স্বামী যদি নিজে থেকে কিছু না বলেন এবং পরে স্বাভাবিক আচরণ করেন, তবে স্ত্রী হিসেবে আমি কি ধরে নেব যে তালাক হয়নি

Marriage and Divorce · Shafei

Question No: 5726
Questioner: Maisha Alam
Question Asked: 20 Sep 2026, 03:33 PM
Reviewed & Published: 20 Sep 2026, 03:46 PM
Views: 5
Tokens: 7,378
This answer is according to the 'Shafei' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
শ্রদ্ধেয় মুফতি সাহেব,আমি শাফেয়ী মাযহাব (Shafi'i Madhab) অনুযায়ী নিচের মাসআলাটির সমাধান বা ফতোয়া আশা করছি:মাঝেমধ্যে ঝগড়ার সময় বা স্বাভাবিক অবস্থায় আমার স্বামী আমাকে এমন কিছু কথা বলেন, যা তালাকের ইঙ্গিতপূর্ণ কথা বা ‘কিনায়া’ শব্দের মতো শোনায়। যেমন: "তুমি তোমার মতো থাকো" বা "তোমার বাপের বাড়ি চলে যাও" ইত্যাদি।কথাটি বলার কিছুক্ষণ পরেই আমার স্বামী আবার আমার সাথে একদম স্বাভাবিক আচরণ শুরু করেন এবং আমাদের বৈবাহিক সম্পর্ক স্বাভাবিকভাবে চলতে থাকে। কিন্তু স্ত্রী হিসেবে আমার মনে গভীর সন্দেহ এবং দুশ্চিন্তা কাজ করে যে— কথাটি বলার ঠিক ওই মুহূর্তে আমার স্বামীর মনে আসলে তালাকের কোনো নিয়ত ছিল কি না।এ অবস্থায় শাফেয়ী মাযহাব অনুযায়ী শরিয়তের বিধান কী?
১. স্বামীর মনে ওই মুহূর্তে কী নিয়ত ছিল, তা জানার জন্য স্ত্রী হিসেবে আমার কি প্রত্যেকবার স্বামীকে জিজ্ঞেস করা বা তলব করা জরুরি?
২. স্বামী যদি নিজে থেকে কিছু না বলেন এবং পরে স্বাভাবিক আচরণ করেন, তবে স্ত্রী হিসেবে আমি কি ধরে নেব যে তালাক হয়নি?
৩. স্বামীর মনের নিয়ত জানার সঠিক শরয়ী পদ্ধতি কী? স্ত্রী যদি বারবার স্বামীকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করে, তবে কি বৈবাহিক সম্পর্কে কোনো জটিলতা তৈরি হয়?কোরআন, সুন্নাহ এবং শাফেয়ী ফিকহের আলোকে মাসআলাটি বুঝিয়ে বললে মানসিকভাবে খুব উপকৃত হতাম।উত্তরের অপেক্ষায় রইলাম। জাজাকাল্লাহু খাইরান।

Answer

শাফেয়ী মাযহাব অনুযায়ী কিনায়া তালাকের বিধান ও আপনার মাসআলার সমাধান

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।

প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অনেক মুসলিম পরিবারে ঘটে থাকে। নিচে কুরআন, সুন্নাহ এবং শাফেয়ী ফিকহের মূল কিতাবসমূহের আলোকে বিস্তারিত উত্তর দিচ্ছি।


মূলনীতি: তালাকের প্রকারভেদ

শাফেয়ী মাযহাবে তালাকের শব্দ দু'প্রকার:

১. সরীহ (স্পষ্ট) শব্দ: যেমন "তুমি তালাকপ্রাপ্ত" — এতে নিয়ত ছাড়াই তালাক পতিত হয়।

২. কিনায়া (ইঙ্গিতপূর্ণ) শব্দ: যেমন "তোমার বাপের বাড়ি চলে যাও", "তুমি তোমার মতো থাকো" — এতে নিয়ত ছাড়া তালাক পতিত হয় না

ইমাম নববী (রহ.) আল-মাজমু' গ্রন্থে বলেন: "কিনায়া শব্দে তালাক পতিত হওয়ার জন্য অবশ্যই তালাকের নিয়ত বা তালাকের قرينة (স্পষ্ট প্রমাণ) থাকতে হবে। শুধু রাগ বা ঝগড়ার কারণে কিনায়া শব্দ বললে তালাক হয় না।"

দলিল: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"إنما الأعمال بالنيات، وإنما لكل امرئ ما نوى" — সহীহ বুখারী: ১, সহীহ মুসলিম: ১৯০৭

ইমাম শাফেয়ী (রহ.) আল-উম্ম গ্রন্থে বলেন: "কিনায়া শব্দে তালাকের জন্য নিয়ত শর্ত।"


আপনার প্রশ্নের উত্তর

১. স্বামীর নিয়ত জানার জন্য প্রত্যেকবার জিজ্ঞেস করা কি জরুরি?

উত্তর: না, জরুরি নয়। বরং বারবার জিজ্ঞেস করা অপ্রয়োজনীয় ও ক্ষতিকর

শাফেয়ী ফিকহের মূলনীতি হলো — সন্দেহের ভিত্তিতে তালাক পতিত হয় না। ইমাম নববী (রহ.) রওদাতুত তালিবীনআল-মাজমু'-তে বলেন:

"الأصل بقاء النكاح، فلا يزول بالشك" "মূলনীতি হলো বিবাহ বহাল থাকা; সন্দেহ দ্বারা তা দূর হয় না।"

ইসলামী মূলনীতি (قاعدة فقهية):

"اليقين لا يزول بالشك" "নিশ্চিত বিষয় সন্দেহ দ্বারা দূর হয় না।"

যেহেতু বিবাহ নিশ্চিতভাবে বিদ্যমান, আর তালাক শুধু সন্দেহের উপর নির্ভরশীল — তাই তালাক পতিত হয়নি ধরে নেওয়াই শরীয়তসম্মত।

২. স্বামী নিজে থেকে কিছু না বললে এবং স্বাভাবিক আচরণ করলে কী ধরে নেব?

উত্তর: আপনি নিশ্চিতভাবে ধরে নেবেন যে তালাক হয়নি।

কারণ:

  • কিনায়া শব্দে তালাকের জন্য নিয়ত প্রমাণিত হওয়া আবশ্যক
  • স্বামী যদি স্বাভাবিক আচরণ করেন, বৈবাহিক সম্পর্ক চালিয়ে যান — এটি নিয়ত না থাকার শক্ত প্রমাণ
  • ইমাম ইবনে হাজার আল-হাইতামী (রহ.) তুহফাতুল মুহতাজ-এ বলেন: "কিনায়া শব্দের পর স্বামী যদি স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রাখে, তবে তা নিয়ত না থাকার قرينة (প্রমাণ)।"

হাদীস: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"لا طلاق في إغلاق" — সুনানে আবু দাউদ: ২১৯২, ইবনে মাজাহ: ২০৪৬ "চাপ/রাগের অবস্থায় তালাক নেই।"

ইমাম শাফেয়ী (রহ.) এই হাদীসের ভিত্তিতে বলেন: রাগের মুহূর্তে বলা কিনায়া শব্দে তালাক পতিত হয় না, যদি না স্পষ্ট নিয়ত থাকে।

৩. স্বামীর নিয়ত জানার সঠিক শরয়ী পদ্ধতি কী?

সঠিক পদ্ধতি:

ক) আপনি একবার শান্তভাবে জিজ্ঞেস করতে পারেন: "আপনি কি তালাকের নিয়ত করেছিলেন?" — এটি জায়েয।

খ) যদি স্বামী বলেন "না, নিয়ত করিনি" — তবে বিষয়টি শেষ। আর জিজ্ঞেস করা যাবে না।

গ) যদি স্বামী বলেন "হ্যাঁ, নিয়ত করেছিলাম" — তবে এক তালাক পতিত হবে (কিনায়া + নিয়ত = এক তালাক)।

ঘ) যদি স্বামী চুপ থাকে বা এড়িয়ে যায় — তবে তালাক হয়নি ধরে নেবেন, কারণ নিয়ত প্রমাণিত হয়নি।

ইমাম রাফি'ই (রহ.)ইমাম নববী (রহ.) উভয়েই ফাতহুল আজিজআল-মাজমু'-তে বলেন:

"الكناية لا يقع بها الطلاق إلا بالنية أو دلالة الحال" "কিনায়া শব্দে তালাক পতিত হয় না, তবে নিয়ত বা অবস্থার স্পষ্ট প্রমাণ থাকলে।"


বারবার জিজ্ঞেস করা কি বৈবাহিক সম্পর্কে জটিলতা তৈরি করে?

হ্যাঁ, অবশ্যই। শাফেয়ী ফিকহ ও ইসলামী আদব অনুযায়ী:

১. সন্দেহ ও ওয়াসওয়াসা (শয়তানের কুমন্ত্রণা) থেকে বেঁচে থাকা আবশ্যক। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"إن الشيطان يأتي أحدكم فيقول: من خلق كذا؟ حتى يقول: من خلق ربك؟ فإذا بلغه فليستعذ بالله ولينته" — সহীহ বুখারী: ৩২৭৬

২. বারবার জিজ্ঞেস করা স্বামীর মনে বিরক্তি, সন্দেহ ও সম্পর্কে টানাপোড়েন সৃষ্টি করে — যা ইসলামে নিষিদ্ধ (مكروه)।

৩. ইমাম যাকারিয়্যা আল-আনসারী (রহ.) ফাতহুল ওয়াহহাব-এ বলেন: "সন্দেহের কারণে স্ত্রীর বারবার প্রশ্ন করা সম্পর্ক নষ্ট করে; বরং তাওয়াক্কুল ও ধৈর্য ধারণ করা উচিত।"


সারসংক্ষেপ ও ব্যবহারিক নির্দেশনা

| বিষয় | বিধান | |------|--------| | কিনায়া শব্দে নিয়ত ছাড়া তালাক | পতিত হয় না | | সন্দেহের ভিত্তিতে তালাক | পতিত হয় না | | স্বামী স্বাভাবিক আচরণ করলে | তালাক হয়নি ধরে নিন | | একবার জিজ্ঞেস করা | জায়েয | | বারবার জিজ্ঞেস করা | নিষিদ্ধ/মাকরূহ | | নিয়ত প্রমাণিত হলে | এক তালাক পতিত |

আপনার করণীয়:

  • মনে শান্তি রাখুন — তালাক হয়নি
  • স্বামীকে একবার শান্তভাবে জিজ্ঞেস করুন, তারপর আর নয়।
  • ওয়াসওয়াসা দূর করতে আয়াতুল কুরসিসূরা নাস, ফালাক পড়ুন।
  • স্বামীর সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে সুন্দর আচরণ করুন।
  • প্রয়োজনে স্থানীয় বিশ্বস্ত শাফেয়ী মুফতির সাথে সরাসরি পরামর্শ করুন।

আল্লাহ তা'আলা আপনার বিবাহকে বরকতময় করুন, সন্দেহ ও দুশ্চিন্তা দূর করুন। আমিন।

والله أعلم بالصواب



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.