স্বামীর নির্যাতনের সময় সংসার ও সন্তান রাখার বিধান।

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 5694
Questioner: Humaira Khanam
Question Asked: 19 Sep 2026, 08:37 PM
Reviewed & Published: 19 Sep 2026, 08:45 PM
Views: 12
Tokens: 4,723
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম,আমি ৩য় বারে মত গর্ভধারন করি।এছাড়া আমি এক বছর আগে আমার ২য় সিজার হয়।এখন আমার সাথে আমার স্বামীর সম্প্ররক ভাল না সে শারিরীক ও মানসিক নির্যাতন করেই যাচ্ছে।আমাদের সংসার জীবন ৫ বছর রানিং আর আমাদের দুজন সন্তান ও আছে।আমি এখন সংসার করতে চাচ্ছি না,এর মধ্যই আমি আবার গর্ভধারন করি যেহেতু আমি সংসার ছাড়তে চাই না আমি কি গর্ভপাত করাতে পারব? আমার এখন ৯ সপ্তাহ রানিং ,নাকি সব অত্যাচার সহ্য করে বাচ্চা ও রাখব সংসার করব?

Answer

গর্ভপাত ও তালাক বিষয়ে ফতোয়া

**উত্তরঃ

بسم الله الرحمن الرحيم الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على أشرف الأنبياء والمرسلين، أما بعد:

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ

প্রশ্নকারী তিনবার গর্ভধারণ করেছেন, এক বছর আগে দ্বিতীয় সিজার হয়েছে। স্বামীর সাথে সম্পর্ক ভালো নয়, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চলছে। সংসার জীবন ৫ বছর, দুজন সন্তান আছে। এখন ৯ সপ্তাহের গর্ভবতী। তিনি সংসার করতে চান না, কিন্তু সংসার ছাড়তেও চান না। জানতে চান—গর্ভপাত করা যাবে কি না, নাকি সব সহ্য করে সন্তান রাখবেন ও সংসার করবেন?

ফিকহি বিশ্লেষণ

১. গর্ভপাতের হুকুম (হানাফি মাযহাব)

হানাফি মাযহাব অনুযায়ী, গর্ভপাত করা মূলত নিষিদ্ধ (হারাম)। তবে কিছু নির্দিষ্ট শর্তে শুরুর পর্যায়ে অনুমতি রয়েছে।

ইসলামি ফিকহের মূলনীতি:

আল্লাহ তা'আলা বলেন:

"তোমরা নিজেদের সন্তানদেরকে দারিদ্র্যের ভয়ে হত্যা করো না। আমিই তাদেরকে এবং তোমাদেরকে রিযিক দান করি।" (সূরা আল-আনআম: ১৫১; সূরা আল-ইসরা: ৩১)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

"নিশ্চয়ই তোমাদের প্রত্যেককে সৃষ্টি করা হয় তার মায়ের গর্ভে চল্লিশ দিন নুতফা (শুক্রবিন্দু) হিসেবে, অতঃপর চল্লিশ দিন আলাকা (জমাট রক্ত) হিসেবে, অতঃপর চল্লিশ দিন মুদগা (মাংসপিণ্ড) হিসেবে..." (সহিহ বুখারি: ৩২০৮; সহিহ মুসলিম: ২৬৪৩)

২. গর্ভপাতের সময়সীমা সংক্রান্ত হানাফি মাসআলা

হানাফি ফিকহ অনুযায়ী:

| সময়কাল | হুকুম | |---------|-------| | ১২০ দিনের পূর্বে (রূহ ফুঁকনের আগে) | ওজর ছাড়া জায়েজ নয়; তবে গুরুতর ওজরে অনুমতি আছে | | ১২০ দিনের পরে (রূহ ফুঁকনের পরে) | সম্পূর্ণ হারাম, কোনো অবস্থাতেই জায়েজ নয় |

ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার" গ্রন্থে বলেন:

"গর্ভপাত করা জায়েজ নয়, তবে যদি নারীর জীবন সংকটাপন্ন হয় বা দুধের শিশুর ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, তাহলে ১২০ দিনের পূর্বে অনুমতি আছে।" (রাদ্দুল মুহতার: ৩/১৭৬)

ফতোয়া আলমগিরিতে উল্লেখ আছে:

"যদি গর্ভস্থ সন্তানের কারণে মায়ের প্রাণনাশের আশঙ্কা হয়, তাহলে গর্ভপাতের অনুমতি আছে।" (ফতোয়া আলমগিরি: ৫/৩৫৪)

৩. প্রশ্নকারীর অবস্থার উপর প্রয়োগ

গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহ:

১. ৯ সপ্তাহ = ৬৩ দিন — অর্থাৎ ১২০ দিনের অনেক আগে। এই পর্যায়ে রূহ ফুঁকা হয়নি।

২. চিকিৎসাগত দিক: এক বছর আগে সিজার হয়েছে, এখন আবার গর্ভ। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া গর্ভপাত অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

৩. শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন: এটি গর্ভপাতের বৈধ কারণ নয়। বরং নির্যাতনের সমাধান খুঁজতে হবে।

৪. সংসার না করার ইচ্ছা: এটি গর্ভপাতের কারণ হতে পারে না।

৪. ফতোয়া

প্রশ্নকারীর জন্য সিদ্ধান্ত:

(ক) গর্ভপাত প্রসঙ্গে:

আপনার বর্তমান অবস্থায় (৯ সপ্তাহ, ১২০ দিনের পূর্বে) শুধুমাত্র সংসার না করার ইচ্ছা বা স্বামীর নির্যাতনের কারণে গর্ভপাত করা জায়েজ নয়। এটি হারামের কাছাকাছি।

তবে যদি যোগ্য মুসলিম চিকিৎসক (যিনি দ্বীনদার) সাক্ষ্য দেন যে—

  • আপনার জীবন সংকটাপন্ন, অথবা
  • সিজারের কারণে জরায়ুতে গুরুতর ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে, অথবা
  • গর্ভধারণ আপনার প্রাণনাশের কারণ হতে পারে—

তাহলে ১২০ দিনের পূর্বে গর্ভপাতের অনুমতি হতে পারে। (রাদ্দুল মুহতার: ৩/১৭৬; ফতোয়া উসমানি: ২/৩৩০)

(খ) সংসার ও নির্যাতন প্রসঙ্গে:

স্বামীর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সম্পূর্ণ হারাম ও কবিরা গুনাহ। আল্লাহ বলেন:

"তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।" (সূরা আন-নিসা: ১৯)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

"তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি সে, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম।" (সুনানে তিরমিজি: ৩৮৯৫)

আপনার করণীয়:

১. ধৈর্য ও সালাত: আল্লাহ বলেন: "হে ঈমানদারগণ! ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো।" (সূরা আল-বাকারা: ১৫৩)

২. পরিবারের বড়দের মাধ্যমে সমাধান: উভয় পরিবারের সম্মানিত লোকদের নিয়ে সালিশ করুন।

৩. ইসলামি পরামর্শক/মুফতির শরণাপন্ন হোন: স্থানীয় বিশ্বস্ত আলেমের কাছে গিয়ে বিস্তারিত পরামর্শ নিন।

৪. তালাকের সিদ্ধান্ত: যদি নির্যাতন এতটাই অসহনীয় হয় যে দ্বীন ও জীবন রক্ষার প্রশ্ন আসে, তাহলে ইসলামি পদ্ধতিতে খুলা' বা তালাকের ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। তবে গর্ভাবস্থায় তালাক দেওয়া বা নেওয়া সম্পর্কে সতর্কতা রয়েছে—এ সময়ে ইদ্দত দীর্ঘ হয়।

৫. সন্তান রাখা: বর্তমান সন্তানকে রাখাই ইসলামের নির্দেশ, যদি না চিকিৎসাগতভাবে প্রাণনাশের আশঙ্কা থাকে।

৫. বিশেষ সতর্কতা

  • নিজে থেকে গর্ভপাতের সিদ্ধান্ত নেবেন না। প্রথমে দ্বীনদার মুসলিম চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
  • গোপনীয় গর্ভপাত (ক্লিনিক/ঔষধ) করানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, যদি না শরিয়তসম্মত ওজর থাকে।
  • আপনার মানসিক অবস্থা বোঝা যায়, তবে ইসলামি সমাধান হলো ধৈর্য, দুআ ও সঠিক পথে সমাধান খোঁজা—নয়তো গর্ভপাত।

সারসংক্ষেপ

| বিষয় | হুকুম | |------|-------| | শুধু সংসার না করার ইচ্ছায় গর্ভপাত | জায়েজ নয় (হারাম) | | স্বামীর নির্যাতনের কারণে গর্ভপাত | জায়েজ নয় | | চিকিৎসাগত প্রাণনাশের আশঙ্কায় ১২০ দিনের পূর্বে গর্ভপাত | অনুমতি আছে (শর্তসাপেক্ষে) | | ১২০ দিনের পরে গর্ভপাত | সম্পূর্ণ হারাম | | স্বামীর নির্যাতন | হারাম, কবিরা গুনাহ | | সমাধান | ধৈর্য, সালাত, সালিশ, প্রয়োজনে খুলা'/তালাক |

আল্লাহ তা'আলা আপনার সমস্যার সহজ সমাধান দান করুন এবং আপনার সন্তানকে হেফাজত করুন। আমিন।

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.