বাসর রাত বা দাম্পত্য জীবনের প্রথম মিলনের সুন্নত ত্বরিকা ও আদাব সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাই?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 5712
Questioner: Maria Akter
Question Asked: 19 Sep 2026, 11:35 PM
Reviewed & Published: 20 Sep 2026, 12:20 AM
Views: 34
Tokens: 2,978
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

স্বামী স্ত্রীর প্রথম অ্যাপ্রোচ

Answer

স্বামী-স্ত্রীর প্রথম অ্যাপ্রোচ (দাম্পত্য জীবনের সূচনা): ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি

প্রশ্নের সারমর্ম

প্রশ্নটি হলো—স্বামী-স্ত্রীর প্রথম অ্যাপ্রোচ বা দাম্পত্য জীবনের প্রথম মিলনের (সহবাসের) ইসলামী বিধান কী? বিবাহের পর প্রথম রাতে বা প্রথম সহবাসে কী কী আদব ও সুন্নত পালন করা উচিত?


ভূমিকা

ইসলামে বিবাহ একটি ইবাদত ও পবিত্র বন্ধন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"হে যুবকগণ! তোমাদের মধ্যে যার সামর্থ্য আছে, সে যেন বিবাহ করে। কারণ তা দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থানকে হেফাজত করে।" — (সহীহ বুখারী: ৫০৬৫, সহীহ মুসলিম: ১৪০০)

দাম্পত্য জীবনের প্রথম অ্যাপ্রোচ বা প্রথম মিলনকে ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর জন্য কিছু আদব ও দুআ রয়েছে, যা পালন করা সুন্নত ও বরকতের কারণ।


প্রথম অ্যাপ্রোচের সুন্নত ও আদবসমূহ

১. বিবাহের পর প্রথমে দুআ পড়া

বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার পর নবদম্পতির জন্য রাসূল ﷺ-এর শেখানো দুআ:

"আল্লাহুম্মা বারিক লি ফি আহলি, ওয়া বারিক লাহুম ফিয়্যা" (হে আল্লাহ! আমার পরিবারে আমার জন্য বরকত দান করুন এবং তাদের জন্যও আমার দ্বারা বরকত দান করুন।)

আরও একটি দুআ:

"আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা খাইরাহা ওয়া খাইরা মা জাবালতাহু আলাইহি, ওয়া আউযু বিকা মিন শাররিহা ওয়া শাররি মা জাবালতাহু আলাইহি" (হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে তার কল্যাণ ও তার স্বভাবের কল্যাণ প্রার্থনা করছি এবং তার অনিষ্ট ও তার স্বভাবের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাইছি।) — (সুনানে আবু দাউদ: ২১৬০)

২. সহবাসের পূর্বে দুআ পড়া

প্রথম সহবাস হোক বা পরবর্তী, প্রতিবার সহবাসের পূর্বে এই দুআ পড়া সুন্নত:

"বিসমিল্লাহি আল্লাহুম্মা জান্নিবনাশ শাইতানা, ওয়া জান্নিবিশ শাইতানা মা রাযাকতানা" (আল্লাহর নামে! হে আল্লাহ! আমাদের থেকে শয়তানকে দূরে রাখুন এবং আমাদের যে সন্তান দান করবেন, তা থেকেও শয়তানকে দূরে রাখুন।) — (সহীহ বুখারী: ১৪১, সহীহ মুসলিম: ১৪৩৪)

ফায়দা: এই দুআ পড়লে শয়তান সেই মিলনে অংশগ্রহণ করতে পারে না এবং সন্তান শয়তানের অনিষ্ট থেকে হেফাজতে থাকে।

৩. প্রথম রাতে কতক আদব পালন করা

  • দুই রাকআত নামাজ পড়া: বিবাহের প্রথম রাতে নবদম্পতির জন্য দুই রাকআত নফল নামাজ পড়া মুস্তাহাব। এতে আল্লাহর কাছে শোকর আদায় ও বরকতের দুআ করা হয়।
  • মিসওয়াক ও পরিচ্ছন্নতা: উভয়ের জন্য পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন থাকা সুন্নত।
  • নরম ব্যবহার ও সৌজন্য: প্রথম অ্যাপ্রোচে কোমলতা, ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভয় বা জোর-জবরদস্তি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

৪. স্ত্রীর সম্মতি ও প্রস্তুতি

ইসলামে স্ত্রীর সম্মতি ছাড়া সহবাস জায়েজ নয়। প্রথম অ্যাপ্রোচে স্ত্রীকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করা, তার অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখানো এবং ধৈর্য ধারণ করা কর্তব্য।

"তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।" — (সূরা আন-নিসা: ১৯)

৫. গোপনীয়তা রক্ষা

দাম্পত্য জীবনের গোপন বিষয় অন্যের কাছে প্রকাশ করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

রাসূল ﷺ বলেছেন: "নিশ্চয়ই মানুষের মধ্যে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যক্তি সে, যে নিজ স্ত্রীর সাথে মিলনের পর তা প্রকাশ করে দেয়।" — (সহীহ মুসলিম: ১৪৩৭)


হানাফী ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি

ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন:

"বিবাহের প্রথম রাতে দুই রাকআত নামাজ পড়া এবং সহবাসের পূর্বে দুআ পড়া সুন্নত। আর সহবাসের সময় সম্পূর্ণ নগ্ন হওয়া থেকে বিরত থাকা উত্তম।" — (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৩৬৭)

ফাতাওয়া আলমগীরীতে এসেছে:

"সহবাসের পূর্বে বিসমিল্লাহ বলা এবং দুআ পড়া মুস্তাহাব। আর স্ত্রীর সাথে কোমল আচরণ করা কর্তব্য।" — (ফাতাওয়া আলমগীরী, খণ্ড ৫, পৃ. ৩৩০)

ফাতাওয়া উসমানীতে:

"প্রথম মিলনে ভয়, উত্তেজনা বা জোর-জবরদস্তি পরিহার করা আবশ্যক। উভয়ের সম্মতি ও প্রস্তুতি নিশ্চিত করা জরুরি।" — (ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড ২, পৃ. ৩৩৫)


গুরুত্বপূর্ণ মাসআলাসমূহ

| বিষয় | বিধান | |------|------| | সহবাসের পূর্বে দুআ পড়া | সুন্নত | | প্রথম রাতে ২ রাকআত নফল নামাজ | মুস্তাহাব | | স্ত্রীর সম্মতি ছাড়া সহবাস | নিষিদ্ধ/হারাম | | হায়েজ/নিফাস অবস্থায় সহবাস | হারাম | | পায়খানা-প্রস্রাবের চাপে সহবাস | মাকরূহ | | সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে সহবাস | মাকরূহ (কম্বল বা কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা উত্তম) | | গোপনীয়তা প্রকাশ | হারাম |


বিশেষ নির্দেশনা

  1. ভয় দূর করা: প্রথম অ্যাপ্রোচে উভয়ের মধ্যে ভয় ও সংকোচ থাকা স্বাভাবিক। ধীরে ধীরে আস্থা ও ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে তোলা উচিত।

  2. ধৈর্য ও কোমলতা: পুরুষের জন্য স্ত্রীর প্রতি কোমল হওয়া, তার অনুভূতি বোঝা এবং ধৈর্য ধারণ করা অত্যন্ত জরুরি।

  3. শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতি: উভয়ের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করা।

  4. চিকিৎসা পরামর্শ: যদি কোনো শারীরিক সমস্যা থাকে, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া।

  5. ইসলামী জ্ঞান: দাম্পত্য জীবনের ইসলামী বিধান সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা।


উপসংহার

স্বামী-স্ত্রীর প্রথম অ্যাপ্রোচ ইসলামে একটি পবিত্র ও বরকতময় বিষয়। এর জন্য দুআ, নামাজ, পরিচ্ছন্নতা, কোমলতা ও সম্মান—এই আদবগুলো পালন করা সুন্নত। জোর-জবরদস্তি, ভয় দেখানো বা গোপনীয়তা প্রকাশ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সুন্নত অনুযায়ী দাম্পত্য জীবন পরিচালনার তাওফিক দান করুন। আমীন।



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.