গুরুত্বপূর্ণ

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 5566
Questioner: Taslima Begum
Question Asked: 16 Sep 2026, 10:00 PM
Reviewed & Published: 16 Sep 2026, 10:14 PM
Views: 34
Tokens: 5,440
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

এক হাফেজ, মাওলানার দেড় বছর বাকি মাদরাসার এক ছাএ কাউকে কিছু না যানিয়ে বিয়ে করে ফেলে পড়ে জানা যায় তাকে নাপাকির মাধ্যমে কিছু করা হয়েছে।এখন সে বাসায় একা আসে না মা বাবা, আত্মীয় স্বজন এর সাথে ভালো ব্যবহার করে না।কারও কথাই সে শুনে না। এখন কি করলে তাকে ওই নাপাকি থেকে বাঁচানো যায়??

Answer

নাপাকি (জিন/শয়তানের আছর) থেকে মুক্তির উপায় — শরীয়তের দৃষ্টিতে পূর্ণ দিকনির্দেশনা

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ: এক হাফেজ ছাত্র (মাওলানা হওয়ার দেড় বছর বাকি) কাউকে কিছু না জানিয়ে বিয়ে করে ফেলেন। পরে জানা যায়, তাকে "নাপাকির মাধ্যমে" (অর্থাৎ জিনের আছর/সিহর/শয়তানি প্রভাব) কিছু করা হয়েছে। এখন তিনি একা বাসায় আসেন না, মা-বাবা ও আত্মীয়দের সাথে ভালো ব্যবহার করেন না, কারও কথা শোনেন না। এ অবস্থা থেকে মুক্তির উপায় কী?


প্রথমেই একটি জরুরি মাসআলা: "নাপাকি" শব্দের প্রয়োগ

প্রশ্নে "নাপাকির মাধ্যমে কিছু করা হয়েছে" বলা হয়েছে। এখানে দুটি বিষয় আলাদা করা আবশ্যক:

  1. শারীরিক নাপাকি (হায়েজ, নিফাস, বীর্য, ময়লা ইত্যাদি) — এটি পবিত্রতার বিধান, এর সাথে জিন-শয়তানের আছরের কোনো সম্পর্ক নেই।
  2. জিনের আছর, সিহর (জাদু), নজর, শয়তানি ওয়াসওয়াসা — সাধারণত মানুষ এটাকেই "নাপাকি" বা "অপবিত্র আছর" বলে থাকে।

প্রশ্নের বর্ণনা অনুযায়ী বোঝা যাচ্ছে, দ্বিতীয় বিষয়টি উদ্দেশ্য। তবে চিকিৎসা ও রুকইয়াহর আগে অবশ্যই নিশ্চিত হতে হবে যে এটি সত্যিই জিনের আছর, নাকি মানসিক রোগ (depression, psychosis, schizophrenia), মাদক, পারিবারিক কলহ, বা বিয়ের পর দাম্পত্য সমস্যার প্রতিক্রিয়া। কারণ অনেক সময় এসব উপসর্গকে ভুলভাবে "জিনের আছর" ধরে নেওয়া হয়।


দ্বিতীয় বিষয়: বিয়ে করা কি গুনাহ ছিল?

না, গোপন বিয়ে করা নিজে কোনো গুনাহ নয় — যদি শরীয়তের শর্ত পূরণ হয় (দুই সাক্ষী, মোহর, ইজাব-কবুল)। তবে অভিভাবক (ওয়ালি) ছাড়া বিয়ে করা হানাফি মাযহাবে মাকরূহ ও ফাসিদের কাছাকাছি এবং সামাজিকভাবে অনেক ফিতনার কারণ হয়।

ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, প্রাপ্তবয়স্কা নারীর নিজে বিয়ে দেওয়ার অধিকার থাকলেও ওয়ালির অনুমতি ছাড়া বিয়ে করা মাকরূহ। — রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, কিতাবুন নিকাহ

তবে বিয়ের কারণে তার ওপর জিনের আছর হয়েছে — এটা বিয়ের শাস্তি নয়; বরং এটি শয়তানের একটি কৌশল, যাতে সে দ্বীনি ছাত্রকে পথ থেকে সরিয়ে দেওয়া যায়।


তৃতীয় বিষয়: জিনের আছর/সিহর থেকে বাঁচার শরীয়তসম্মত উপায়

১. তাওবা ও ইস্তেগফার দিয়ে শুরু করা

সবার আগে ছাত্রকে নিজে তাওবা করতে হবে — যদি কোনো গুনাহ (যেমন: অবৈধ সম্পর্ক, হারাম দৃষ্টি, ওয়ালিকে অমান্য করা) হয়ে থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَمَن يَعْمَلْ سُوءًا أَوْ يَظْلِمْ نَفْسَهُ ثُمَّ يَسْتَغْفِرِ اللَّهَ يَجِدِ اللَّهَ غَفُورًا رَّحِيمًا "যে ব্যক্তি মন্দ কাজ করে বা নিজের প্রতি জুলুম করে, অতঃপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, সে আল্লাহকে ক্ষমাশীল, দয়ালু পাবে।" — সূরা নিসা: ১১০

২. পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতে আদায় + তাহাজ্জুদ

জিনের আছর থেকে বাঁচার সবচেয়ে বড় ঢাল হলো নামাজ। বিশেষ করে ফজরের নামাজ জামাতে আদায় করা, কারণ ফজরের সময় শয়তান ও জিনের প্রভাব কম থাকে।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "যে ব্যক্তি ফজর পড়ে, সে আল্লাহর জিম্মায় থাকে।" — সহীহ মুসলিম: ৬৫৭

৩. সকাল-সন্ধ্যার আযকার ও মাসনূন দুআ

  • আয়াতুল কুরসি — প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর ও ঘুমানোর আগে।
  • সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত — ঘুমানোর আগে।
  • সূরা ফালাক, সূরা নাস, সূরা ইখলাস — সকাল-সন্ধ্যা ৩ বার, ঘুমানোর আগে ৩ বার।
  • "আউযু বিকালিমাতিল্লাহিত তাম্মাতি মিন শাররি মা খলাক" — সকাল-সন্ধ্যা ৩ বার।
  • "বিসমিল্লাহিল্লাযি লা ইয়াদুররু মাআসমিহি শাইউন ফিল আরদি ওয়ালা ফিস সামা'ই ওয়া হুয়াস সামিউল আলিম" — সকাল-সন্ধ্যা ৩ বার।

৪. ঘরে সূরা বাকারা তিলাওয়াত

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "তোমরা তোমাদের ঘরগুলোকে কবর বানিয়ে ফেলো না। যে ঘরে সূরা বাকারা পড়া হয়, সেখানে শয়তান প্রবেশ করে না।" — সহীহ মুসলিম: ৭৮০

৫. রুকইয়াহ শরীয়াহ (কুরআন দিয়ে ঝাড়ফুঁক)

নিজে বা কোনো আহলে ইলম, আমলদার হাফেজ/মাওলানার মাধ্যমে শরীয়তসম্মত রুকইয়াহ করানো যাবে। রুকইয়াহর পদ্ধতি:

  • সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি, সূরা বাকারার ১০২ নং আয়াত, সূরা আরাফের ১১৭-১২২, সূরা ইউনুসের ৭৯-৮২, সূরা ত্বহা ৬৫-৭০, সূরা ফালাক-নাস পড়ে ফুঁ দেওয়া।
  • শর্ত: কোনো তাবিজ-কবজ, ঝাড়ফুঁকে শিরকি কালাম, জিনের কাছে সাহায্য চাওয়া, বা কুফরি বাক্য ব্যবহার করা যাবে না।

আয়েশা (রা.) বলেন: "রাসূলুল্লাহ ﷺ আমার ওপর সূরা ফালাক ও নাস পড়ে ফুঁ দিতেন।" — সহীহ বুখারি: ৫০১৭

৬. সিহর/জাদুর চিকিৎসা

যদি নিশ্চিত হয় যে সিহর করা হয়েছে, তাহলে সিহরের বস্তু খুঁজে বের করে ধ্বংস করা সুন্নতসম্মত পদ্ধতি (যেমন রাসূল ﷺ-এর ওপর লাবিদ ইবনে আসামের সিহর হলে জিবরীল (আ.) জানালেন, বস্তু বের করে ধ্বংস করা হলো — সহীহ বুখারি: ৫৭৬৩)। তবে এটি করতে হবে বিশ্বস্ত, আমলদার, আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের কোনো আলেমের তত্ত্বাবধানে

৭. খাবার ও পানীয়তে দুআ

খাওয়ার আগে "বিসমিল্লাহ", শেষে "আলহামদুলিল্লাহ" — এতে শয়তান অংশ নিতে পারে না। পানি পান করার আগে ৩ বার বিসমিল্লাহ পড়ে পড়া।

৮. ঘুমানোর সুন্নতসম্মত পদ্ধতি

  • অজু করে ডান কাত হয়ে শোয়া।
  • ডান হাত গালের নিচে রাখা।
  • ঘুমানোর দুআ: "আল্লাহুম্মা বিসমিকা আমুতু ওয়া আহইয়া"
  • ঘরের দরজা বন্ধ করা, বাতি নিভানো, পাত্র ঢেকে রাখা।

৯. সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ: সবর ও দুআ

জিনের আছর থেকে মুক্তি হঠাৎ একদিনে আসে না। মাসের পর মাস লাগতে পারে। তাই সবর করতে হবে এবং আল্লাহর কাছে কাঁদতে হবে।

وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ "তোমাদের প্রতিপালক বলেছেন: আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।" — সূরা গাফির: ৬০


চতুর্থ বিষয়: পারিবারিক ও সামাজিক দিকনির্দেশনা

প্রশ্নে বলা হয়েছে — সে একা বাসায় আসে না, মা-বাবা ও আত্মীয়দের সাথে ভালো ব্যবহার করে না, কারও কথা শোনে না। এখানে কয়েকটি বিষয় লক্ষণীয়:

ক. পরিবারের করণীয়

  1. তাকে একা ফেলে রাখবেন না — তবে জোর করেও কিছু চাপিয়ে দেবেন না।
  2. তার সাথে কঠোরতা নয়, ভালোবাসা ও দুআ — শয়তান কঠোরতায় খুশি হয়, নرمীতে বিরক্ত হয়।
  3. তার সামনে ঝগড়া-বিবাদ করবেন না — পারিবারিক অশান্তি জিনের আছর বাড়ায়।
  4. ঘরে কুরআন তিলাওয়াতের পরিবেশ তৈরি করুন — প্রতিদিন অন্তত কিছুক্ষণ সূরা বাকারা চালু রাখুন।
  5. তার বিয়ের বিষয়টি শরীয়তসম্মতভাবে সম্পন্ন করুন — যদি বিয়ে ফাসিদ হয়, তাহলে পুনরায় ওয়ালির অনুমতিসহ বিয়ে সম্পন্ন করান। আর যদি সহীহ হয়, তাহলে স্ত্রীর সাথে তার সম্পর্ক ঠিক রাখতে সাহায্য করুন।
  6. ডাক্তারি পরীক্ষা করান — মানসিক রোগ, মস্তিষ্কের সমস্যা, মাদক ইত্যাদি বাদ দেওয়ার জন্য।
  7. আহলে ইলমের পরামর্শ নিন — স্থানীয় বিশ্বস্ত মুফতি/আলেমের সাথে সরাসরি সাক্ষাৎ করুন।

খ. তার নিজের করণীয়

  1. নিজে তাওবা করুন — বিয়ের আগে-পরে কোনো গুনাহ হয়ে থাকলে।
  2. নামাজ-রোজা-কুরআন তিলাওয়াত নিয়মিত করুন — বিশেষ করে তাহাজ্জুদ।
  3. সঙ্গ-সাথী পরিবর্তন করুন — খারাপ সঙ্গী শয়তানের দরজা।
  4. মোবাইল/ইন্টারনেটে হারাম থেকে বাঁচুন — পর্নোগ্রাফি, অশ্লীলতা জিনের আছর বাড়ায়।
  5. নিজে রুকইয়াহ করুন — নিজের হাত নিজের বুকে/মাথায় রেখে সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি, ফালাক-নাস পড়ে ফুঁ দিন।
  6. সবর করুন ও কাউকে গালি দেবেন না — জিনের আছর হলে অনেক সময় মানুষ অকারণে রেগে যায়, গালি দেয়; এটা শয়তানের কাম।

পঞ্চম বিষয়: যা করা যাবে না (সতর্কতা)

| নিষিদ্ধ কাজ | কারণ | |---|---| | তাবিজ-কবজ, তামা-লোহা-পাথর ঝুলানো | শিরকের দিকে নিয়ে যায় | | জিন-শয়তানের কাছে সাহায্য চাওয়া | সরাসরি শিরক | | কুফরি কালাম দিয়ে ঝাড়ফুঁক | কুফরি | | অমুসলিম/অজ্ঞ ব্যক্তির কাছে চিকিৎসা | ক্ষতির সম্ভাবনা বেশি | | জোর করে মাদরাসায় পাঠানো | অবস্থা আরও খারাপ হতে পারে | | তাকে গালি দেওয়া, মারধর করা | শয়তান খুশি হয় | | "তোমার ওপর জিন ভর করেছে" বলে ভয় দেখানো | মানসিক চাপ বাড়ে |


ষষ্ঠ বিষয়: বিশেষ দুআ (রুকইয়াহর জন্য)

নিম্নলিখিত দুআগুলো নিয়মিত পড়ুন:

  1. رَبِّ أَعُوذُ بِكَ مِنْ هَمَزَاتِ الشَّيَاطِينِ وَأَعُوذُ بِكَ رَبِّ أَن يَحْضُرُونِসূরা মুমিনুন: ৯৭-৯৮
  2. اللَّهُمَّ رَبَّ النَّاسِ، أَذْهِبِ الْبَاسَ، اشْفِ أَنْتَ الشَّافِي، لَا شَافِيَ إِلَّا أَنْتَসহীহ বুখারি: ৫৬৭৫
  3. أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّاتِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَসহীহ মুসলিম: ২৭০৮
  4. بِسْمِ اللَّهِ أَرْقِيكَ مِنْ كُلِّ شَيْءٍ يُؤْذِيكَ، مِنْ شَرِّ كُلِّ نَفْسٍ أَوْ عَيْنِ حَاسِدٍ، اللَّهُ يَشْفِيكَ، بِسْمِ اللَّهِ أَرْقِيكَসহীহ মুসলিম: ২১৮৬

উপসংহার ও মূল করণীয় (সংক্ষেপে)

  1. প্রথমে নিশ্চিত হোন — এটি জিনের আছর, নাকি মানসিক/পারিবারিক সমস্যা। ডাক্তারি পরীক্ষা করান।
  2. তাওবা ও ইস্তেগফার — ছাত্র নিজে করবে।
  3. নামাজ, কুরআন, আযকার — নিয়মিত ও পূর্ণ পাবন্দির সাথে।
  4. রুকইয়াহ শরীয়াহ — বিশ্বস্ত আমলদার আলেমের তত্ত্বাবধানে।
  5. ঘরে সূরা বাকারা — প্রতিদিন।
  6. পারিবারিক ভালোবাসা ও সবর — কঠোরতা নয়।
  7. শিরকি তাবিজ-কবজ সম্পূর্ণ বর্জন
  8. বিয়ের বিষয়টি শরীয়তসম্মতভাবে সম্পন্ন করা — প্রয়োজনে পুনরায় ওয়ালির অনুমতিসহ।
  9. স্থানীয় বিশ্বস্ত মুফতির সরাসরি পরামর্শ — অনলাইনে নয়, সরাসরি সাক্ষাৎ করে।

মনে রাখবেন: জিনের আছর আল্লাহর হুকুম ছাড়া কারও ক্ষতি করতে পারে না। আর আল্লাহর কাছে দুআ করলে তিনি অবশ্যই সাড়া দেন — হয় দুনিয়াতে, নয় আখিরাতে। সবর করুন, হতাশ হবেন না।



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.