বাবা মার সাথে সম্পর্ক রাখলে স্বামী তালাক দিবে

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 5757
Questioner: RUHI CHOWDHURY
Question Asked: 21 Sep 2026, 11:31 AM
Reviewed & Published: 21 Sep 2026, 12:03 PM
Views: 10
Tokens: 11,050
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ।

আমি বর্তমানে অনেক মানসিক চাপের মধ্যে আছি। আমার বাবা-মা আমার শ্বশুরবাড়ির এলাকায় গিয়ে কয়েকজনের কাছ থেকে বিদেশে নেওয়ার কথা বলে টাকা নিয়েছিলেন। তাদের বিদেশে পাঠানোর জন্য যে এজেন্টের মাধ্যমে কাজটি হওয়ার কথা ছিল, পরবর্তীতে জানা যায় সেই এজেন্টই প্রতারণা করেছে এবং টাকা নিয়ে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে।

আমার স্বামী শুরু থেকেই আমার বাবাকে বারবার নিষেধ করেছিলেন এবং সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু আমার বাবা তার কথা শোনেননি। বরং তিনি সবাইকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে, যদি ওই এজেন্টের মাধ্যমে তাদের বিদেশে পাঠাতে না পারেন, তাহলে তিনি নিজেই সবার টাকা ফেরত দেবেন। এখন যেহেতু এজেন্ট প্রতারণা করেছে, আমার বাবা সেই টাকা ফেরত দিতে পারছেন না।

এর ফলে আমার বাবার প্রতি এবং একইসঙ্গে আমার স্বামী ও তার পরিবারের প্রতিও আমার শ্বশুরবাড়ির এলাকার মানুষের মধ্যে অনেক ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তারা বিভিন্নভাবে আমার স্বামী ও তার পরিবারকে অপমান করছেন এবং নানা কথা বলছেন। বিষয়টি আমার স্বামীর জন্যও খুব কষ্টদায়ক ও অপমানজনক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই পরিস্থিতির কারণে আমার স্বামী আমার বাবা-মায়ের সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছেন এবং তাদের ফোন নম্বরও ব্লক করে রেখেছেন। একইসঙ্গে তিনি আমার সঙ্গেও এমন কথা বলেছেন যে, আমি যদি তার অজান্তে লুকিয়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলি, তাহলে আমাদের সম্পর্ক থাকবে না এবং আমাদের ডিভোর্স হয়ে যাবে। আর যদি তার অনুমতি নিয়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলতে চাই, তাহলে তিনি আমাকে দেশে পাঠিয়ে দেওয়ার কথা বলেন।

আরেকটি বিষয় আমাকে খুব কষ্ট দেয়—টাকা লেনদেনের সময় যখন আমার বাবা-মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়, তখন তারাও অন্য কোনো নম্বর, আত্মীয়স্বজন বা অন্য কোনো মাধ্যমে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেননি। এখন প্রায় এক বছর হয়ে গেছে, কিন্তু তারা এখনও আমার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেননি।

আমার বিয়ে হয়েছে মাত্র তিন বছর। আমার স্বামী বর্তমানে আমার ভরণপোষণ ঠিকমতো দেন এবং সংসারের দায়িত্বও পালন করেন। কিন্তু এই পুরো পরিস্থিতির কারণে আমি খুব দ্বিধা ও মানসিক চাপে আছি।

আমি বুঝতে পারছি যে আমার বাবার সিদ্ধান্তের কারণে আমার স্বামী ও তার পরিবার বাস্তবেই অনেক সমস্যার মধ্যে পড়েছেন। আবার একইসঙ্গে আমি তো তাদের মেয়ে—তাই বাবা-মায়ের সঙ্গে সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে থাকা এবং তাদের সঙ্গে কথা বললেই সংসার ভেঙে যাওয়ার হুমকি পাওয়াটাও আমার জন্য অত্যন্ত কষ্টকর।

এ অবস্থায় আমার কী করা উচিত? কীভাবে আমি আমার স্বামীর কষ্ট ও সম্মানকে বিবেচনায় রেখে, আবার বাবা-মায়ের সঙ্গে আমার সম্পর্কটাও পুরোপুরি নষ্ট না করে এই পরিস্থিতি সামলাতে পারি? আমি চাই না আমার সংসার ভেঙে যাক, আবার বাবা-মায়ের সঙ্গে সম্পর্কও একেবারে শেষ হয়ে যাক।

Answer

উত্তর

সংক্ষিপ্ত উত্তর: ইসলামে স্ত্রীর উপর স্বামীর আনুগত্য (তা'আত) ফরজ, তবে পিতা-মাতার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা বা তাদের সঙ্গে কথা বলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার অধিকার স্বামীর নেই। পিতা-মাতার সঙ্গে কথা বলার সাথে যেহেতু তালাককে সম্পর্ক যুক্ত করা হয়েছে, তাই কথা বলার সাথে সাথেই এক তালাক পতিত হয়ে যাবে। যদিও তালাক দেওয়ার হুমকি শরিয়তের দৃষ্টিতে একটি অন্যায় ও গর্হিত কাজ; তথাপিও তালাক পতিত হবে।


বিস্তারিত আলোচনা

১. স্ত্রীর উপর স্বামীর আনুগত্য ও পিতা-মাতার হক

ইসলামে বিবাহিত নারীর জন্য স্বামীর আনুগত্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«لَوْ كُنْتُ آمِرًا أَحَدًا أَنْ يَسْجُدَ لِأَحَدٍ لَأَمَرْتُ الْمَرْأَةَ أَنْ تَسْجُدَ لِزَوْجِهَا» — সুনানে তিরমিজি: ১১৫৯; সুনানে আবু দাউদ: ২১৪০

তবে এই আনুগত্য শরিয়তের সীমার ভেতরে। শরিয়তবিরোধী বা পিতা-মাতার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার আদেশে আনুগত্য করা ফরজ নয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«لَا طَاعَةَ لِمَخْلُوقٍ فِي مَعْصِيَةِ الْخَالِقِ» — মুসনাদে আহমাদ; সহীহুল জামি: ৭৫২০

আর পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার ও সম্পর্ক রক্ষা করা কুরআনের সরাসরি নির্দেশ:

«وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا» — সূরা বনী ইসরাইল: ২৩

«وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ» — সূরা নিসা: ১

ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেন যে, স্বামী স্ত্রীকে তার পিতা-মাতার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে বাধ্য করতে পারে না; এটি শরিয়তবিরোধী আদেশ। (রাদ্দুল মুহতার: ৩/১৪০ প্রসঙ্গ)

২. স্বামীর হুমকি সম্পর্কে

স্বামী যদি বলে—"তুমি পিতা-মাতার সঙ্গে কথা বললে তালাক হয়ে যাবে"—এটি তা'লীকুত তালাক (শর্তসাপেক্ষ তালাক) হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে:

  • শর্ত পূরণ হলেই তালাক পতিত হয়, শুধু হুমকিতে নয়।
  • তবে শর্তটি নিজেই শরিয়তবিরোধী ও জুলুমপূর্ণ। ফকিহগণ বলেন, শরিয়তবিরোধী শর্তে তালাক সংঘটিত হওয়া নিয়ে মতভেদ থাকলেও, স্ত্রীর জন্য এমন শর্ত এড়িয়ে চলাই ইহতিয়াত (সতর্কতা)।
  • ফতোয়া উসমানিইমদাদুল ফতোয়া-তে স্পষ্ট আছে—পিতা-মাতার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার শর্তে তালাক দেওয়া বা দেওয়ানোর হুমকি দেওয়া নাজায়েজ ও গুনাহের কাজ

৩. আপনার করণীয় (ধাপে ধাপে)

ক. স্বামীর সঙ্গে সৎ ও প্রকাশ্য আলোচনা

  • গোপনে কিছু করবেন না। গোপনীয়তা সন্দেহ বাড়ায় এবং শর্ত পূরণের আশঙ্কা তৈরি করে।
  • স্বামীকে বলুন: "আমি আপনাকে ভালোবাসি, আপনার সম্মান আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পিতা-মাতার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা ইসলামে নিষিদ্ধ। আমি চাই আপনার অনুমতি ও জ্ঞাতসারেই তাদের সঙ্গে সীমিত যোগাযোগ রাখি।"

খ. সীমিত ও শালীন যোগাযোগ

  • মাসে এক-দুইবার ফোনে সালাম-কুশল বিনিময়, অসুস্থতায় খোঁজ নেওয়া—এটুকু ইসলামি দায়িত্ব।
  • টাকা-পয়সার লেনদেন বা বাবার দায়িত্ব নিজের কাঁধে নেওয়া থেকে বিরত থাকুন; এটি স্বামীর সাথে দ্বন্দ্ব বাড়াবে।

গ. মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ

  • উভয় পরিবারের বিশ্বস্ত, ধর্মপরায়ণ ও প্রভাবশালী কাউকে (যেমন ইমাম, মুফতি, সম্মানিত আত্মীয়) মধ্যস্থতাকারী করুন।
  • মা'আরিফুল কুরআন-এ সূরা নিসার ৩৫ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যায় হাকাম (মধ্যস্থতাকারী) নিয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ঘ. বাবার দায়িত্ব সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা

  • আপনার বাবা নিজে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন টাকা ফেরত দেওয়ার—এটি তার নৈতিক ও শরিয়তসম্মত দায়। তবে আপনি তার ঋণ পরিশোধের জন্য বাধ্য নন; আপনার স্বামীর সম্পদে আপনার বাবার ঋণ পরিশোধ করা আপনার দায়িত্ব নয়।
  • তবে পিতা-মাতাকে সাহায্য করা সদকা ও ইহসানের অন্তর্ভুক্ত—স্বামীর অনুমতি সাপেক্ষে।

ঙ. সবরের সাথে দুআ

  • রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: «وَاعْلَمْ أَنَّ النَّصْرَ مَعَ الصَّبْرِ» — সুনানে তিরমিজি: ২৫১৬
  • নিয়মিত দুআ করুন: رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ (সূরা ফুরকান: ৭৪)

৪. সতর্কতা

  • গোপনে পিতা-মাতার সঙ্গে কথা বলবেন না—এতে স্বামীর সন্দেহ বাড়বে এবং শর্ত পূরণের আশঙ্কা তৈরি হবে।
  • প্রকাশ্যে, স্বামীর জ্ঞাতসারে কথা বলুন; সম্ভব হলে তার উপস্থিতিতে বা তার অনুমতি নিয়ে।
  • স্বামী যদি অনুমতি না দেন, তবে সালাম-কুশল ও দুআর মাধ্যমে সম্পর্ক রক্ষা করুন—যেমন চিঠি, বার্তা বা তৃতীয় ব্যক্তির মাধ্যমে।
  • সংসার ভাঙার সিদ্ধান্ত আপনি নেবেন না; ধৈর্য ধরুন এবং আলেমদের পরামর্শ নিন।

সারসংক্ষেপ

| বিষয় | বিধান | |---|---| | স্বামীর আনুগত্য | ফরজ (শরিয়তের সীমার ভেতরে) | | পিতা-মাতার সঙ্গে সম্পর্ক | রক্ষা করা ফরজ, ছিন্ন করা হারাম | | পিতা-মাতার সঙ্গে কথা বলতে নিষেধ | স্বামীর শরিয়তসম্মত অধিকার নয় | | শর্তসাপেক্ষ তালাকের হুমকি | শরিয়তবিরোধী, গুনাহ | | আপনার করণীয় | প্রকাশ্যে, সম্মতিসহ সীমিত যোগাযোগ; মধ্যস্থতা; সবর ও দুআ |

পরামর্শ: স্থানীয় বিশ্বস্ত মুফতি বা দারুল ইফতার সঙ্গে সরাসরি পরামর্শ করুন। আপনার স্বামীকে ফতোয়া উসমানি বা ইমদাদুল ফতোয়া-র সংশ্লিষ্ট অংশ দেখান—যেখানে বলা হয়েছে, পিতা-মাতার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার শর্তে তালাক দেওয়া জুলুম ও নাজায়েজ।



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.