তিন তালাক দিলে কি পুনরায় বিয়ে করা যাবে?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
উত্তর: বারবার তিন তালাক ও পুনরায় সংসারের বিধান
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু
সংক্ষিপ্ত উত্তর
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী — যদি সত্যিই আপনার স্বামী আপনাকে ৭/৮ বার তিন তালাক (অর্থাৎ প্রতি বার তিনটি করে তালাক) দিয়ে থাকে, তাহলে প্রথম তিন তালাকেই আপনি তার জন্য সম্পূর্ণ হারাম হয়ে গেছেন এবং বায়েন মুগাল্লাযা (চূড়ান্ত বিচ্ছেদ) সংঘটিত হয়েছে। এরপর যে তালাকগুলো দিয়েছে সেগুলো নিষ্ফল (অকার্যকর)। আর সর্বশেষ ভয়েস মেসেজে তিন তালাকও নিষ্ফল — কারণ আপনি ইতিমধ্যে তার জন্য হারাম ছিলেন।
এখন আপনি তার জন্য হারাম। পুনরায় সংসার করার একমাত্র শরীয়তসম্মত পথ হলো হিল্লা — যা কুরআন ও হাদীসে সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত। তথাকথিত/নাটকীয় হিল্লা নয়, বরং প্রকৃত হিল্লা — যা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
বিস্তারিত আলোচনা
১. তিন তালাকের পর স্ত্রী স্বামীর জন্য হারাম হয়ে যায়
আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
فَإِن طَلَّقَهَا فَلَا تَحِلُّ لَهُ مِن بَعْدُ حَتَّىٰ تَنكِحَ زَوْجًا غَيْرَهُ
"অতঃপর যদি সে তাকে (তৃতীয়) তালাক দেয়, তবে সে তার জন্য হালাল হবে না, যতক্ষণ না সে অন্য স্বামীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়।" — সূরা বাকারা: ২৩০
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:
الطَّلَاقُ ثَلَاثٌ، فَمَنْ زَادَ فَقَدْ أَتَى بِمُحَرَّمٍ
"তালাক তিনটি। যে এর বেশি করে, সে হারাম কাজ করেছে।" — সুনানে দারাকুতনী, হাদীস নং ৪৩১৬; মুসনাদে আহমাদ
অন্য হাদীসে:
مَنْ طَلَّقَ ثَلَاثًا فِي مَجْلِسٍ وَاحِدٍ فَهِيَ ثَلَاثٌ
"যে ব্যক্তি এক مجلس এ তিন তালাক দেয়, তা তিন তালাকই হয়।" — সুনানে দারাকুতনী; ফাতহুল বারী
২. আপনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধান
| বিষয় | বিধান | |------|------| | প্রথম তিন তালাক | বায়েন মুগাল্লাযা — চূড়ান্ত বিচ্ছেদ, স্ত্রী স্বামীর জন্য হারাম | | পরবর্তী ৭/৮ বার তিন তালাক | নিষ্ফল — কারণ ইতিমধ্যে হারাম হয়ে গেছে | | সর্বশেষ ভয়েস মেসেজে তিন তালাক | নিষ্ফল — একই কারণে | | ইদ্দতের পর পুনরায় বিবাহ | শরীয়তসম্মত নয় — হিল্লা ছাড়া অসম্ভব |
ইবনে আবিদীন (রহ.) লিখেন:
"তিন তালাকের পর স্ত্রী স্বামীর জন্য হারাম হয়ে যায় এবং হিল্লা ছাড়া তার কাছে ফিরে আসা জায়েয নয়।" — রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃ. ৪৭০
ফাতাওয়া আলমগিরিতে আছে:
"তিন তালাকের পর স্ত্রী প্রথম স্বামীর জন্য হারাম। হিল্লা ছাড়া পুনরায় বিবাহ বৈধ নয়।" — ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃ. ৩৭৫
৩. হিল্লা কী? — শরীয়তসম্মত পথ
হিল্লা হলো: স্ত্রী ইদ্দত পূর্ণ করার পর স্বেচ্ছায় ও স্বাভাবিকভাবে অন্য একজন পুরুষকে শরীয়তসম্মতভাবে বিবাহ করবে, স্বামী-স্ত্রী হিসেবে স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবন যাপন করবে। এরপর যদি সেই দ্বিতীয় স্বামীর সাথে তালাক হয় বা তার মৃত্যু হয় এবং ইদ্দত পূর্ণ হয়, তবেই প্রথম স্বামীর সাথে পুনরায় বিবাহ বৈধ হবে।
শর্তসমূহ:
- প্রথম স্বামীর সাথে কোনো ষড়যন্ত্র বা চুক্তি ছাড়া — শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য স্বাভাবিক বিবাহ হতে হবে।
- প্রকৃত দাম্পত্য সম্পর্ক — শুধু কাগজে-কলমে বা নামেমাত্র বিবাহ নয়; বরং স্বামী-স্ত্রী হিসেবে সহবাসসহ স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে হবে।
- দ্বিতীয় স্বামীর সাথে তালাক বা মৃত্যু — এরপর ইদ্দত পূর্ণ হতে হবে।
- প্রথম স্বামীর সাথে পুনরায় বিবাহ — নতুন মোহর ও নতুন আকদে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:
حَتَّى تَذُوقَ عُسَيْلَتَهُ وَيَذُوقَ عُسَيْلَتَهَا
"যতক্ষণ না সে (স্ত্রী) দ্বিতীয় স্বামীর সাথে সহবাসের স্বাদ গ্রহণ করে এবং দ্বিতীয় স্বামী তার সাথে সহবাসের স্বাদ গ্রহণ করে।" — সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫২৬০; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৪৩৩
ইবনে আবিদীন (রহ.) লিখেন:
"হিল্লা তখনই শুদ্ধ হবে যখন দ্বিতীয় স্বামী সহবাস করবে এবং প্রকৃত বিবাহ হবে, শুধু আকদ যথেষ্ট নয়।" — রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃ. ৪৭২
৪. তথাকথিত/নাটকীয় হিল্লা সম্পূর্ণ হারাম
যে হিল্লা শুধু কাগজে-কলমে হয়, যেখানে দ্বিতীয় স্বামী সহবাস করে না বা আগেই চুক্তি থাকে যে তালাক দিয়ে দেবে — এ ধরনের হিল্লা সম্পূর্ণ হারাম ও কবীরা গুনাহ।
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:
لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ الْمُحَلِّلَ وَالْمُحَلَّلَ لَهُ
"রাসূলুল্লাহ ﷺ হিল্লাকারী (দ্বিতীয় স্বামী) ও যার জন্য হিল্লা করা হয় (প্রথম স্বামী) — উভয়ের প্রতি লানত করেছেন।" — সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ২০৭৬; সুনানে তিরমিজি, হাদীস নং ১১১৯
ফাতাওয়া উসমানিতে আছে:
"চুক্তিভিত্তিক বা নাটকীয় হিল্লা সম্পূর্ণ নাজায়েয। এ ধরনের হিল্লা দ্বারা প্রথম স্বামীর জন্য স্ত্রী হালাল হবে না।" — ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ২, পৃ. ৩২৫
৫. আপনার করণীয়
- আপনি এখন আপনার প্রথম স্বামীর জন্য হারাম। তার সাথে কোনো অবস্থাতেই দাম্পত্য সম্পর্ক চালিয়ে যাওয়া জায়েয নয়।
- তাওবা করুন — এতদিন তার সাথে থাকা এবং অবৈধ সম্পর্ক চালিয়ে যাওয়া গুনাহ। আল্লাহর কাছে খাঁটি তাওবা করুন।
- ইদ্দত পালন করুন — সর্বশেষ তালাক থেকে ইদ্দত (তিন হায়েজ) পালন করুন।
- হিল্লা ছাড়া পুনরায় সংসার অসম্ভব — এবং হিল্লা হতে হবে প্রকৃত, স্বাভাবিক ও চুক্তিমুক্ত।
- তথাকথিত হিল্লার ফাঁদে পড়বেন না — এটি আরও বড় গুনাহ ও জাহান্নামের কারণ হবে।
- বিশ্বস্ত আলেমের পরামর্শ নিন — আপনার নির্দিষ্ট পরিস্থিতি বিস্তারিত জানিয়ে স্থানীয় মুফতি সাহেবের কাছে ফতোয়া নিন।
সারসংক্ষেপ
| প্রশ্ন | উত্তর | |--------|--------| | আমি কি তার জন্য হারাম হয়ে গেছি? | হ্যাঁ, প্রথম তিন তালাকেই হারাম হয়ে গেছেন | | আমাদের তালাক হয়েছে কি? | হ্যাঁ, বায়েন মুগাল্লাযা হয়েছে | | পুনরায় সংসারের উপায় আছে? | হ্যাঁ, তবে শুধু প্রকৃত হিল্লা দ্বারা | | তথাকথিত হিল্লা বিয়ে কি বৈধ? | না, সম্পূর্ণ হারাম ও নিষ্ফল |
দুআ
رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا
"হে আমাদের রব! আমাদের স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততিদের থেকে আমাদের চোখের শীতলতা দান করুন এবং আমাদের মুত্তাকীদের নেতা বানান।" — সূরা ফুরকান: ৭৪
আল্লাহ তা'আলা আমাদের সবাইকে হালাল-হারামের সঠিক জ্ঞান দান করুন এবং শয়তানের ধোঁকা থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
والله أعلم بالصواب
উত্তরটি হানাফি ফিকহের প্রামাণ্য কিতাব — ফাতাওয়া উসমানি, রাদ্দুল মুহতার, ফাতাওয়া আলমগিরি, সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম ও সুনানে আবু দাউদের ভিত্তিতে প্রস্তুত।