শোক সংবাদ শোনার সময় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নড়াচড়া করলে মনে ওয়াসওয়াসা আসে — এমতাবস্থায় করণীয় কী?
Waswasa-OCD · Hanafi
Question
Answer
প্রশ্ন বিশ্লেষণ
প্রশ্নটি হলো: কোনো ব্যক্তি শোক সংবাদ (বা দুঃসংবাদ) শোনার সময় যদি তার কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ স্বাভাবিকভাবে নড়ে যায়, তাহলে তার মনে নানা ধরনের চিন্তা (ওয়াসওয়াসা) আসে — এমতাবস্থায় তার করণীয় কী? এটি মূলত ওয়াসওয়াসা (শয়তানি কুমন্ত্রণা) সংক্রান্ত একটি মাসআলা।
উত্তর
১. মূল নীতি: স্বাভাবিক অঙ্গসঞ্চালন দোষণীয় নয়
শোক সংবাদ শোনা, ভয় পাওয়া, দুশ্চিন্তা বা আবেগপ্রবণ হওয়ার সময় মানুষের হাত-পা, চোখ, মাথা ইত্যাদি স্বাভাবিকভাবে নড়াচড়া করা একটি মানবীয় স্বভাবজাত বিষয়। ইসলামে এটি কোনো গুনাহ নয়, কোনো নাজায়েজ কাজও নয়। শরীয়তে এমন কোনো বিধান নেই যে, শোক সংবাদ শোনার সময় অঙ্গ নড়াচড়া করলে কোনো ইবাদত নষ্ট হবে বা গুনাহ হবে।
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا
"আল্লাহ কারো উপর তার সামর্থ্যের বাইরে বোঝা চাপান না।" — (সূরা আল-বাকারা: ২৮৬)
২. মনে আসা চিন্তা বা ওয়াসওয়াসা সম্পর্কে
শোক সংবাদ শোনার সময় মনে নানা চিন্তা আসা — যেমন: "আমি কি ভুল করলাম?", "আমার অঙ্গ নড়ার কারণে কি কিছু হয়ে গেল?", "এটা কি গুনাহ?" — এগুলো শয়তানের পক্ষ থেকে ওয়াসওয়াসা। শয়তান মানুষের মনে সন্দেহ ও কুমন্ত্রণা ঢেলে দেয়।
আল্লাহ তা'আলা কুরআনে বলেন:
إِنَّ الشَّيْطَانَ يَنْزَغُ بَيْنَهُمْ
"নিশ্চয়ই শয়তান তাদের মধ্যে ঝগড়া-বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে।" — (সূরা আল-ইসরা: ৫৩)
وَقُلْ رَبِّ أَعُوذُ بِكَ مِنْ هَمَزَاتِ الشَّيَاطِينِ
"বলুন, হে আমার রব! আমি আপনার কাছে শয়তানদের কুমন্ত্রণা থেকে আশ্রয় চাই।" — (সূরা আল-মুমিনুন: ৯৭)
৩. হাদিসের আলোকে
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ لِأُمَّتِي مَا حَدَّثَتْ بِهِ أَنْفُسُهَا مَا لَمْ تَتَكَلَّمْ بِهِ أَوْ تَعْمَلْ بِهِ
"নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের অন্তরে যে কুমন্ত্রণা আসে তা ক্ষমা করে দিয়েছেন, যতক্ষণ না সে তা বলে বা আমল করে।" — (সহিহ বুখারি: ৫২৬৯; সহিহ মুসলিম: ১২৭)
অন্য হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَا يَزَالُ النَّاسُ يَتَسَاءَلُونَ حَتَّى يُقَالَ: هَذَا خَلَقَ اللَّهُ الْخَلْقَ، فَمَنْ خَلَقَ اللَّهَ؟
"মানুষ প্রশ্ন করতে থাকবে, এমনকি বলা হবে: আল্লাহ সৃষ্টিকে সৃষ্টি করেছেন, তাহলে আল্লাহকে কে সৃষ্টি করেছে?" — (সহিহ বুখারি: ৭২৯৬)
এই ধরনের ওয়াসওয়াসা আসলে রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
ذَاكَ صَرِيحُ الْإِيمَانِ
"এটা হলো ঈমানের স্পষ্ট প্রমাণ।" — (সহিহ মুসলিম: ১৩২)
অর্থাৎ ওয়াসওয়াসা আসা মানে ঈমান দুর্বল হওয়া নয়; বরং শয়তান যখন দেখে বান্দা ঈমানদার, তখন সে তার মনে সন্দেহ ঢালতে চায়।
৪. করণীয়
১. ভয় পাওয়া বা অস্থির হওয়ার কিছু নেই। স্বাভাবিক অঙ্গসঞ্চালন বা মনে আসা চিন্তার কারণে কোনো গুনাহ হবে না, কোনো ইবাদত বাতিল হবে না।
২. ওয়াসওয়াসাকে গুরুত্ব দেবেন না। মনে যে চিন্তা আসছে, সেদিকে মনোযোগ দিলে ওয়াসওয়াসা আরও বাড়ে। তাই এড়িয়ে যান।
৩. আউযুবিল্লাহ পড়ুন। যখনই এমন চিন্তা আসে, বলুন:
أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ
৪. যিকির ও কুরআন তিলাওয়াত বাড়িয়ে দিন। আল্লাহর স্মরণে অন্তর প্রশান্ত হয়।
أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ
"জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তর প্রশান্তি লাভ করে।" — (সূরা আর-রা'দ: ২৮)
৫. নামাজে মনোযোগ দিন। নামাজে শয়তান ওয়াসওয়াসা দেয়, কিন্তু নামাজ ছাড়বেন না; বরং নামাজ চালিয়ে যান।
৬. প্রয়োজনে অভিজ্ঞ আলেম বা চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। যদি ওয়াসওয়াসা এতটাই বেড়ে যায় যে দৈনন্দিন জীবন অতিষ্ঠ হয়ে পড়ে, তাহলে অভিজ্ঞ আলেম ও প্রয়োজনে মানসিক চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
৫. ফিকহি দৃষ্টিকোণ (হানাফি মাযহাব)
হানাফি ফিকহের মূলনীতি হলো:
الْيَقِينُ لَا يَزُولُ بِالشَّكِّ
"নিশ্চিত বিষয় সন্দেহ দ্বারা দূর হয় না।"
অর্থাৎ আপনি নিশ্চিত যে আপনি স্বাভাবিকভাবে অঙ্গ নাড়িয়েছেন — এটি কোনো শরীয়তবিরোধী কাজ নয়। আর মনে আসা সন্দেহ বা চিন্তা শুধু ওয়াসওয়াসা, যা আমলকে প্রভাবিত করে না।
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ ওয়াসওয়াসা সম্পর্কে বলেন:
"ওয়াসওয়াসা হলো শয়তানের পক্ষ থেকে আসা এমন কুমন্ত্রণা, যা বান্দার আমলকে সন্দেহযুক্ত করে তোলে; কিন্তু শরীয়তের দৃষ্টিতে সন্দেহের ভিত্তিতে নিশ্চিত আমল বাতিল হয় না।"
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) ফাতাওয়া উসমানি-তে উল্লেখ করেন:
"ওয়াসওয়াসা শয়তানের কুমন্ত্রণা। এর চিকিৎসা হলো: (১) ওয়াসওয়াসাকে ভ্রুক্ষেপ না করা, (২) আল্লাহর যিকির করা, (৩) শয়তান থেকে আশ্রয় চাওয়া, (৪) ওয়াসওয়াসার বিষয়ে বেশি চিন্তা না করা।"
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | বিধান | |------|------| | শোক সংবাদ শোনার সময় অঙ্গ নড়াচড়া | স্বাভাবিক, কোনো গুনাহ নেই | | মনে চিন্তা/ওয়াসওয়াসা আসা | শয়তানের কুমন্ত্রণা, গুনাহ নয় | | করণীয় | আউযুবিল্লাহ পড়া, যিকির করা, ওয়াসওয়াসাকে এড়িয়ে যাওয়া | | ইবাদতের হুকুম | কোনো ইবাদত বাতিল হবে না | | প্রয়োজনে | অভিজ্ঞ আলেম/চিকিৎসকের পরামর্শ |
উপসংহার: আপনার মনে যে চিন্তা আসছে তা শয়তানের ওয়াসওয়াসা। স্বাভাবিক অঙ্গসঞ্চালনের কারণে কোনো গুনাহ নেই, কোনো ইবাদত নষ্ট হবে না। ওয়াসওয়াসাকে গুরুত্ব না দিয়ে আল্লাহর যিকির ও ইবাদতে মনোযোগী হোন। ইনশাআল্লাহ, এতে অন্তর প্রশান্ত হবে।