবং দোয়া করা বান্দার দায়িত্ব।" (ফাতাওয়া উসমানি: ১/১৩৫)
হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভি (রহ.) বেহেশতী জেওর-এ বলেন: "দুশ্চিন্তা ও বিপদে পড়লে ইস্তেগফার, দরুদ ও সদকা বেশি বেশি করতে হবে; এগুলো তাকদিরের কঠিন অংশকে সহজ করে দেয়।" (বেহেশতী জেওর: ১ম খণ্ড)
সারসংক্ষেপ
| করণীয় | প্রমাণ | |---|---| | তওবা ও ইস্তেগফার | সূরা শূরা: ৩০; আবু দাউদ: ১৫১৮ | | নামাজ ও তাহাজ্জুদ | সূরা বাকারা: ৪৫; বুখারি: ১১৪৫ | | দান-সদকা | তিরমিজি: ২৬১৬ | | দোয়া | তিরমিজি: ২১৩৯ | | আত্মীয়তার সম্পর্ক | বুখারি: ৫৯৮৬ | | সবর ও কুরআন তিলাওয়াত | মুসলিম: ২৯৯৯ |
মনে রাখবেন: তাকদিরকে "দুর্ভাগা" বলে হতাশ হওয়া শয়তানের কুমন্ত্রণা। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া হারাম। বরং আপনি আমল, দোয়া ও তওবা দিয়ে আল্লাহর কাছে ফিরে আসুন — তিনি তাকদিরকে আপনার জন্য কল্যাণকর করে দেবেন, ইনশাআল্লাহ।
والله أعلم بالصواب