দ্বিতীয় তালাকের পর পুনরায় আগের স্বামীকে বিয়ে করার জন্য বিয়ের পূর্বে মেসেজ বা কলে কথা বলা যাবে কি?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 5741
Questioner: tahsina0891
Question Asked: 20 Sep 2026, 10:35 PM
Reviewed & Published: 20 Sep 2026, 11:08 PM
Views: 12
Tokens: 3,910
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

২য় তালাকের পর পূনরায় আগের স্বামীকে বিয়ে করতে চাইলে বিয়ের পূর্বে প্রয়োজনে মেসেজ বা কলের মাধ্যমে আগের স্বামীর সাথে কথা বলা যাবে কি?যেমন বিয়ে কখন কিভাবে করবে এই টাইপের কথাবার্তা বা জরুরি কোন বিষয় নিয়ে।

Answer

২য় তালাকের পর প্রাক্তন স্বামীর সাথে কথা বলার বিধান

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ

একজন মহিলা দ্বিতীয় তালাকের পর (অর্থাৎ এক বা দুই তালাকের পর, যা রজঈ বা বাইন তালাকের অন্তর্ভুক্ত) পুনরায় আগের স্বামীকে বিয়ে করতে চান। বিয়ের পূর্বে বিয়ের সময়, পদ্ধতি বা জরুরি বিষয় নিয়ে মেসেজ বা কলের মাধ্যমে কথা বলা যাবে কি?

উত্তর

হ্যাঁ, শরীয়তের সীমা রক্ষা করে কথা বলা যাবে। তবে কিছু শর্ত ও সতর্কতা অবলম্বন করা আবশ্যক।

১. তালাকের প্রকারভেদ নির্ণয় জরুরি

প্রথমেই জানা দরকার—এটি রজঈ তালাক (প্রথম বা দ্বিতীয় তালাক, যেখানে ইদ্দতের ভেতরে ফিরে আসার সুযোগ আছে) নাকি বাইন তালাক (যেখানে ইদ্দত শেষ হয়ে গেছে এবং নতুন করে বিবাহ ছাড়া ফিরে আসা সম্ভব নয়)।

  • রজঈ তালাকের ইদ্দত চলাকালীন: স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের জন্য এখনও বৈধ, তাই কথা বলা সম্পূর্ণ জায়েজ। এমনকি ইদ্দতের ভেতরে স্বামী মুখে বা ইশারায় ফিরিয়ে নিতে পারে।
  • ইদ্দত শেষ হয়ে গেলে বা বাইন তালাক হলে: তখন তারা পরস্পরের জন্য গায়রে মাহরাম (অবিবাহিত সম্পর্কে নিষিদ্ধ)। নতুন বিবাহ ছাড়া কোনো সম্পর্ক বৈধ নয়।

২. গায়রে মাহরাম অবস্থায় কথা বলার বিধান

ইদ্দত শেষ হওয়ার পর বা বাইন তালাকের ক্ষেত্রে তারা পরস্পরের জন্য গায়রে মাহরাম। ইসলামে গায়রে মাহরাম পুরুষ-নারীর মধ্যে প্রয়োজনবিহীন কথাবার্তা নিষিদ্ধ। কিন্তু প্রয়োজনীয় ও শরীয়তসম্মত বিষয়ে সীমিত কথা বলা জায়েজ।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَىٰ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا "আর তোমরা ব্যভিচারের নিকটেও যেয়ো না; নিশ্চয়ই তা অশ্লীল কাজ ও মন্দ পথ।" — (সূরা আল-ইসরা: ৩২)

আরও ইরশাদ হয়েছে:

فَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ مَرَضٌ "তোমরা কোমল ও মধুর ভঙ্গিতে কথা বলো না, যাতে যার অন্তরে রোগ আছে সে লোভ না করে।" — (সূরা আল-আহযাব: ৩২)

৩. হানাফি ফিকহের মূলনীতি

রদ্দুল মুহতার ও অন্যান্য হানাফি কিতাবে উল্লেখ আছে—গায়রে মাহরামের সাথে প্রয়োজনবিহীন কথা বলা মাকরুহে তাহরিমি। তবে বিবাহের প্রস্তাব, বিবাহের শর্তাবলি, মোহর, তারিখ নির্ধারণ ইত্যাদি জরুরি বিষয়ে কথা বলা জায়েজ, যদি নিম্নলিখিত শর্ত পূরণ হয়:

  1. প্রয়োজন সীমিত থাকা — শুধু বিবাহ-সংক্রান্ত জরুরি বিষয় নিয়ে কথা হবে, অপ্রয়োজনীয় গল্প-গুজব নয়।
  2. কথার ধরন সংযত হওয়া — কোমল, লোভ-উদ্দীপক বা আবেগমিশ্রিত ভাষা নয়; বরং সংক্ষিপ্ত, স্পষ্ট ও ভদ্র।
  3. তৃতীয় পক্ষের উপস্থিতি বা মাহরামের মাধ্যমে যোগাযোগ — সম্ভব হলে কোনো মাহরাম (যেমন ভাই, বাবা, চাচা) বা বিশ্বস্ত তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে যোগাযোগ করা উত্তম। সরাসরি একান্তে (খালওয়া) কথা বলা যাবে না।
  4. খালওয়া (নির্জন সাক্ষাৎ) পরিহার — ফোন বা মেসেজে একান্তে দীর্ঘ আলাপ-আলোচনা খালওয়ার সমতুল্য হতে পারে, যা নিষিদ্ধ।
  5. ইদ্দতের বিধান মানা — যদি ইদ্দত চলমান থাকে, তবে ইদ্দতের বিধান (ঘরে অবস্থান, সাজসজ্জা পরিহার ইত্যাদি) মানতে হবে।

৪. বিশেষভাবে লক্ষণীয়

  • বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া: শরীয়তে গায়রে মাহরামকে সরাসরি বিবাহের প্রস্তাব দেওয়া নিষিদ্ধ নয়, তবে ইদ্দত চলাকালীন প্রস্তাব দেওয়া নিষিদ্ধ (সূরা বাকারা: ২৩৫-এ ইদ্দতের সময় প্রস্তাবের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আছে)। ইদ্দত শেষ হলে প্রস্তাব দেওয়া জায়েজ।
  • মেসেজ বা কল: যদি বিনয় ও সংযমের সাথে শুধু বিবাহ-সংক্রান্ত জরুরি তথ্য বিনিময়ের জন্য হয়, তবে জায়েজ। কিন্তু দীর্ঘ আলাপ, হাসি-ঠাট্টা, আবেগ প্রকাশ, প্রেমালাপ ইত্যাদি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
  • সরাসরি সাক্ষাৎ: মাহরামের উপস্থিতি ছাড়া একান্তে সাক্ষাৎ করা যাবে না।

৫. হানাফি কিতাবের বরাতে

  • রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন): গায়রে মাহরামের সাথে প্রয়োজনবিহীন কথা বলা ও দৃষ্টি দেওয়া নিষিদ্ধ; তবে প্রয়োজনীয় বিষয়ে সীমিত কথা বলা জায়েজ।
  • ফাতাওয়া আলমগিরি: গায়রে মাহরামের সাথে কথাবার্তায় সংযম ও প্রয়োজনীয়তার শর্ত উল্লেখ আছে।
  • বাহিশতী জেওর (আশরাফ আলী থানভী): গায়রে মাহরামের সাথে কথা বলার সময় পর্দা ও সংযমের কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
  • ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি): আধুনিক যোগাযোগমাধ্যমে (ফোন, মেসেজ, ইন্টারনেট) গায়রে মাহরামের সাথে কথা বলার ক্ষেত্রে একই বিধান প্রযোজ্য—প্রয়োজন সীমিত ও সংযম রক্ষা করতে হবে।

৬. ব্যবহারিক পরামর্শ

  1. মাহরামের মাধ্যমে যোগাযোগ করুন — বাবার, ভাইয়ের বা বিশ্বস্ত আত্মীয়ের মাধ্যমে বিয়ের বিষয়ে আলোচনা করুন। এটি সর্বাধিক নিরাপদ ও শরীয়তসম্মত।
  2. প্রয়োজন হলে সংক্ষিপ্ত মেসেজ — শুধু তারিখ, সময়, মোহর, শর্ত ইত্যাদি জরুরি তথ্য বিনিময় করুন।
  3. আবেগপ্রবণ আলাপ পরিহার করুন — পুরনো স্মৃতি, ভালোবাসা, ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন না।
  4. খালওয়া এড়িয়ে চলুন — একান্তে দীর্ঘ ফোনালাপ বা সাক্ষাৎ করবেন না।
  5. ইদ্দতের বিধান মানুন — যদি ইদ্দত চলমান থাকে, তবে ইদ্দত শেষ হওয়ার আগে বিবাহ বা প্রস্তাব নয়।
  6. স্থানীয় মুফতির পরামর্শ নিন — আপনার নির্দিষ্ট পরিস্থিতি (রজঈ না বাইন, ইদ্দত শেষ হয়েছে কি না) জানিয়ে স্থানীয় বিশ্বস্ত মুফতির কাছ থেকে ফতোয়া নিন।

সারসংক্ষেপ

| বিষয় | বিধান | |------|------| | রজঈ তালাকের ইদ্দতকালে কথা বলা | জায়েজ (তারা এখনও স্বামী-স্ত্রী) | | ইদ্দত শেষে/বাইন তালাকে জরুরি কথা | জায়েজ, শর্তসাপেক্ষে | | অপ্রয়োজনীয়/আবেগমিশ্রিত কথা | নিষিদ্ধ | | একান্তে দীর্ঘ আলাপ (খালওয়া) | নিষিদ্ধ | | মাহরাম/তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে যোগাযোগ | উত্তম ও নিরাপদ | | ইদ্দতকালে বিবাহের প্রস্তাব | নিষিদ্ধ |

মূল কথা: দ্বিতীয় তালাকের পর পুনরায় বিবাহের উদ্দেশ্যে জরুরি বিষয়ে সীমিত ও সংযমী কথাবার্তা শরীয়তসম্মত। তবে তা হতে হবে প্রয়োজনসীমিত, সংযমী, খালওয়ামুক্ত এবং সম্ভব হলে মাহরামের মাধ্যমে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হালাল-হারামের সীমা রক্ষা করার তাওফিক দান করুন। আমিন।



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.