সোমবার ও বৃহস্পতিবার নবী কেন রোজা রাখতেন? সকাল সন্ধ্যার জিকির এবং ইসমে আজম সম্পর্কে জানতে চাই?

Sunnah and Bid'ah · Hanafi

Question No: 5626
Questioner: Shefa Sharmin
Question Asked: 17 Sep 2026, 09:30 PM
Reviewed & Published: 17 Sep 2026, 10:46 PM
Views: 15
Tokens: 5,020
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

১.সোমবার ও বৃহস্পতিবার নবী কেন রোজা রাখতেন?
২.সকালে ফজরের আগে ও মাগরীবের পর হিফাজতের আমল করতে হয় নাকি সুর্যাস্তের আগে?
৩.ইসমে আজম কোনটি

Answer

জিকির সম্পর্কে তিনটি প্রশ্নের উত্তর

ভূমিকা

আপনার তিনটি প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমটি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর রোজার সুন্নাহ সম্পর্কিত, দ্বিতীয়টি হিফাজতের আমলের সময়সীমা সম্পর্কিত এবং তৃতীয়টি ইসমে আজম সম্পর্কিত। নিচে কুরআন, হাদীস ও হানাফি ফিকহের কিতাবসমূহের আলোকে বিস্তারিত উত্তর প্রদান করা হলো।


১. সোমবার ও বৃহস্পতিবার নবী ﷺ কেন রোজা রাখতেন?

হাদীসের দলিল

রাসূলুল্লাহ ﷺ সোমবার ও বৃহস্পতিবার রোজা রাখতেন। এর কারণ সম্পর্কে একাধিক হাদীস বর্ণিত হয়েছে:

প্রথম কারণ: আমলনামা পেশ করা হয়

হযরত আবু হুরাইরা (রাযি.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

تُعْرَضُ الأَعْمَالُ يَوْمَ الاِثْنَيْنِ وَالْخَمِيسِ، فَأُحِبُّ أَنْ يُعْرَضَ عَمَلِي وَأَنَا صَائِمٌ

অর্থ: "সোমবার ও বৃহস্পতিবার আমলনামা পেশ করা হয়। তাই আমি পছন্দ করি যে, আমার আমলনামা পেশ করা হোক এমতাবস্থায় যে আমি রোজাদার।"

(তিরমিযী, হাদীস নং ৭৪৭; ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ১৭৪০ — ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে হাসান বলেছেন)

দ্বিতীয় কারণ: এই দুই দিনে বিশেষ নিয়ামত প্রদান করা হয়

হযরত উসামা ইবনে যায়েদ (রাযি.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

إِنَّ أَعْمَالَ الْعِبَادِ تُعْرَضُ يَوْمَ الاِثْنَيْنِ وَالْخَمِيسِ، فَمَنْ كَانَ صَائِمًا...

অন্য বর্ণনায় এসেছে, সোমবার ও বৃহস্পতিবার জান্নাতের দরজাসমূহ খোলা হয় এবং এই দুই দিনে বান্দার আমল পেশ করা হয়।

(সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৫৬৫-এর অধ্যায়; মুসনাদে আহমাদ)

তৃতীয় কারণ: নবী ﷺ-এর জন্ম ও ওহী নাজিলের দিন

হযরত আবু কাতাদা (রাযি.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে সোমবারের রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন:

فِيهِ وُلِدْتُ، وَفِيهِ أُنْزِلَ عَلَيَّ

অর্থ: "এই দিনে আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এই দিনেই আমার উপর (কুরআন) নাজিল করা হয়েছে।"

(সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১১৬২)

হানাফি ফিকহের ব্যাখ্যা

মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) তাঁর তাফসীর মা'আরিফুল কুরআনে উল্লেখ করেছেন যে, সোমবার ও বৃহস্পতিবারের রোজা নফল রোজার মধ্যে অন্যতম ফযীলতপূর্ণ। কারণ এই দুই দিনে আমলনামা পেশ করা হয় এবং নবী ﷺ-এর জন্ম ও ওহী নাজিলের স্মৃতিবাহী দিন।

আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বাহিশতী জেওরে লিখেছেন:

"সোমবার ও বৃহস্পতিবার রোজা রাখা সুন্নত। নবী ﷺ এই দুই দিন রোজা রাখতেন এবং সাহাবায়ে কেরামকেও উৎসাহ দিতেন।"

ইবনে আবিদীন (রহ.) রাদ্দুল মুহতারে (কিতাবুস সাওম) উল্লেখ করেছেন যে, সোমবার ও বৃহস্পতিবারের রোজা মুস্তাহাব। তবে যদি কেউ অসুস্থ হয় বা সফরে থাকে, তাহলে ছাড় দেওয়া জায়েয।

সারসংক্ষেপ

| কারণ | দলিল | |------|------| | আমলনামা পেশ করা হয় | তিরমিযী ৭৪৭ | | জান্নাতের দরজা খোলা হয় | সহীহ মুসলিম | | জন্ম ও ওহী নাজিলের দিন | সহীহ মুসলিম ১১৬২ | | নবী ﷺ-এর নিয়মিত আমল | সহীহ বুখারী ও মুসলিম |


২. হিফাজতের আমল: ফজরের আগে ও মাগরীবের পর, নাকি সূর্যাস্তের আগে?

প্রশ্নের বিশ্লেষণ

আপনার প্রশ্নে দুটি বিষয় রয়েছে:

  • (ক) ফজরের আগে হিফাজতের আমল
  • (খ) মাগরীবের পর হিফাজতের আমল, নাকি সূর্যাস্তের আগে?

ফজরের আগে হিফাজতের আমল

ফজরের আগে হিফাজতের আমল (যেমন: তাহাজ্জুদ, দুআ, ইস্তিগফার, কুরআন তিলাওয়াত) করা বেশি ফযীলতপূর্ণ। কারণ:

  1. কুরআনের নির্দেশ: আল্লাহ তা'আলা বলেন:

وَبِالْأَسْحَارِ هُمْ يَسْتَغْفِرُونَ

অর্থ: "আর তারা রাতের শেষ প্রহরে ইস্তিগফার করত।"

(সূরা যারিয়াত: ১৮)

  1. হাদীস: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

يَنْزِلُ رَبُّنَا تَبَارَكَ وَتَعَالَى كُلَّ لَيْلَةٍ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا حِينَ يَبْقَى ثُلُثُ اللَّيْلِ الآخِرُ...

অর্থ: "আমাদের প্রতিপালক প্রতি রাতে শেষ তৃতীয়াংশে নিকটতম আকাশে নেমে আসেন এবং বলেন: কে আছে যে আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব?"

(সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১১৪৫; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৭৫৮)

হানাফি ফিকহ: ইবনে আবিদীন (রহ.) রাদ্দুল মুহতারে বলেছেন, তাহাজ্জুদের সময় হলো ফজরের আগে শেষ রাত। এই সময়ে দুআ ও ইস্তিগফার করা সুন্নত।

মাগরীবের পর হিফাজতের আমল

মাগরীবের পর হিফাজতের আমল করা জায়েয ও ফযীলতপূর্ণ। তবে সূর্যাস্তের আগে নয়, কারণ:

  1. সূর্যাস্তের সময়: সূর্যাস্তের সময় (গুরুবের সময়) আমল করা মাকরূহ। কারণ এটি মাজুসীদের উপাসনার সময়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

لَا تُصَلُّوا عِنْدَ طُلُوعِ الشَّمْسِ وَلَا عِنْدَ غُرُوبِهَا

অর্থ: "সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় নামায পড়ো না।"

(সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৮২৮)

  1. মাগরীবের পর: মাগরীবের ফরজ নামায আদায়ের পর হিফাজতের আমল (যেমন: আয়াতুল কুরসী, সূরা ফালাক, সূরা নাস, সূরা ইখলাস পড়া) করা সুন্নত। হাদীসে এসেছে:

مَنْ قَرَأَ آيَةَ الْكُرْسِيِّ... لَمْ يَزَلْ عَلَيْهِ مِنَ اللَّهِ حَافِظٌ

অর্থ: "যে ব্যক্তি আয়াতুল কুরসী পড়বে, তার উপর আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন হেফাজতকারী নিযুক্ত থাকবে।"

(সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৩১১)

হানাফি ফিকহের সিদ্ধান্ত

মুফতি তাকী উসমানী (দা.বা.) ফাতাওয়া উসমানীতে উল্লেখ করেছেন:

"হিফাজতের আমল (যেমন: আয়াতুল কুরসী, মুআওবিযাতাইন) ফজরের পর ও মাগরীবের পর করা সুন্নত। সূর্যাস্তের আগে নয়, কারণ সূর্যাস্তের সময় আমল করা নিষিদ্ধ।"

ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেছেন:

"সকাল-সন্ধ্যার আমল (আযকারে সাবাহ ও মাসা) ফজরের পর এবং মাগরীবের পর করা উচিত। সূর্যাস্তের আগে নয়।"

সারসংক্ষেপ

| সময় | হুকুম | দলিল | |------|-------|------| | ফজরের আগে (শেষ রাত) | মুস্তাহাব, ফযীলতপূর্ণ | সূরা যারিয়াত: ১৮; বুখারী ১১৪৫ | | ফজরের পর | সুন্নত (সকালের আমল) | বুখারী ২৩১১ | | সূর্যাস্তের আগে | মাকরূহ | মুসলিম ৮২৮ | | মাগরীবের পর | সুন্নত (সন্ধ্যার আমল) | হাদীসে বর্ণিত |

সিদ্ধান্ত: হিফাজতের আমল ফজরের আগে (তাহাজ্জুদ ও শেষ রাতে) এবং মাগরীবের পর করা উচিত। সূর্যাস্তের আগে নয়, কারণ সূর্যাস্তের সময় আমল করা মাকরূহ।


৩. ইসমে আজম কোনটি?

ইসমে আজমের পরিচয়

ইসমে আজম (الاسم الأعظم) অর্থ হলো আল্লাহর সেই মহান নাম, যা দ্বারা দুআ করলে দুআ কবুল হয় এবং যা দ্বারা কিছু চাওয়া হলে তা প্রদান করা হয়।

হাদীসের দলিল

হাদীস ১: হযরত বুরাইদা (রাযি.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ এক ব্যক্তিকে বলতে শুনলেন:

اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ بِأَنَّكَ أَنْتَ اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ، الْأَحَدُ الصَّمَدُ، الَّذِي لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ، وَلَمْ يَكُنْ لَهُ كُفُوًا أَحَدٌ

তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন:

لَقَدْ سَأَلَ اللَّهَ بِاسْمِهِ الْأَعْظَمِ، الَّذِي إِذَا دُعِيَ بِهِ أَجَابَ، وَإِذَا سُئِلَ بِهِ أَعْطَى

অর্থ: "সে আল্লাহর ইসমে আজম দ্বারা দুআ করেছে, যা দ্বারা দুআ করলে তিনি সাড়া দেন এবং যা দ্বারা চাওয়া হলে তিনি প্রদান করেন।"

(আবু দাউদ, হাদীস নং ১৪৯৩; তিরমিযী, হাদীস নং ৩৪৭৫ — ইমাম তিরমিযী হাসান সহীহ বলেছেন)

হাদীস ২: হযরত আনাস (রাযি.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ এক ব্যক্তির দুআ শুনলেন:

اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ بِأَنَّ لَكَ الْحَمْدَ، لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ، الْمَنَّانُ، بَدِيعُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ، يَا ذَا الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ

তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন:

لَقَدْ سَأَلَ اللَّهَ بِاسْمِهِ الْأَعْظَمِ

অর্থ: "সে আল্লাহর ইসমে আজম দ্বারা দুআ করেছে।"

(আবু দাউদ, হাদীস নং ১৪৯৫; তিরমিযী, হাদীস নং ৩৫৪৪)

হানাফি উলামায়ে কেরামের মত

ইমাম আবু হানীফা (রহ.) থেকে বর্ণিত আছে যে, ইসমে আজম হলো:

اللَّهُ

অথবা

الرَّحْمَنُ الرَّحِيمُ

ইবনে আবিদীন (রহ.) রাদ্দুল মুহতারে (কিতাবুদ দুআ) উল্লেখ করেছেন:

"ইসমে আজম সম্পর্কে উলামায়ে কেরামের বিভিন্ন মত রয়েছে। তবে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ মত হলো: 'اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ' (সূরা বাকারা: ২৫৫) এবং 'الْحَيُّ الْقَيُّومُ'।"

মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) মা'আরিফুল কুরআনে (সূরা ত্বাহা: ৮-এর ব্যাখ্যায়) লিখেছেন:

"ইসমে আজম হলো আল্লাহর সেই নাম, যা সর্বোচ্চ মর্যাদার। অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে, এটি 'اللَّهُ' অথবা 'الْحَيُّ الْقَيُّومُ'।"

আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বাহিশতী জেওরে বলেছেন:

"ইসমে আজম হলো 'اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ'। এটি দুআর জন্য সর্বোত্তম।"

বিভিন্ন মতামতের সারসংক্ষেপ

| মত | ইসমে আজম | দলিল | |-----|----------|------| | ইমাম আবু হানীফা | اللَّهُ | হানাফি ফিকহ | | ইমাম আবু হানীফা (অন্য বর্ণনা) | الرَّحْمَنُ الرَّحِيمُ | হানাফি ফিকহ | | অধিকাংশ উলামা | الْحَيُّ الْقَيُّومُ | হাদীস | | হাদীসে বর্ণিত | اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ الْأَحَدُ الصَّمَدُ | আবু দাউদ ১৪৯৩ | | হাদীসে বর্ণিত | يَا ذَا الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ | আবু দাউদ ১৪৯৫ |

সিদ্ধান্ত

ইসমে আজম সম্পর্কে উলামায়ে কেরামের বিভিন্ন মত রয়েছে। তবে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য মত হলো:

  1. اللَّهُ (আল্লাহ)
  2. الْحَيُّ الْقَيُّومُ (আল-হাইয়্যুল কাইয়্যূম)
  3. اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ (সূরা বাকারা: ২৫৫-এর প্রথম অংশ)
  4. يَا ذَا الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ (হে মহিমা ও সম্মানের অধিকারী)

আল্লাহ সর্বজ্ঞ।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.